আব্দুল বারিক মেম্বার, আব্দুল লতিফ, সুন্দর মিঞা, তহশীলদার ও তাহার দুই ছেলে, পোস্টমাস্টার ছিরামিসি বাজার, ছিরামিসি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক, ছিদ্রামিসি প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক একজন, নজীর আহমদ, একলাস মিঞা, মজীদ উল্লা, দবীর মিঞা, রুসমত উল্লাহ, তৈয়ুব আলী, মোসাদের আলী ও অন্যান্য। ৩১শে আগস্ট পাকবাহিনী ও তাঁহাদের অনুচরগণ ৬৩জন নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করিয়া ক্ষান্ত হয় নাই। ১লা সেপ্টেম্বর ছিরামিসি বাজার ও গ্রাম জ্বালাইয়া দেয় ও মা-বোনদের উপর পাশবিক নিৰ্যাতন করে।
স্বাক্ষর/–আবদুল লতিফ
মোছাঃ চানুভান
গ্রাম; ফুলবাড়িয়া
থানা : ব্ৰাহ্মণবাড়িয়া
জেলা : কুমিল্লা
আমি দরিদ্র পিতৃহীন অবিবাহিতা নারী। বিধবা মাতা একমাত্র সংসারের আপনি পরিজন। আমার কোনো ভাইবোন নাই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন আরম্ভ হইলে পাকবাহিনী পত্তন ইউনিয়নে শিবির স্থাপন করে। জুন মাসের শেষের দিকে পাক সৈন্য ও রাজাকারদের অত্যাচার ও নৃশংসতা বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় রাজাকাররা গ্রামের ও ইউনিয়নের বহু ধনসম্পত্তি লুণ্ঠন করে। জুলাই মাসের ১৭ তারিখ বানু মিঞা, সোনা মিঞা ও চাদ মিঞা। গভীর রাত্রে আমার নিজ বাড়ি হইতে ধরিয়া লইয়া পাকবাহিনীর শিবিরে নিয়া যায়। আমাকে দেখিয়া পাকবাহিনীরা আনন্দে নাচিয়া উঠে, আমার ক্ৰন্দন তাহাদের প্রাণে একটুও মায়ার সঞ্চার করে নাই। রাজাকাররা ধরিয়া নিবার সময় তাহাদের নিকট বহু আকুতি মিনতি ও পায়ে জড়াইয়া পড়িয়াছি। উক্ত রাজাকারদের নিকট আমি যতই ক্ৰন্দন করিয়াছি, রাজাকারগুলি আমার সহিত তত বেশি অমানুষিক ব্যবহার করিয়াছে।
পাঁচদিন পাক নরপিশাচরা আমাকে তাহদের শিবিরে ও বাঙ্কারে আটকাইয়া রাখে ও আমার দুর্বল দেহের উপর অমানুষিক অত্যাচার করে ও মুক্তিবাহিনীর সংবাদ জানি কি-না জিজ্ঞাসা করে। আমি মুক্তিবাহিনীর সম্বন্ধে জানি না বলিলে আমার উপর ক্রুদ্ধ হইয়া প্ৰহার করে। এই পাঁচদিন তাহারা আমাকে গোসল করিতে পর্যন্ত দেয় নাই।
আমাকে ধরিয়া দিবার পরিবর্তে রাজাকারগণ পাক নরপিশাচদের হইতে প্রচুর মদ ও গ্রামে গ্রামে লুণ্ঠন করার অনুমতি পাইয়াছিল। সৈন্যদের অত্যাচারে বহুবার আমি জ্ঞান হারাইয়া ফেলিয়াছি। জ্ঞান ফিরিয়া পাইলেও দেখি ও অনুভব করি আমার দুর্বল শরীরে অত্যাচার করিতেছে। সেই কথা ভাবিতে আজো আমার ভয় হয়।
আমাকে ১৭ জুলাই রাত্রে রাজাকাররা ধরিয়া নিবার পর ১৮ জুলাই আমার মা কেসবিপুর গ্রামে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার নজীর আহমদ সাহেবের নিকট আমাকে পাক শিবিরে ধরিয়া নিবার করুণ সংবাদ বলিলে উক্ত মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার ২১ জুলাই গভীর রাত্রে বহু মুক্তিযোদ্ধা নিয়া ফুলবাড়িয়া পাক সৈন্যদের শিবির ও বাঙ্কার আক্রমণ করেন। হঠাৎ আক্রমণে পাকবাহিনী ও রাজাকাররা আত্মসমৰ্পণ করে। আক্রমণের সময় তাহারা সকলে আমার উপর অত্যাচার করিতেছিল! মুক্তিযোদ্ধা ভাইরা আমাকেসহ ১৪জন সৈন্য ও তিনজন রাজাকারকে গ্রেপ্তার করিয়া ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে নিয়া যান। তাহারা আমার সম্মুখে রাজাকার ও পাক নরপিশাচদের জীবন্ত মাটি চাপা দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি ত্রিপুরা রাজ্য হইতে নিজ জন্মভূমি ফুলবাড়িয়া ফিরিয়া আসি।
স্বাক্ষর/–
মোছাঃ চানুভান
রাত দশটা
রাত দশটা।
তুমুল বর্ষণ হচ্ছে। নাইমুল অতিতবাড়ি স্কুলের অ্যাসিসটেন্ট হেডমাস্টার
প্রবলবেগে বৃষ্টির পানি নেমে আসছে। নাইমুল এই পানিতে গোসল সারছে। বৃষ্টির পানি বরফের মতো ঠাণ্ডা। নাইমুলের শরীর কাঁপছে কিন্তু গোসল শেষ না করে উঠতে ইচ্ছা করছে না।
তালেব সাহেব একটা শুকনা গামছা এবং ধোয়া লুঙি নিয়ে বারান্দায় অপেক্ষা করছেন। তালেব সাহেবের পাশে তার বড়মেয়ে চাপা। চাঁপা নাইনে পড়ে। চাঁপার হাতে একটা হারিকেন। চাঁপার মা আমেনা বেগমও কিছুক্ষণ স্নানের দৃশ্য দেখেছেন। এখন তিনি গেছেন রান্নার আয়োজনে। ঘরে কিছুই নেই। অতি দ্রুত কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। ডিমের তরকারি, বেগুনভাজি, মাষকলাইয়ের ডাল। খোয়াড়ে মুরগি আছে। মুরগির মাংস করতে পারলে ভালো হতো। সন্ধ্যার পর মুরগি জবেহ করা নিষেধ বলেই মুরগি জবেহ করা যাচ্ছে না।
যে মানুষটা গোসল করছে, সে কোনো সাধারণ মানুষ না। সে মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ শুরু করেছে–স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে এরকম খবর পাওয়া গেলেও তালেব সাহেবের পরিবার এই প্রথম চোখের সামনে মুক্তিযোদ্ধা দেখছে। কী সুন্দর চেহারা! দেখেই মনে হয় বড় ঘরের সন্তান। পথে পথে ঘুরছে।
তালেব সাহেব বললেন, আপনার সাবান লাগবে? ঘরে সাবান আছে।
নাইমুল বলল, সাবান লাগবে না।
বৃষ্টির পানি ঠাণ্ডা না?
বেশ ঠাণ্ডা।
তাহলে বেশিক্ষণ থাকবেন না। উঠে পড়েন।
নাইমুল বলল, আরেকটু থাকি।
তালেব সাহেব বললেন, আপনার জন্যে একটু চা করতে বলব? ঘরে চায়ের ব্যবস্থা আছে। গুড়ের চা। রান্না হতে সামান্য বিলম্ব হবে। গোসল সেরে চা খান। ভালো লাগবে।
চা দিতে বলুন।
চাঁপা দৌড়ে তার মাকে চায়ের কথা বলতে গেল। সে একটা মুহুর্তের জন্যেও মানুষটাকে চোখের আড়াল করতে চাচ্ছে না। তাদের বাড়িতে একজন মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্ৰ হাতে উঠে এসেছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার। মানুষটার প্রতিটা কথা সে খুব মন দিয়ে শুনতে চায়।
তালেব মাস্টার বললেন, কিছু মনে করবেন না, আপনার দলের আর লোকজন কোথায়?
