আজ চন্দ্ৰপুরের পীর সাহেবের হুজরাখানা জমজমাট। প্রথমত, আজি বৃহস্পতিবার। সারারাত জিগির হবে। জিগির শেষ হবে ফজর ওয়াক্তে, তখন সিন্নি দেয়া হবে। সিন্নি হলো গরু, খাসি, মুরগি এবং চাল-ডালের খিচুড়ি জাতীয় খাদ্য। সুরমা বাবার দোয়ায় এই খাদ্য অতি সুস্বাদু হয়। একবার যে খেয়ে যায়, বাকি জীবন তার এই সিনির কথা মনে থাকে।
জিগির ছাড়াও আজ আরেকটি বড় ঘটনা আছে। পীর সাহেবের দাওয়াতে ধর্মপাশা থেকে মিলিটারির মেজর সাহেব আসছেন। তিনি যেহেতু সন্ধ্যার পর থাকবেন না, কাজেই আজ সিন্নি সকাল সকাল রান্না হচ্ছে। মেজর সাহেবকে ইজ্জত করার জন্যে আজ সিন্নি দেয়া হবে আছর ওয়াক্তে। সিন্নি দেয়ার আগে পাকিস্তানের জন্যে দোয়া করা হবে। এই দোয়ায় শামিল হবার জন্যে পীর সাহেব তার ভক্তদের ডেকেছেন। ভক্তদের মধ্যে অনেকেই এসেছে।
মেজর সাহেবকে ইজ্জত করার জন্যে সুরমা বাবা আজ ঘিয়া রঙের একটা চাদর লুঙির মতো কোমরে পেঁচিয়ে রেখেছেন। একবার নিজে এসে রান্নার খোঁজও নিয়ে গেলেন। সচরাচর এই কাজ তিনি করেন না।
সুরমা বাবার হুজরাখানার সামনে নাইমুল বসে আছে। তার গায়ে চাদর। মুখভর্তি দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল। সে সুরমা বাবার সঙ্গে একান্তে দেখা করতে চায়। আজ যে ব্যস্ততা তাতে দেখা করা অসম্ভব, তবে সুরমা বাবার এক খাদেমের হাতে দুপ্যাকেট ক্যাপস্টেন সিগারেট এবং দশটা টাকা দেয়ায় খাদেম আশ্বাস দিয়েছে দেখা করিয়ে দেবে। নাইমুল ধৈৰ্য নিয়ে অপেক্ষা করছে। সে খাদেমকে বলেছে, সুরমা বাবার জন্যে সে কিছু নজরানা নিয়ে এসেছে। বাবার সঙ্গে দেখা হবার পর সে খাদেমকেও খুশি করে দেবে।
এই গরমেও নাইমুলের গায়ে কালো রঙের প্রায় কম্বল জাতীয় চান্দর। তার চোখ লাল। সে মাঝে-মাঝে কাশছে। চোখ লালের কারণ তার চোখ উঠেছে। এই চোখ উঠার নাম জয় বাংলা রোগ। সবারই হচ্ছে। এই রোগ এক সপ্তাহের বেশি থাকে না। নাইমুলের বেলায় রোগ মনে হয় স্থায়ী হয়ে গেছে। আজ নিয়ে বারদিন হলো রোগ সারছে না। এমন কোনো কষ্ট নাই, শুধু রোদের দিকে তাকানো যায় না। চোখ কটকট করে।
সকাল থেকে নাইমুলের কিছু খাওয়া হয় নি। এখন দুপুর। সিনির গন্ধে পেটের ভেতর পাক দিচ্ছে। গন্ধেই বোঝা যাচ্ছে এই সিন্নি আসলেই খেতে ভালো হবে।
সুরমা বাবার হুজরাখানায় নাইমুলের ডাক পড়েছে। খাদেম বলল, আপনার সমস্যার কথা বাবাকে অতি অল্প কথায় বলবেন। লম্বা ইতিহাস বলার প্রয়োজন নাই। বাবা সবই বুঝেন। এখন আসেন, চোখে সুরমা দিয়ে দেই। সুরমার নজরানা এক টাকা।
নাইমুল বলল, সুরমা না দিলে হয় না? আমার চোখের অসুখ।
খাদেম বিরক্ত গলায় বলল, সুরমা চোখে না দিলে বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। না। মেজর সাহেব যে আসতেছেন, উনারও চোখে সুরমা দিতে হবে। টিক্কা খান দেখা করতে আসলে তার জন্যেও একই ব্যবস্থা।
দেন, চোখে সুরমা দেন। ব্যথা দিবেন না।
সুরমা বাবা গা থেকে চাদর খুলে ফেলেছেন। ঘরের ভেতরটা গরম। গরমে তিনি ঘামিছেন। চাদর দিয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে গায়ের ঘাম মুছছেন। বাবার সামনে জলচৌকি। জলচৌকিতে পিতলের গ্রাসে পানি। একপাশে হাতপাখা। তিনি হাতপাখা দিয়ে অতি দ্রুত নিজেকে কিছুক্ষণ বাতাস করেই এক চুমুক পানি খান। নাইমুল কাউকে কখনো এত দ্রুত বাতাস করতে দেখে নি। সুরমা বাবা নাইমুলের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বললেন, কী চাস? তুই চাস কী?
নাইমুল বিনয়ে নিচু হয়ে বলল, আপনার জন্যে কিছু নজরানা এনেছি। নিজের হাতে দিতে চাই।
জিনিসপত্র না টেকা?
টাকা।
পরিমাণ কত?
পরিমাণ ভালো।
সুরমা বাবার মুখের বিরক্তি দূর হলো। তিনি প্রায় হাসিমুখে বললেন, আমার কাছে টেকার পরিমাণ কোনো বিষয় না। আমার কাছে এক টেকার যে মূল্য, হাজার টেকার একই মূল্য। সব টেকা-পয়সা গরিব দুঃখীর কাজে ব্যবহার হয়। এইটাও একটা ইবাদত। এই ইবাদতের নাম হাকুল ইবাদ। নজরানার টেকা জলচৌকির নিচের দানবাক্সে রাখা। যা বলার তাড়াতাড়ি বলে চলে যা। মেজর সাব আসতেছেন।
হুজুর কি মেজর সাহেবকে দাওয়াত দিয়েছেন?
অবশ্যই দাওয়াত দিয়েছি। দাওয়াত ছাড়া তারা আসবেন?
হুজুর যদি কিছু মনে না করেন, যদি বেয়াদবি না নেন–একটা প্রশ্ন করব?
কী প্রশ্ন?
শুনেছি মিলিটারিরা অনেক মানুষ মেরেছে, মেয়েদের ধরে ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। তাদেরই দাওয়াত করেছেন–ব্যাপারটা কেমন না?
সুরমা বাবা তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, কেমন মানে? বিধমীর সাথে যুদ্ধের নিয়ম তুমি জানো? বিধমীর মালা হলো গনিমতের মাল। সেই মাল নেওয়ার হুকুম আছে। বিধমীদের মেয়েছেলেও মালের মধ্যে পড়ে।
যুদ্ধ তো বিধমীর সঙ্গে হচ্ছে না। এই দেশের মানুষের সঙ্গে হচ্ছে।
তুমি চাওটা কী পরিষ্কার করে বলো তো? তুমি কে?
আমার আসল নাম নাইমুল। আসল নামে আপনি আমাকে চিনবেন না। যে নামে আপনি আমারে চিনবেন সেই নাম হলো–হাছুইন্যা। এখন চিনেছেন?
সুরমা বাবার মুখ যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, তা এই প্রায়ান্ধকার ঘরেও বোঝা গেল। নাইমুল গায়ের কালো চাদর খুলে ফেলল। স্টেনগান এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। নাইমুল বলল, শুনেন সুরমা বাবা–চিৎকার চোঁচামেচি কিছুই করবেন। না। যেভাবে বসে আছেন, বসে থাকেন। আমি এসেছি মেজরটাকে মারার জন্যে। আমার সঙ্গে আরো চারজন আছে। এরা বাইরে আছে। আপনি হাছুইন্যা গ্রুপের নাম শুনেছেন?
