জি বাবা শুনেছি।
আমার দলটার নাম হাছুইন্যার দল।
ইয়া গাফুরুর রহিম। এইটা কী বলেন!
ভয় লাগে?
জি লাগে।
নেংটা বসে থাকবেন না, কাপড় গায়ে দেন।
সুরমা বাবা অতি দ্রুত চাদর গায়ে প্যাচালেন। নাইমুলও চাদর গায়ে দিল। ভয় যতটুকু দেখানোর দেখানো হয়েছে। সুরমা বাবা কঁপা কাপা গলায় বললেন, বাবাজি, আমাকে কিছু করবেন না তো?
নাইমুল বলল, আপনি যদি মেজরটাকে মারার জন্যে আমাকে সাহায্য করেন, তাহলে আপনাকে কিছু করব না। আর যদি সাহায্য না করেন–আপনাকে মেরে ফেলব। আমি আপনার সঙ্গেই থাকব। মেজর আপনার সঙ্গে কথা বলতে যখন আসবে, তখন গুলি করব।
বাবাজি এইসব কী বলেন?
ভয় পাচ্ছেন কেন? আপনি এত বড় পীর! মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে বেহেশতে চলে যাবেন। সত্তরটা হুর আপনার গা টিপা টিপি করবে।
বাবাজি, ভুল-ত্রুটি কিছু হয়ে থাকলে ক্ষমা দেন।
হাছুইন্যা গ্রুপের কাজ-কারবার তো জানেন। ক্ষমা এক বস্তু এদের মধ্যে নাই। বিদায় নিয়েছে। দেশ যেদিন স্বাধীন হবে, সেদিন হয়তো ফিরে আসবে।
চটের পর্দা ফাঁক করে একজন খাদেম উঁকি দিল। নাইমুলের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল, এই তুমি আসো। বাবার সামনে বেশিক্ষণ থাকার নিয়ম নাश्।
নাইমুল বলল, আরেকটু দেরি হবে। বাবার সঙ্গে আসল কথাই এখনো হয় নাই। সুরমা বাবা, আপনি আপনার খাদেমকে বলেন, আমার দেরি হবে।
সুরমা বাবা যন্ত্রের মতো বললেন, উনার দেরি হবে। তুমি এখন যাও।
খাদেম পর্দা নামিয়ে চলে গেল। ঘর আবারও অন্ধকার হয়ে গেল। নাইমুল বলল, সুরমা বাবা, মেয়েভক্তরা আপনার কাছে আসে না?
আসে। তাদের সামনেও নেংটিা হয়ে বসে থাকেন? বাবাজি, আমার শরীরে গরম বেশি, এই জন্যে গায়ে কাপড় রাখতে পারি না। বাবাজি গো, এইবার আমারে মাফ দেন। মাফ দিলে আমি জয় বাংলার লোক হবো।
নাইমুল সিগারেট ধরাল। সুরমা বাবার দিকে সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলল, নিন। সিগারেট খান।
সুরমা বাবা সিগারেট নিলেন। দেয়াশলাই দিয়ে সিগারেট ধরাতে তার অনেক সময় লাগল। তার হাত কাঁপছে।
লোকে বলে আপনার জীন সাধনা আছে। সত্যি নাকি?
জি বাবা সত্যি।
কয়েকটা পোষা জীনও নাকি আছে। কয়টা আছে?
তিনজন আছে। চারজন ছিল। একজনের মৃত্যু হয়েছে। এখন আছে তিনজন।
তাদের ডাকেন, তারা আপনাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করুক। যার কন্ট্রোলে তিনটা জীন আছে, সে যদি এত ভয় পায় তাহলে কীভাবে হবে? আপনি কি পিসাব করে দিয়েছেন?
জি-না। পিসাব করি মাই। তবে বাবাজি আমারে টাট্রিঘরে যেতে হবে। পিসাব চেপেছে।
পিসাব এখানেই করেন। আপনাকে টাট্টিঘরে যেতে দিব না।
ছড়ছড় শব্দ হচ্ছে। সুরমা বাবা সত্যি সত্যি পিসাব করছেন।
আছরের সময় খবর পাওয়া গেল মেজর সাহেব। আসবেন না। তবার রুক পাঠিয়ে দিতে বলেছেন। তবারারুক নেয়ার জন্যে ধর্মপাশা থানার একজন সেপাই নৌকা নিয়ে এসেছে।
নাইমুল উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, কাজ তো হলো না, এখন তাহলে উঠি?
সুন্নামা বাবা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বললেন, জি আচ্ছা বাবাজি। জি আচ্ছা।
নাইমুল সহজ গলায় বলল, আপনি কাপড় খুলে আবার নেংটা হয়ে যান। আপনি নেংটা বাবা। আপনাকে নেংটা অবস্থায় মারি।
সুরমা বাবা এমনভাবে তাকাচ্ছেন যেন তিনি নাইমুল কী বলছে বুঝতে পারছেন না। নাইমুল বলল, দেরি করছেন কেন? কাপড় খুলেন।
খুব কাছ থেকে নাইমুল স্টেনগান দিয়ে গুলি করল। সে সামান্যতম বিকারও বোধ করল না। তার একটাই সমস্যা হলো–ক্ষিধে নষ্ট হলো।
ধর্মপাশা থানা থেকে হাছুইন্যা গ্রুপের নাইমুলকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দেবার জন্যে এক হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হলো। পুরস্কার ঘোষণা করলেন শান্তি কমিটির প্রেসিডেন্ট। তিনি রাতে থাকেন থানায়। বাড়িতে থাকা নিরাপদ বোধ করেন না। পুরস্কার ঘোষণার দুদিনের মাথায় শান্তি কমিটির প্রেসিডেন্ট দুপুরে বাজারে চায়ের দোকানের সামনে মারা গেলেন। নাইমুলের হাতেই মারা গেলেন। গুলি করার আগে নাইমুল জিজ্ঞেস করল, প্রেসিডেন্ট সাহেব, ভালো আছেন? আমাকে চিনেছেন তো, আমি হাছুইন্যা।
প্রেসিডেন্ট সাহেব জর্দা দিয়ে পান খাচ্ছিলেন। তার মুখ থেকে জর্দার রস গড়িয়ে পড়ল। নাইমুল বলল, থানায় কতগুলি মেয়েকে আটকে রাখা হয়েছে एका?
প্রেসিডেন্ট সাহেব বিড়বিড় করে বললেন, থানায় কোনো মেয়ে আটক নাই।
নাইমুল বলল, সত্যি কথা বলেন। আমি কিন্তু চাদরের নিচে ষ্টেনগান তাক করে আছি।
প্রেসিডেন্ট সাহেব বললেন, কয়টা মেয়ে আছে আমি সঠিক জানি না।
আপনার নিজের মেয়ে তো নাই। না-কি আছে?
আপনি কী বলতেছেন বুঝতে পারতেছি না।
গুলি খাওয়ার পরে বুঝবেন। এটা খুবই আশ্চর্যের বিষয়–বুলেট শরীরে ঢোকামাত্র মাথা পরিষ্কার হয়ে যায়। বুলেট হলো মাথা পরিষ্কারের ট্যাবলেট।
প্রেসিডেন্ট সাহেব কথাবাতাঁর এই পর্যায়ে দৌড়ে পালাতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। তাকে সেই অবস্থাতেই গুলি করা হলো।
একটা সময় পর্যন্ত দেশের মানুষ
একটা সময় পর্যন্ত দেশের মানুষ কলমিলতার মতো নিজের দেশেই পালিয়েছে। যারা ঢাকার মানুষ, তারা ঢাকা ছেড়ে গেছে গ্রামে। গ্রামের মানুষেরা নিজ গ্রাম ছেড়ে অন্য গ্রামে। যারা রাজশাহীর মানুষ, তাদের কাছে মনে হয়েছে রাজশাহী ছাড়া অন্য যে-কোনো জায়গা বোধহয় নিরাপদ। এক জায়গা ছেড়ে আরেক জায়গায় যাওয়া। নিরাপদ আশ্রয়ের অনুসন্ধান।
জুন মাসের মাঝামাঝি যখন রাজাকার বাহিনী ভালোমতোই তৈরি হয়ে গেছে, তখন শুরু হলো Exodus, দেশ ছেড়ে ভিন্ন দেশে যাত্ৰা। শত শত মানুষ বর্ডার পাড়ি দেয়া শুরু করল। তাদের কাছে মনে হলো, কোনোরকমে নিজ দেশের সীমানার বাইরে যেতে পারলেই প্ৰাণে বেঁচে যাওয়া হবে। আহারে কী কষ্টের সেই যাত্ৰা!
