আমার দলে আর লোক নেই। আমি একাই একটা দল করেছি। দলের নাম বললে আপনি হয়তো চিনবেন। আমার দলের নাম হাছুইন্যার দল। ইংরেজিতে হাছুইন্যা গ্রুপ।
তালেব মাস্টার চমকে মেয়ের দিকে তাকালেন। হাছুইন্যার দলের অসীম সাহসী কর্মকাণ্ডের খবর এই অঞ্চলের সবাই জানে। এই মানুষটা হাছুইন্যা?
নাইমুল বলল, নামটা ভালো হয়েছে না? হাছুন অর্থ ঝাড়ু। হাঙ্গুইন্যার দল ঝাড়ু মেরে দেশ থেকে মিলিটারি তাড়াবে।
চাঁপা হেসে ফেলল। মানুষটার কথা তার এত মজা লাগছে! সে চট করে হাসি থামিয়েও ফেলল। হাছুইন্যার দলের হাছুইন্যা অবাক হয়ে এখন তাকে দেখছে। তার খুব লজ্জা লাগছে। সে চা আনতে রান্নাঘরে চলে গেল। গোসল যে করছে এই মানুষটাই বিখ্যাত হাছুইন্যা–এই খবর মাকে দিতে হবে।
চাপার হাসি শুনে কিছুক্ষণের জন্যে নাইমুল বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল মরিয়ম হাসছে। হারিকেন হাতে মেয়েটির সঙ্গে মরিয়মের কোনো মিল নেই। কিন্তু দুজনের হাসিব শব্দ এত কাছাকাছি!
আমেনা বেগম রান্না প্ৰায় সেরে ফেলেছেন। মাষকলাইয়ের ডালটা শুধু বাকি। ডাল সিদ্ধ হতে সময় লাগছে। স্বামী এবং কন্যার মতো তারও ইচ্ছা! করছে অদ্ভুত মানুষটার আশেপাশে থাকতে। সেটা সম্ভব হচ্ছে না। রান্নাঘর ছেড়ে যাওয়া যাবে না। ডাল ধরে যাবে। আয়োজন সামান্য, এর মধ্যে একটা যদি নষ্ট হয় বেচারা খাবে কীভাবে? এরা বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, আরাম করে একবেলা হয়তো খেতেই পারে না।
নাইমুল আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। তার এবং মাস্টার সাহেবের হাতে সিগারেট। মাস্টার সাহেব সিগারেট খান না। আজ একটা বিশেষ রাত, এই রাত বারবার ঘুরেফিরে আসবে না। রাতটা স্মরণীয় করে রাখার জন্যেই একটা সিগারেট খাওয়া দরকার।
তালেব মাস্টার বললেন, চা খেতে খেতে গল্প করেন। আপনার কথা শুনি।
নাইমুল বলল, কী গল্প করব?
যুদ্ধের গল্প করেন। কীভাবে যুদ্ধ করেন এইসব।
যুদ্ধের গল্প করতে ভালো লাগে না। অন্য গল্প করি?
চাঁপা খুবই আগ্রহ নিয়ে বলল, জি জি করেন!
নাইমুল মজার কোনো গল্প মনে করার চেষ্টা করছে। গল্প মনে পড়ছে না। মজার কোনো গল্প শুনে যদি মেয়েটা হেসে দিত, তাহলে মরিয়মের হাসি আরেকবার শোনা যেত। নাইমুল চাঁপার দিকে তাকিয়ে গল্প শুরু করল।
শোন চাঁপা, একবার এক জীববিজ্ঞানী সুন্দর একটা গবেষণা করলেন। তিনি করলেন কী, বড় একটা অ্যাকুরিয়ামে দুধরনের মাছ রাখলেন। এক ধরনের মাছ বড় বড়, আরেক ধরনের মাছ ছোট। ছোট মাছগুলি বড় মাছের খাদ্য। তিনি করলেন কী, অ্যাকুরিয়ামের মাঝামাঝি কাচের একটা পার্টিশন দিয়ে দিলেন। এখন কী হলো শোন–বড় মাছগুলি ছোট মাছ দেখে খাবার জন্যে হা করে ছুটে আসে। এসেই এক সময় কাচের দেয়ালে ধাক্কা খায়। ছোট মাছ তারা আর খেতে পারে না। দিনের পর দিন এরকম চলল। তারপর তারা একসময় বুঝলকোনো এক বিচিত্র কারণে ছোট মাছগুলিকে খাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, তারা ছোট মাছ খাবার চেষ্টা বন্ধ করে দিল। আর তখনই বিজ্ঞানী ভদ্রলোক কাচের পার্টিশন তুলে দিলেন। দুধরনের মাছই একসঙ্গে মিশে গেল। কিন্তু বড় মাছগুলি ছোট মাছ খায় না। মুখের সামনে দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তারা খাচ্ছে না। খাবার চেষ্টাও করছে না।
চাঁপা বলল, ও আল্লা! সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি। অ্যাকুরিয়াম থেকে কাচের পার্টিশন উঠে গেছে কিন্তু সেই পার্টিশন চলে গেছে বড় মাছগুলির মাথায়।
চাঁপা বলল, মাছের মাথায় কাচের পার্টিশন যাবে কীভাবে?
নাইমুলের কাছে অদ্ভুত লাগছে কারণ মরিয়মও চাঁপার মতোই একই প্রশ্ন করেছিল–কাচের পার্টিশন মাছের মাথায় যাবে কীভাবে? মেয়েটা শুধু যে মরিয়মের মতো হাসছে তা না, তার চিন্তা-ভাবনাও মরিয়মের মতো।
আমেনা বেগম দরজার ওপাশ থেকে বললেন, খাওয়া কি এখন দিব? নাইমুল বলল, দিন। খুবই ক্ষুধার্তা। তালেব মাস্টার বললেন, আপনি খাওয়াদাওয়া করে আরামে ঘুমান। বিছানা করে দিতেছি। আপনার ভয়ের কিছু নাই। আমি ঘুমাব না। সারারাত জেগে থাকব। পাহারায় থাকব। চাঁপা বলল, আমিও জেগে থাকিব।
নাইমুল বলল, কারো জেগে থাকতে হবে না। আমি আরামেই ঘুমোব। আমার ভয়-ডর একেবারেই নাই।
নাইমুল খেতে বসেছে। তালেব মাস্টারের পরিবার তাকে ঘিরে আছে। আমেনা বেগমের মন খারাপ লাগছে–ছেলেটা কী আগ্রহ করেই না খাচ্ছে! একটু ভালো আয়োজন যদি করা যেত! নাইমুল তালেব মাস্টারের দিকে তাকিয়ে বলল, চন্দ্রপুর এখান থেকে কত দূর?
তালেব মাস্টার বললেন, দূর আছে। আপনি চন্দ্রপুর যাবেন? চন্দ্রপুর কার কাছে যাবেন?
নাইমুল জবাব দিল না। চন্দ্রপুর কার কাছে সে যাবে–এই তথ্য প্রকাশ করার কিছু না।
ভাত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমেনা বেগমের বুক ধড়ফড় করছে। ভাতে টান পড়বে না তো?
চন্দ্রপুরের পীর সাহেবকে তার খাদেম এবং ভক্তরা ডাকে সুরমা বাবা। তিনি চোখে সুরমা ছাড়া সারা গায়ে কোনো কাপড় পরেন না বলেই এই নাম। তিনি দিনরাত অন্ধকার একটা ঘরে থাকেন। ঘরের একটা মাত্র দরজা। সেই দরজা চটের ভারি পর্দায় ঢাকা থাকে। সেই ঘরে খাদেম ছাড়া অন্য কারো প্ৰবেশ নিষেধ। ভক্তরা বিশেষ চাপাচাপি করলে দর্শন দেন। ভক্তদের তখন ঘরে ঢোকার অনুমতি দেয়া হয়। সুরমা বাবার সঙ্গে দেখা করার আগে ভক্তদেরও চোখে সুরমা দিতে হয়। সুরমাদানি নিয়ে খাদেম দরজার পাশে বসে থাকেন; হাদিয়ার বিনিময়ে খাদেম চোখে সুরমা দিয়ে দেন।
