হারুন মাঝি বলল, ওসি সাহেবের পুলাটারে একটু আনেন। দূর থাইক্যা দেখি বাপকা বেটা হইছে কি না।
ইরতাজউদ্দিন ছেলে কোলে নিয়ে বের হলেন। হারুন মাঝি আগ্রহ করে। হাত বাড়াল। এই দুর্ধর্ষ ডাকাতের হাতে ছেলে তুলে দিতে ইরতাজউদিনের মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু ডাকাতটা এত আগ্রহ করে হাত বাড়িয়েছে! ইরতাজউদ্দিন ছেলেকে হারুন মাঝির হাতে দিলেন।
মৌলানা সব ছেলের নাম কী?
নাম রাখা হয় নাই।
হারুন মাঝি আনন্দের সঙ্গে বলল, দেখেন দেখেন আমারে কেমন চোখ পিটপিটাইয়া দেখতাছে। ঐ ব্যাটা, কী দেখস? তোর পিতা আমারে ধরছিল। সে বিরাট সাবসি মানুষ ছিল। তুইও তোর বাপের মতো সাবাসি হইবি, মেনা গরু হইবি না।
ইরতাজউদ্দিন বললেন, অনেক হয়েছে, এখন তারে দেও মার কোলে দিয়া আসি। ছোট শিশুদের কখনোই অধিকক্ষণ মায়ের কোল ছাড়া করতে নাই।
হারুন মাঝি ছেলে ফেরত দিয়ে ইরতাজউদ্দিনকে কদমবুসি করে বিদায় হলো। ইরতাজউদ্দিন কমলার হাতে ছেলেকে তুলে দেবার সময় দেখলেন, ছেলের গলায় সোনার চেইন চকচক করছে। তিনি খুবই বিরক্ত হলেন।
নীলগঞ্জে ফকির বাড়ির সামনে দুজন মিলিটারি। তারা গ্রাম পরিদর্শনে বের হয়েছে। ফকির বাড়িতে তাদের ডাব খেতে দেয়া হয়েছে। ডাব খাওয়া শেষ হবার পর তারা মহানন্দে ডাবের শাঁস খাচ্ছে। লোকজন একটু দূর থেকে ভীত চোখে তাদের দেখছে। ফকির বাড়ির মেজ ছেলে আরো ডাব কাটছে। ডাবের পানি ফেলে দিয়ে শুধু শাঁস বের করে প্লেটে রাখা হচ্ছে।
ডাবের শাঁস খাওয়ার এই দৃশ্যটা হারুন মাঝি এবং তার সঙ্গী কালা মিয়া ধান খেতের আড়াল থেকে দেখল। হারুন মাঝি বলল, অলংগা* দিয়া এই দুইটারে বিনতে পারবি?
কালা বলল, একটারে পারব।
হারুন মাঝি বলল, তুই একটারে আমি একটারে।
কালা মিয়া বলল, বাদ দেন।
হারুন মাঝি সঙ্গে সঙ্গে বলল, আচ্ছা যা বাদ। তাছাড়া অলংগাও নাই।
হারুন মাঝি মাথা নিচু করে ধান খেতের আল বেয়ে এগুচ্ছে। হঠাৎ সে তার মত পরিবর্তন করল। অলংগা সঙ্গে নেই এটা সত্যি, তবে অলংগা জোগাড় করা কোনো সমস্যাই না। মিলিটারি দুটা ডাব খেয়ে নিশ্চিত মনে হাঁটতে হাঁটতে নীলগঞ্জ হাইস্কুলের দিকে যাবে। তাদের যেতে হবে বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে। তখন পিছন থেকে অলংগার ঘা দিলে আর দেখতে হবে না। এদের সঙ্গে ভালো বন্দুক আছে। বন্দুক দুটা কাজ করা যাবে। ডাকাতির সুবিধা হবে। এই সময় তার হাত খালি। রামদা ছাড়া অন্ত্রপাতি কিছুই নাই। মিলিটারিদের এইসব বন্দুক কীভাবে চালাতে হয়–তা অবশ্য জানা নাই। সেটা শেখা যাবে। সব বন্দুকই একরকম। গোড়ায় চাপ দিলে গুলি।
কালা মিয়া!
হুঁ।
চল অলংগার জোগাড় দেখি।
কালা মিয়া ওস্তাদের দিকে কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, চলেন।
দুপুর তিনটায় ক্যাপ্টেন বাসেতকে ঘুম থেকে তুলে বলা হলো, সেনাবাহিনীর দুজন সদস্যকে গ্রামের লোকজন বর্শা বিধিয়ে মেরে ফেলেছে।
সন্ধ্যা ছাঁটার মধ্যে নীলগঞ্জের এক-তৃতীয়াংশ বাড়ি-ঘর জ্বলিয়ে দেয়া হলো। সর্বমোট আটত্রিশ জন মানুষকে গুলি করে মারা হলো। এর মধ্যে গাতক নিবারণও আছে। তার হাতে ক্যাপ্টেন বাসেত সাহেবের লেখা প্ৰশংসাপত্র। সেই প্ৰশংসাপত্রেও কাজ হলো না।
রাত এগারোটায় ক্যাপ্টেন বাসেত হতভম্ব হয়ে গেলেন, কারণ জঙ্গলে ঢাকা দক্ষিণ দিক থেকে নীলগঞ্জ হাইস্কুল লক্ষ্য করে কারা যেন গুলি করছে। এতটা সাহস বাঙ্গালি কুত্তাদের হবে–তা তাঁর ধারণাতেও ছিল না। তাঁর ধারণাতে ভুল ছিল। হারুন মাঝির সাহসের সঙ্গে তিনি পরিচিত না। হারুন মাবি জঙ্গলের দিক থেকে গুলি করছে মিলিটারি বন্দুক কী করে চালাতে হয় এটা শেখার জন্যে। তার পরিকল্পনা ভিন্ন। সে গুলি করবে। খুব কাছ থেকে। ডাকাত কখনো দূর থেকে গুলি করে না। তারা গুলি করে খুব কাছে থেকে।
ভোর ছটা। প্ৰবল বর্ষণ শুরু হয়েছে। মাঝে-মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বিদ্যুতের আলোয় হঠাৎ হঠাৎ দেখা যাচ্ছে হারুন মাঝি তার সঙ্গী কালা মিয়াকে নিয়ে নীলগঞ্জ হাইস্কুলের দিকে এগুচ্ছে। কালা মিয়া বলল, ওস্তাদ বিড়িতে টান দিতে পারলে হইত। হারুন মাঝি বলল, বৃষ্টির মধ্যে বিড়ি ধরাইবি ক্যামনে? কালা মিয়া হতাশ গলায় বলল, সেইটাও একটা বিবেচনা।
হারুন মাঝি ভয় একেবারেই পাচ্ছে না। কিন্তু তার গা ছমছম করছে। তার মনে হচ্ছে, তারা মানুষ দুজন না। তিনজন। নীলগঞ্জ থানার ওসি ছদারুল আমিনও তাদের সঙ্গে আছে। তবে ওসি সাহেবকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। হারুন মাবি জানে এই সবই মনের ধান্ধা। মন অনেক ধান্ধাবাজি করে। তারপরেও সে ওসি সাহেবকে মন থেকে দূর করতে পারছে না। এই বিষয়টা নিয়ে কালা মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে পারলে হতো। কথা বলা ঠিক হবে না। কালা মিয়া প্ৰচণ্ড সাহসী কিন্তু সে ভূত-প্ৰেত ভয় পায়।
—————
*অলংগা : বর্শা। তালগাছের কাঠ দিয়ে এই বর্শা বানানো হয়।
ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ বাসেতের চিঠি
নীলগঞ্জ থেকে ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ বাসেতের তার মাকে লেখা (তারিখবিহীন) চিঠি।
আমার অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার
মা
আসসালাম। মা, মেজর সফদর জামিলের মাধ্যমে পাঠানো আপনার পত্র যথাসময়ে পাইয়াছি। আপনি যে কিসমিস ও চিলগোজা পাঠাইয়াছেন তাহাও পাইয়াছি। আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।
আমি ভালো আছি। আমাকে নিয়া দুশ্চিন্তার কোনোই কারণ নাই। দুষ্ট বাঙালিদের আমরা শায়েস্তা করিয়াছি। অল্পকিছু ইন্ডিয়ার দালাল বিভিন্ন স্থানে উৎপাতের চেষ্টা করে। তবে আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে তারাও কুকুরের মতো লেজ গুটািইয়া পালাইতেছে। সেই দিন আর দূরে নাই যেদিন পূর্ব পাকিস্তান হইতে সমস্ত কুকুরকে আমরা জাহান্নামে পাঠাইব।
