৮ মাসের গর্ভবতী একটি মেয়ের উপর পাকবাহিনী এই সময় অমানুষিক পাশবিক অত্যাচার চালায়, যার দরুন সন্তান প্রসব করার পর সে ও সন্তান মারা যায়।
২৫শে শ্রাবণ পাকবাহিনী দালালের সহযোগিতায় ঝালকাঠি থেকে গান বোট নিয়ে শঙ্কর ধবল গ্রামে আসে এবং আছমত আলী ও রহিনী মিস্ত্ৰিকে ধরে নিয়ে শশীদ গ্রামে আসে এবং সুনীল সরকার নামে একটা ছেলেকে গুলি করে হত্যা করে। এই সময় খুব বৃষ্টি নেমে পড়ে। পাকবাহিনী তখন রহিনী কুমার মণ্ডলের ঘরে আশ্রয় নেয়। এবং হারমোনিয়াম, ঢোল, তবলা নিয়ে খুব গান-বাজনা করে এবং কলা খায়। বৃষ্টি শেষে যাবার সময় গৃহকর্তা রহিনী কুমার মণ্ডলকে গুলি করে হত্যা করে। যে দুইজন লোককে তারা বন্দি করে আনে, তাদের একজনকে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয় এবং একজনকে শশীদ হাটে বসে গুলি করে হত্যা করে। তাকে হত্যা করার আগে খুব মারপিট করে এবং খুব গালাগালি দেয়। যাকে এইসময় ছেড়ে দেয় তাকে বলে দেয় তোমরা জয় বাংলা বলতে পারবে না, বলবে জয় পাকিস্তান।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বরূপকাঠি থানার অশ্বথকাঠি, জিনহার, মাদ্রা, পূর্বজলা বাড়ি, মৌশানী, জুলুহার, আতা, জামুয়া, জৌসার, গণপতিকাঠি, আরামকাঠি প্রভৃতি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। এই সময় বহু লোককে তারা নির্মমভাবে হত্যা করে। এই সময় মাদ্রা গ্রাম থেকে দুইজন লোককে কুঠার দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। তাদের অপরাধ ছিল পাকসৈন্য যখন একটা মেয়েকে ধর্ষণ করার জন্য যায়, তখন তারা দুইজন বাধা দেয়। এই সময় তারা বহু মেয়েকে ধর্ষণ করে। একমাত্র স্বরূপকাঠি থানাতেই ১০০০ হাজারের বেশি মেয়েকে পাকবাহিনী ধর্ষণ করেছে।
বিভিন্ন সময় আমাদের থানাতে প্ৰায় ২০০/৩০০ লোককে পাকবাহিনী হত্যা করে। স্বাধীনতার পর আটঘর কুড়িয়ানা স্কুলঘরের পেছনে একটা পুকুরের ভেতর থেকে ১৫৬টা মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়।
পাকবাহিনী স্বরূপকাঠি দখল করার পর স্বরূপকাঠি, কুড়িয়ানা, শশীদ, বাউকাঠি, জলাবাড়ি–এইসব জায়গায় ক্যাম্প স্থাপন করে এবং এখান থেকেই বিভিন্ন জায়গায় অপারেশন চালায়। জলাবাড়ি ক্যাম্প অঞ্চলে ৩৩টা গ্রাম শুধু হিন্দু বসতি ছিল, পাকবাহিনী সব গ্রাম একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
স্বাক্ষর/–যতিন্দ্ৰনাথ মণ্ডল
আলেয়া বেগম
গ্ৰাম : বাঘেরিয়া
ডাকঘর : সোনাগাজী
জেলা : নোয়াখালী
পাকবাহিনী সোনাগাজী ও মতিগঞ্জে শিবির স্থাপন করিয়া স্থানীয় দালাল ও রাজাকারদের সহায়তায় শিবিরের আশেপাশের গ্রামগুলি আক্রমণ করিত। হঠাৎ গ্রামে প্রবেশ করিয়া ধনরত্ন লুণ্ঠন করিত এবং অসহায় নারীদের উপর চালাইত নির্মম অত্যাচার। পাকবাহিনীর অত্যাচারের ভয়ে উক্ত এলাকার প্রায় সকল যুবক, যুবতীগণ নিজ বাড়ি ছাড়িয়া কেহ ভারতে এবং অন্যেরা সুদূর গ্রামে আত্মীয় পরিজনের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করে।
জুন মাসে পাকবাহিনী সোনাগাজী দখল করিলে আমি আমার স্বামীর বাড়ি ত্যাগ করিয়া সুদূর পল্লীর গ্রামে পলাইয়া ছিলাম। আগষ্ট মাসে আমি নবজাত সন্তান প্রসব করি। সন্তান প্রসবের দুই মাস পর শরীর অসুস্থ থাকায় পিতার বাড়ি হইতে স্বামীর বাড়ি বাঘেরিয়ায় আশ্রয় নেই। তখন আমার স্বাস্থ্য অত্যন্ত দুর্বল ছিল। আমি তখন নিয়মিত ডাক্তারের ওষুধ ব্যবহার করিতাম।
অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পাকবাহিনী, দালাল, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের অত্যাচার খুব বৃদ্ধি পায়, পাকবাহিনী গ্রামে প্ৰবেশ করার সংবাদ পাইলেই গ্রাম ছাড়িয়া অন্য গ্রামে আত্মগোপন করিতাম। নভেম্বর মাসের ১৫ তারিখে পাকবাহিনী ও মিলিশিয়া আমার স্বামীর বাড়ি আক্রমণ করে। পাকবাহিনীরা আমাকে ধরিয়া ফেলে এবং হাত হইতে আমার নবজাত সন্তানকে মাটিতে ফেলিয়া দিয়া সেখানেই নির্মমভাবে পশুর মতো অত্যাচার করে। তাহাদের অত্যাচারে আমি জ্ঞান হারাইয়া ফেলি। অনুমান ৪/৫ জন নরপশু আমার অসুস্থ দেহের উপর পাশবিক অত্যাচার করিয়া আমাকে জ্ঞানহীন অবস্থায় ফেলিয়া চলিয়া যায়। পরে আমার স্বামী ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজন স্থানীয় ডাক্তারের সহায়তায় আমার জ্ঞান ফিরাইয়া আনে।
স্বাক্ষর/-
আলেয়া বেগম
ডা. আব্দুল লতিফ
গ্রাম : ছিরামিসি
থানা : বিশ্বনাথ
জেলা : সিলেট
৩১শে আগষ্ট রোজ মঙ্গলবার সময় সকাল ৯ ঘটিকার সময় অনুমানিক ১৫জন পাক সৈন্য ও সমপরিমাণ রাজাকার ছিরামিসি বাজারে আসে। তাহার পূর্বে ঐ বাজারে পাক সৈন্য আর আসে। নাই। রাজাকার কমান্ডার স্কুলের শিক্ষক, পোস্ট অফিস ও তহশিল অফিসের কর্মরত লোকজন সকলকে ছিরামিসি হাই স্কুলে যাইবার জন্য আদেশ দিল। সেখানে শান্তিকমিটি গঠন করা হইবে। নিরীহ জনগণ ভয়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হইল। কয়েক মিনিট আলাপআলোচনার পর পাক বাহিনী ছিরামিসি এলাকার লোকদিগকে একদিকে এবং সরকারি কর্মচারী ও বাহির হইতে আগত লোকদের অপর পাৰ্থে বসাইল। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদেরকে দুইভাগে দুই জায়গায় নিয়া যায়। আমি ঐ জায়গায় প্রায় ৭ বৎসর যাবৎ ডাক্তারি করিতেছি। সরকারি কর্মচারীসহ আমাদের বহিরাগত ২৬ জনকে উক্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অফিসে নিয়া শক্ত করিয়া দড়ি দিয়া বাধিয়া ফেলে এবং আমাদিগকে পার্শ্ববর্তী থানা জগন্নাথপুর নিয়া ছাড়িয়া দিবে বলিয়া ঘর হইতে বাহির করিয়া নৌকায় লইয়া যায়। অপর দিকে ছিরামিসি গ্রাম ও বাজারের ৩৭ জনকেও বাধিয়া অপর গ্রামের দিকে নিয়া যায়। আমাদের ২৬জনকে নৌকা যোগে কচর্যাকেলী গ্রামে নিয়ে যায়। সেখানে আমাদিগকে পুকুরের পাড়ে কিছু পানির মধ্যে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। ঐ সময় আমাদের হাত পেছনের দিকে শক্তভাবে বাধা ছিল। দুইদিক হইতে পাকবাহিনী ও রাজাকার গুলি করিতে থাকে। আমি হাতে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হইয়া পুকুরের পানিতে ড়ুব দেই। বহুকষ্টে পুকুরের অপর পাড়ে গাছের আড়ালে আশ্রয় নেই। কিছুক্ষণ সেখানে থাকার পর আমি সেখান হইতে আবার পুকুরের অপর পাড়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শহিদ লোকদের পার্শ্বে আসি। সেখানে প্ৰত্যেককে ভালোভাবে লক্ষ্য করিয়া দেখি সকলেই নরপিশাচদের গুলিতে শাহাদৎ বরণ করিয়াছে। অপরদিকে ছিরামিসি এলাকার ৩৭জনকে মাঠে নিয়া অনুরূপ অবস্থায় গুলি করিয়া হত্যা করিয়াছে। আমি আহত অবস্থায় অপর গ্রামে গিয়া আশ্রয় নেই। সেইদিন যাহারা শহিদ হইয়াছেন তাহাদের নাম নিম্নে দেওয়া হইল।
