ক্যাপ্টেন সাহেবের সঙ্গে অত্র এলাকার হিন্দুদের সঙ্গেও সদ্ভাব আছে। আমাদের স্কুলের শিক্ষক কালিপদ বাবুকে ডাকাইয়া নিয়া তার সঙ্গে দাবা খেলেন। কালিপদ বাবুও ক্যাপ্টেন সাহেবের ভদ্রতায় মুগ্ধ। ক্যাপ্টেন সাহেবের উদযোগে এইখানে স্থানীয়ভাবে শান্তি কমিটি গঠন করা হইয়াছে। আমি সেই কমিটির প্রেসিডেন্ট। কমিটির প্রধান কাজ শান্তি বজায় রাখা। নীলগঞ্জের শান্তি বর্তমানে বজায় আছে।
ছদরুল আমিন সাহেবের বিধবা স্ত্রী পুত্ৰসহ বর্তমানে আমার সঙ্গে আছে। আমি তাহাদের খুলনায় পৌছাইয়া দিয়া খুলনা হইতে রকেট-স্টিমার যোগে ঢাকা যাইব এবং
আমি বড়ই অস্থির থাকি…।
ভোরবেলা চিঠি পোস্ট করতে গিয়ে ফিরে এলেন। পোস্টাপিস বন্ধ পোস্টমাস্টার কাউকে কিছু না বলে পোস্টাপিস তালাবন্ধ করে চলে গেছে। চিঠি পোস্ট করতে হলে এখন যেতে হবে ফুলপুর। তাঁর শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না; হাঁটলে হাঁটুতে ব্যথা করে। পায়ে পানি এসে যায়। তারপরও তিনি নিজেই হেঁটে হেঁটে ফুলপুরে গেলেন। এই কাজটা অন্যকে দিয়েও করানো যেত। তিনি ব্যক্তিগত কাজ কখনোই অন্যকে দিয়ে করান না। নবি-এ-করিম তার কাজ নিজে করতেন। ইরতাজউদ্দিন সারাজীবন নবি-এ-করিমকে অনুসরণ করে। এসেছেন। আজ শুধুমাত্র বয়সের দোহাই দিয়ে তা থেকে বিরত থাকবেন তা হয় না। তিনি ফুলপুর রওনা হলেন। চিঠির সঙ্গে টেলিগ্রামও করলেন।
সেই টেলিগ্রামেরও কোনো জবাব এলো না। মনে হচ্ছে পুরো দেশে ডাক যোগাযোগ বলে কিছু নেই। তার মন খুবই অস্থির হলো। তিনি অস্থিরতা দূর করার জন্য ইসতেখারা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ইসতেখারায় বিশেষ বিশেষ দোয়াদরুদ পড়ে পবিত্ৰ মনে ঘুমুতে যেতে হয়। তখন স্বপ্নে প্রশ্নের জবাব আসে। তবে স্বপ্ন খুব সরাসরি হয় না।
আল্লাহপাক প্রতীকের মাধ্যমে বান্দার প্রশ্নের জবাব দেন। সেই প্ৰতীক বোঝা সবসময়ই কঠিন।
তারপরও তিনি একরাতে ইসতেখারা করে ঘুমোতে গেলেন। স্বপ্নে দেখলেন রুনিকে। রুনি বড় একটা থালায় কী যেন খাচ্ছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কী খাচ্ছিস; রুনি বলল, বলব না। তিনি বললেন, দেখি। রুনি বলল, দেব না।
এই স্বপ্নের মানে কী? রুনি খাওয়া-দাওয়া করছে, তার মানে সে ভালো আছে। বড় একটা থালায় খাবার নিয়ে খাচ্ছে, এর অর্থও ভালো। ছোট একটা পিরিচে খাবার নিয়ে খাচ্ছে দেখলে অভাব বুঝাত। তবে তিনি রুনিকে একা দেখেছেন, সঙ্গে বাবা-মা কেউ নেই। এরও কি কোনো অর্থ আছে? শাহেদ এবং আসমানী এরা দুজন কোনো বিপদে পড়ে নি তো? তিনি রুনির কাছে খাবার চাইলেন। রুনি দিতে রাজি হলো না। এরও কি আলাদা কোনো অর্থ আছে? আছে নিশ্চয়ই। তিনি ধরতে পারছেন না। এর পরপরই তিনি খতমে জালালি শুরু করেন। আজ সেই খতম শেষ হয়েছে। তিনি খুব ভালো বোধ করছেন। তার মন বলছে আর কোনো ভয় নেই।
ইরতাজউদ্দিন জায়নামাজ ছেড়ে উঠতেই কমলা ঘর থেকে বের হলো। ইরতাজউদ্দিন বলল, কেমন আছ গো মা? কমলা বলল, ভালো।
তোমার ছেলের জ্বর কি কমেছে? জি কমেছে। আলহামদুলিল্লাহ। কমলা বলল, চাচাজি, আমি আপনাকে একটা কথা বলতে আসছি। জরুরি কথা।
ইরতাজউদ্দিন বললেন, বলো মা।
আমি খুলনা যাব না। সেখানে আমার কেউ নাই। মা মারা গেছেন। সৎভাই আছে। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো না। খুলনা গেলে ছেলে নিয়ে আমি বিপদে পড়ব।
ইরতাজউদ্দিন বললেন, বিপদ দেওয়ার মালিক আল্লাহ। বিপদ থেকে উদ্ধারের মালিকও আল্লাহ। মাগো শোন, তোমার যতদিন ইচ্ছা তুমি এই বাড়িতে থাকিবা। তোমার কোনো সমস্যা নাই।
আপনার অনেক মেহেরবানি। চাচাজি, আপনাকে চা বানায়ে দেই? চা খান।
বানাও চা বানাও। ততক্ষণ আমি তোমার ছেলে কোলে নিয়া বসে থাকব। আল্লাহপাকের রহমতের একটা সূরা আছে। সূরা আর-রাহমান। এইটা পড়ে তার মাথায় ফুঁ দিব। মাশাল্লাহ তোমার এই ছেলে সুসন্তান হবে।
চা শেষ করে ইরতাজউদ্দিন সাহেব হাঁটতে বের হলেন। তাঁর এই হাঁটা স্বাস্থ্যরক্ষার হাঁটা না। ফজরের নামাজের পর হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড় পর্যন্ত যেতে তাঁর খুব ভালো লাগে। সোহাগী নদীর পানি এই বছর দ্রুত বাড়ছে। ফুলে ফোঁপে উঠছে। প্রতিদিনই নদী বদলে যাচ্ছে। সব পরিবর্তনের মধ্যে এই পরিবর্তন দেখার মধ্যেও আনন্দ আছে।
ইরতাজউদ্দিন দেখলেন, নদীর পানি আরো বেড়েছে। বন্যা হবে না তো? নীলগঞ্জ উঁচু অঞ্চল। সহজে বন্যা হয় না। তবে প্রতি সাত বছর পরপর প্রবল বন্যা হয়। সাত বছর কি হয়েছে?
মাওলানা সাব, আপনের শইলডা। আইজ কেমুন?
ইরতাজউদ্দিন চমকে তাকালেন। নিবারণ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। এই মানুষ হাস্যমুখি। অতি দুঃসময়েও তার মুখে হাসি থাকে। অতি ভালো গুণ।
ছোটখাটো মানুষ। গায়ের রঙ গাঢ় কৃষ্ণ। মাথার ঘন চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। সাদামাটা চেহারার এই লোক গানের আসরে নিমিষের মধ্যে ঘোর তৈরি করতে পারে। এমন দরদি গলা এই অঞ্চলেই আর নাই।
তুমি কোত্থেকে নিবারণ?
নিবারণ হাসল। এগিয়ে এসে পা ছুঁয়ে প্ৰণাম করল। তার প্রণামের ভঙ্গি অদ্ভুত। আঙুল দিয়ে পা ছুঁয়ে সেই আঙুল জিভে ঠেকায়।
আমরা হইলাম বাদাইম্মা পাখি, আমরার কি কিছু ঠিক আছে? ঘুরতে ঘুরতে চইল্যা আসছি।
এখন সময় খারাপ, এখন কি আর এত ঘোরাঘুরি করা ঠিক?
কথা ঠিক। তয় একজাগায় মন টিকে না। অনেকে বলছে ইন্ডিয়া চইল্যা যাও। যাব কেন কন? এইটা আমার দেশ না?
