অবশ্যই তোমার দেশ।
নিজের দেশে আমারে সবেই চিনে। যেখানে যাই আদর কইর্যা বসায়। ইন্ডিয়ায় আমারে চিনে কে?
ঠিকই বলেছ।
নিবারণ গুনগুন করে উঠল,
পাখি থাকে নিজের বনে,
বনের মধু খায়।
সেই পাখি ক্যামনে বলো
বন ছাইড়া যায়?
বনে লাগছে মহা আগুন
সব পুইড়া যায়,
এখন বলো সেই পাখিটার হবে কী উপায়?
ইরতাজউদ্দিন বললেন, গানটা এখন বাঁধলা?
জে।
ভালো গান বেঁধেছি। নদীর পাড়ে একা একা কী করছ?
মনটা খুব খারাপ ছিল। এই জন্য ভাবলাম নদীর পাড়ে আইস্যা বসি। নদীর পানি হইল চলতি পানি। চলতি পানি মনের দুঃখ সাথে নিয়া যায়।
নিবারণ, আমার সাথে চলো। নাশতা করবে।
নিবারণ বিনয়ের সঙ্গে বলল, জি-না। মন ভালো করতে আসছি, দেখি মন ভালো হয় কি-না।
মন এত খারাপ কেন?
নিবারণ আবারো গুনগুন করে উঠল,
আসমানে উড়তাছে শকুন
জলে পড়ছে ছায়া।
মানুষ মরে ঘরে ঘরে
আমি থাকি চাইয়া
ইরতাজউদ্দিন সাহেবের ইচ্ছা করছে কিছুটা সময় নিবারণের সঙ্গে থাকেন। সেই ইচ্ছা তিনি দমন করলেন। নিবারণ এসেছে একা একা থাকার জন্য, তাকে একা থাকতে দেওয়া উচিত। তিনি বাড়িতে ফিরে এলেন। নিবারণ একা একা ঘুরতে লাগল। দুপুরের দিকে মিলিটারি তাকে নদীর পাড় থেকে ডেকে নিয়ে গেল। ক্যাপ্টেন সাহেব নিবারণের অনেক নাম শুনেছেন। তাঁর গান শুনতে চান।
ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ বাসেত নিবারণের গান শুনে মুগ্ধ হলেন। তার আফসোস হলো যে, সঙ্গে ক্যাসেট প্লেয়ার নেই। ক্যাসেট প্লেয়ার থাকলে গানটা রেকর্ড করা যেত। ক্যাপ্টেন সাহেব বললেন, যে গানটা গেয়েছ সেটা আবার গাও। এটা কী ধরনের গান?
নিবারণ বলল, এরে বলে কাটা বিচ্ছেদের গান। উকিল মুনশির কাটা বিচ্ছেদ। এই বিচ্ছেদ কইলজা কাটে।
ক্যাপ্টেন সাহেব বাংলা জানেন না। নিবারণের কথা ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিচ্ছেন নীলগঞ্জ স্কুলের শিক্ষক ছগীর সাহেব। ক্যাপ্টেন সাহেবের সঙ্গে ছগীর উদিনের ভালো সখ্যতা হয়েছে। তিনিও প্রায়ই ক্যাপ্টেন সাহেবের সঙ্গে দাবা খেলতে আসেন। ক্যাপ্টেন সাহেব দাবায় তেমন পারদশী না। ছগীর উদ্দিন ইচ্ছা করে ভুল খেলে হেরে যান। কারণ তিনি জানেন দাবায় হারলে মেজাজ খারাপ হয়। তিনি বুদ্ধিমান মানুষ। মিলিটারির মেজাজ খারাপ হয়–এমন কাজ তিনি করবেন না।
নিবারণ গান ধরল,
শোয়া চান পাখি
আমি ডাকিতাছি
তুমি ঘুমাইছ না কি?
গানের কথাগুলি ছগীর উদ্দিন অনুবাদ করে দিচ্ছেন–
Oh my lying bird
I am calling you
Why you are not responding?
ক্যাপ্টেন বাসেত নিবারণকে কফি খাওয়ালেন। তার সঙ্গে ছাণীর উদিনের মাধ্যমে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করলেন।
তুমি হিন্দু?
জি জনাব, আমি হিন্দু। আমার অপরাধ ক্ষমা করে দেন।
হিন্দু হওয়া কোনো অপরাধ না। ক্ষমার প্রশ্ন আসছে না। মুসলমানের মধ্যে যেমন ভালো-মন্দ আছে, হিন্দুর মধ্যেও তেমন আছে।
জনাব আপনার কথা শুনে আনন্দ পেয়েছি।
আমিও তোমার গান শুনে আনন্দ পেয়েছি। তোমাকে একটা প্ৰশংসাপত্ৰ লিখে দিচ্ছি। বিপদে পড়লে এই প্ৰশংসাপত্ৰ দেখালে ছাড়া পাবে।
জনাব আপনার অনেক দয়া।
দয়া-টয়া কিছু না, আমি গুণের কদর করি।
অন্তরে দয়া না থাকলে কেউ গুণের কদর করতে পারে না।
ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ বাসেত একটা প্ৰশংসাপত্ৰ লিখে নিবারণকে দিলেন। যে কলম দিয়ে প্রশংসাপত্ৰ লেখা হয়েছে সেই কলামটাও দিলেন। নিবারণ তার বিশেষ ভঙ্গিমায় ক্যাপ্টেন সাহেবকে প্ৰণাম করল। প্ৰণামের বিশেষ ভঙ্গিটাও ক্যাপ্টেন সাহেবের ভালো লাগল। ছবি তুলে রাখলে দেশে ফিরে দেখানো যেত।
ইরতাজউদ্দিনের বাড়ির উঠানে হারুন মাঝি উবু হয়ে বসে বিড়ি টানছে। হারুন মাঝির সঙ্গে আছে তার দীর্ঘদিনের সহচর কালা মিয়া। কালা মিয়াকে দেখলে দুবলা-পাতলা মানুষ বলে ভুল হতে পারে, তবে তার ক্ষিপ্ৰতা গোখড়া সাপের মতো। হারুন মাঝিও বিড়ি টানছে। সে বসেছে ওস্তাদের দিকে পেছন ফিরে। ওস্তাদের সামনে বিড়ি-সিগারেট খাওয়ার মতো বেয়াদবি সে করতে পারবে না। ইরতাজউদ্দিন বাড়িতে ছিলেন না। তিনি শেখেরহাট গিয়েছিলেন কমলার ছেলের জন্যে তালমিছরি কিনতে। বাচ্চাটার বুকে প্রায়ই কফ জমে। তালমিছরি খেলে কফের দখল কিছু কমে।
বাড়ি ফিরে এই দুইজনকে বসে থাকতে দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। হারুন মাঝি এবং কালা মিয়া দুজনেই অতি দ্রুত তাদের বিড়ি ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ইরতাজউদ্দিন বললেন, ব্যাপার কী?
হারুন মাঝি বিনয়ে নিচু হয়ে বলল, আপনার কাছে একটা আবদার।
কী আবদার?
ওসি সাহেবের ছেলের জন্যে একটা স্বর্ণের চেইন আনছি। চেইনটা গলায় পরাব।
তোর চুরি-ডাকাতির চেইন গলায় পরাবি কী জন্যে? এটা কেমন কথা?
হারুন মাঝি বিব্ৰত ভঙ্গিতে মাথা চুলকাতে লাগল। চুরি-ডাকাতির চেইন ব্যাপারটা সত্যি। ডাকাতির জিনিসপত্র কিছুই সে সঙ্গে রাখে না। এই চেইনটা কীভাবে যেন ছিল।
ইরতাজউদ্দিন বললেন, উঠানে বসে থাকিবি না। বাড়িতে যা।
বাড়িঘর কি আমরার আছে যে বাড়িতে যাব? ওসি সাবের ছেলেটারে একটু আইন্যা দেন। দেখি বাপের মতো চেহারা হইছে কি না। তার বাপ ছিল বিরাট সাবাসি মানুষ। কইলজা ছিল বাঘের। উনারে মাইরা ফেলছে–এইটা মনে হইলেই রাগে শইল কাপে। ওসি সাহেবের ইসাতিরি। আর ছেলেরে যে আপনে নিজের কাছে আইন্যা রাখছেন–এইটা বিরাট কাজ করছেন। আপনে বেহেশতে যাইবেন এই কারণে।
আমার বেহেশতে যাওয়া নিয়া তোর মীমাংসা দিতে হবে না।
