বর্তমানে আমার পোস্টিং নীলগঞ্জে। আমি মোটামুটিভাবে এই পোস্টিং-এ ভালো আছি। অত্র এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি। ইহাতে আমাদের কিছু লোকক্ষয় হইয়াছে। কিন্তু তাহাদের ক্ষতির পরিমাণ সঙ্গত কারণেই বহুগুণে বেশি।
আমাদের প্রচলিত ধারণা বাঙ্গালি সাহসী না। এই ধারণা সঠিক না। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মাত্র দুইজনের একটা ক্ষুদ্র দল অতর্কিতে আমাদের ক্যাম্পে চুকিয়া পড়ে। তাহাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাকে হত্যা করা। তারা সেই কাজ করিতে পারে নাই, তবে আমাদের কিছু ক্ষতি করিয়াছে।
আপনি কোনো চিন্তা করিবেন না। পরদিন দুপুরেই রিএনফোর্সমেন্টের ব্যবস্থা হইয়াছে। আমরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সাবধান।
মা, এখন আপনাকে একটা জরুরি বিষয় বলি। জেনারেল বেগের সঙ্গে আপনার ভালো পরিচয় আছে। আমি যতদূর জানি উনার সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তাও আছে। আপনি উনার মাধ্যমে আমাদের চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল গুল হাসানকে অনুরোধ করাইবেন যেন আমি দেশে ফিরিয়া আসিতে পারি। আপনি মনে করিবেন না যে, আমি ভীত বলিয়া দেশে ফিরিতে চাইতেছি। আমি মোটেই ভীত নেই। দেশে ফিরিতে চাইবার প্রধান কারণ— এইখানে আমার স্বাস্থ্য টিকিতেছে না।
অতি জঘন্য এই দেশ। শুকনায় থাকে সাপ। পানিতে সাপের চেয়েও ভয়ঙ্কর এক প্ৰাণী, তার নাম জোঁক। এই জোঁকের প্রধান খাদ্য মানুষের রক্ত।
রাইফেলের সাহায্যে শক্রির মোকাবেলা সম্ভব কিন্তু জোঁকের বা সাপের মোকাবেলা সম্ভব না।
মা, আপনি যেভাবে পারেন আমাকে ওয়েস্টার্ন কমান্ডে ট্রান্সফারের ব্যবস্থা নিবেন। আমার বড় চাচি হয়তো এই বিষয়ে আপনাকে সাহায্য করিতে পারেন। বড় চাচিকে আমার সালাম। বোন রেহনুমাকে আমার আদর ও স্নেহ। তাহার বিবাহের দিন কি ধাৰ্য হইয়াছে?
মা, আপনি আমার জন্যে দোয়া করুন। কিছুদিন হইল। মন এবং শরীর কোনোটাই ভালো যাইতেছে না।
ইতি
আপনার আদরের ছোট ছেলে
ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ বাসেত
দলিলপত্ৰ : অষ্টম খণ্ড
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ
দলিলপত্ৰ : অষ্টম খণ্ড
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়
যতিন্দ্ৰনাথ মণ্ডল
গ্ৰাম : শশীদ
ডাকঘর : মোশাণী
থানা : স্বরূপকাঠি
জেলা : বরিশাল
১৭ই বৈশাখ পাকবাহিনী গান বোট নিয়ে ঝালকাঠি দিয়ে কাটাখালী নদী দিয়ে শশীদের হাটে আসে। তারা এসে হাটের পাশে গান বোট রেখে গ্রামের উপর নেমে পড়ে। পাকবাহিনী গ্রামের ভেতর প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের নারী-পুরুষ প্ৰাণের ভয়ে যে যেদিকে পারে পালাতে চেষ্টা করে। পাকবাহিনী গ্রামে প্রবেশ করে প্রথমে দামি দামি জিনিসপত্র লুঠতরাজ করে এবং পরে ৯ খানা বাড়ি অগ্নিসংযোগে ধ্বংস করে দেয়। ঐ দিন ২জন লোককে তারা গুলি করে। এদের একজন সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় আর একজন গুরুতব রূপে আহত হয়।
২৬শে বৈশাখ পাকবাহিনী গু রাজাকাররা পুনরায় আমাদের গ্রামে আসে। তারা গান বোট ও স্পিড বোট নিয়ে ছোট খাল দিয়ে গ্রামের ভেতর ঢুকে পড়ে। মতিলাল দেবনাথ (ব্যানাজী) ও হিরালাল দেবনাথের কাপড়ের দোকান লুঠ করে স্পিড বোট বোঝাই করে কাপড় নিয়ে যায়। এই সময় মতিলাল দেবনাথের কাছ থেকে নগদ ১২০০০ হাজার টাকা নেয় এবং তাকে বেয়োনেট চার্জ করে পরে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এইদিন আমাদের গ্রামের ১৮জন লোককে পাকবাহিনী গুলি করে বেয়োনেট চার্জ করে হত্যা করে। এর মধ্যে জিতেন নামে একজনকে পাক বর্বর বাহিনী নারিকেল গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে তার পায়ের কাছে খড়কুটা দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তার সারা শরীরে আগুন ধরে গেলে সে ভীষণভাবে চিৎকার করতে থাকে, তখন পাক বর্বর বাহিনী গুলি করে তার মাথার অর্ধেক অংশ উড়িয়ে দেয়।
এই ঘটনা তার স্ত্রীর সম্মুখে হয়। কেননা পাকবাহিনী তার স্ত্রীকে ধরে এনে তার সম্মুখে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই সময় ক্ষীরদা সুন্দরী নামি এক বিধবা মেয়েকে পাকবাহিনী সারা শরীর বেয়োনেট নিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এইসময় আর এক মহিলা পাশের জঙ্গলের ভেতর পালিয়ে ছিল তার ছোট ১ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে। পাকবাহিনী তাদের লক্ষ করে গুলি ছুড়লে এক গুলিতে ছেলে, মেয়েসহ তিনজনই মারা যায়।
ঐ দিন আমাদের গ্রামের মোট চারখানা বাড়ি বাদে আর সব বাড়ি অগ্নিসংযোগে ধ্বংস করে দেয়।
৫ই জ্যৈষ্ঠ পাকবাহিনী ঝালকাঠি থেকে গান বোট নিয়ে পুনরায় শশীদ হাটে আসে এবং হাটের উপর ক্যাম্প স্থাপন করে। ঐ দিনই পাকবাহিনী আমাদের গ্রাম থেকে ২জন লোককে হত্যা করে। তার মধ্যে একজন ছিল স্থানীয় স্কুলের সেক্রেটারি কালী কান্ত মণ্ডল। এইসময় পাকবাহিনী স্কুলের লাইব্রেরি লুট করে এবং ভেঙেচুরে সব তছনছ করে দেয়। এবং লাইব্রেরির ভেতরে ছাত্রদের দেওয়া রিলিফের গম পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই গমের আগুন নেভাতে গিয়েই সেক্রেটারি সাহেব গুলি খান। পাকবাহিনী এই সময় ১০ দিন শশীদ হাটে ক্যাম্প করে। থাকে। এই সময় তারা ব্যাপক হারে নারী ধর্ষণ করে। একমাত্ৰ আমাদের গ্রামে অনেক মেয়েকে পাকবাহিনী ধর্ষণ করে।
পাকবাহিনী রাত্ৰিতে গ্রামের ভেতর ঢুকে মেয়েদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে এবং কিছু কিছু মেয়েকে তারা ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং এক একজনের উপর পর পর কয়েকজন পাক পশু ধর্ষণ করে। এই সময় ১১ বৎসরের একটা ছোট মেয়েকে পাকবাহিনী তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং একাধারে তার উপর চলে পাশবিক অত্যাচার। পাকবাহিনী চলে যারবার পর এই মেয়েটিকে উদ্ধার করা হয়। ৩ মাস পর্যন্ত এই ছোট মেয়েটি হাঁটতে পারত না।
