তিনি হাঁটতে হাঁটতে হাইকোর্টের মাজারের দিকে গেলেন। এখানে এসে বড় ধরনের চমক খেলেন। দুটা লম্বা টেবিল পেতে মিলিটারিরা অফিসের মতো করেছে। রেডিও-টেলিভিশনের ঘোষণা মতো বেসামরিক লোকজনদের কাছ থেকে অস্ত্ৰ জমা নেয়া হচ্ছে। প্রতিটি থানায় অস্ত্র জমা নেবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সমস্যা হলো অনেক থানা আছে, যেখানে কেউ নেই। বাঙালি পুলিশ থানা ছেড়ে উধাও হয়ে গেছে। সে কারণেই হয়তো বিকল্প ব্যবস্থা।
ঢাকা শহরের বেশকিছু লোক অস্ত্র জমা দিতে এসেছে। তারা মিলিটারিদের দিকে তাকাচ্ছে না। তাদের দৃষ্টি মাটির দিকে। অস্ত্ৰধারী হবার অপরাধে তারা যেন মরমে মরে যাচ্ছে।
মিলিটারিদের ভেতর থেকে একজন নির্মলেন্দু গুণের কাছে এগিয়ে এলো। ধমক দিয়ে জানতে চাইল–কী চাও তুমি?
নির্মলেন্দু গুণ বিনীতভাবে বললেন, অস্ত্র জমা দেয়া দেখি।
তুমি এই দৃশ্য দেখার জন্যে দাঁড়িয়ে আছ?
জি জনাব।
ভাগো হিয়াসে। ভাগো।
মিলিটারি হাত দিয়ে মাছি তাড়াবার মতো ভঙ্গি করল। নির্মলেন্দু গুণ হাঁটা ধরলেন। হাঁটতে হাঁটতেই ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহ থেকে নেত্রকোনা। নেত্রকোন থেকে বারহাট্টা। তার নিজের বাড়ি। এই বাড়িতেই এক নিশুতি রাতে তিনি আগ্নেয়াস্ত্ৰ নামের ছোট্ট একটি কবিতা লেখেন—
পুলিশ স্টেশনে ভিড়, আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিচ্ছে শহরের
সন্দিগ্ধ সৈনিক। সামরিক নির্দেশে ভীত মানুষের
শটগান, রাইফেল, পিস্তল এবং কার্তুজ, যেন দরগার
স্বীকৃত মানৎ, টেবিলে ফুলের মতো মস্তানের হাত।
আমি শুধু সামরিক আদেশ অমান্য করে হয়ে গেছি
কোমল বিদ্রোহী, প্রকাশ্যে ফিরছি ঘরে
অথচ আমার সঙ্গে হৃদয়ের মতো মারাত্মক
একটি আগ্নেয়াস্ত্ৰ, আমি জমা দেই নি।
ফজরের ওয়াক্তে
ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরী খুব প্ৰফুল্ল বোধ করছেন। ফজরের ওয়াক্তে এমনিতেই তিনি প্ৰফুল্ল বোধ করেন। অন্য এক ধরনের আনন্দ কিছুটা হলেও তাকে অভিভূত করে রাখে। কেন এরকম হয় তিনি নিজেও জানেন না। হয়তো নতুন একটা দিন শুরু করার আনন্দ। শুধু মানুষ না, পশুপাখি গাছপালা সবাই নতুন দিন শুরু করে। সেই সবার সঙ্গে যুক্ত থাকার আনন্দ। আজকের আনন্দের সঙ্গে বিষাদ মিশ্ৰিত আছে। তিনি তাঁর শোবার ঘর থেকে শিশুর কান্না শুনছেন। এই শিশু সব সময় কাদে না। হঠাৎ হঠাৎ কেন্দে ওঠে। আবার হঠাৎই থেমে যায়। তাঁর বাড়িতে দীর্ঘদিন কোনো শিশু কাদে নি, এই প্ৰথম কাঁদছে। জায়নামাজে বসে থেকে তার মনে হলো, শিশুর কান্নার মধ্যে পবিত্র কোনো ব্যাপার অবশ্যই আছে। যতবারই তিনি শিশুর কান্না শুনছেন, ততবারই তাঁর মন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে।
শিশুটির এখনো কোনো নাম দেওয়া হয় নি। ছদরুল আমিন সাহেবের পুত্ৰ সন্তান। ইদারুল আমিন সাহেব ছেলের মুখ দেখে যেতে পারেন নি। ছেলের জন্ম সংবাদও শুনে যেতে পারেন নি। একজন বাবার জন্যে এরচে দুঃখের কিছু হতে পারে বলে ইরতাজউদিনের মনে হয় না। তবে নিশ্চয়ই আল্লাহপাকের কোনো উদ্দেশ্য এর পেছনেও আছে।
ইরতাজউদ্দিন কমলা এবং তার পুত্রকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছেন। দেশের অবস্থা আরেকটু ভালো হলেই মা-পুত্ৰকে খুলনা দিয়ে আসবেন। কমলার মার বাড়ি খুলনার বাগেরহাটে। এই সুযোগে বাগেরহাটের খানজাহান আলির মাজারও জিয়ারত করা হবে।
ইরতাজউদ্দিন অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ অনেক বেশি সময় জয়নামাজে কাটালেন। তার সামান্য কারণও আছে। তিনি খতমে জালালি শুরু করেছিলেন। আজ সেই খতম শেষ হলো। ফজরের নামাজ শেষ করে দীর্ঘ সময় নিয়ে দেয়া করলেন। দোয়ার পরপর মনটা একেবারেই শান্ত হয়ে গেল। কদিন ধরেই মন খুব অশান্ত হয়েছিল। রাতে ভালো ঘুম হতো না। মাঝে-মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখতেন। সেইসব দুঃস্বপ্নের কোনো আগামাথা নেই। একটা দুঃস্বপ্ন খুব স্পষ্ট দেখলেন, যেন শাহেদ এসেছে নীলগঞ্জে। সে একা, সঙ্গে কেউ নেই। সে খুব রোগী হয়ে গেছে, রোগা এবং বুড়ো। কণ্ঠার হাড় বের হয়ে গেছে, ঠোঁট ফ্যাকাশে, মাথার চুল প্রায় সবই সাদা। তিনি বললেন, তোর এই অবস্থা কেন? চুল টুল পেকে বুড়ো হয়ে গেছিস, কী হয়েছে? শাহেদ জবাবে বিড়বিড় করে কী বলল, বোঝা গেল না। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, শাহেদ ক্রমাগত মাথা চুলকাচ্ছে। মাথাভর্তি উকুন। মাথা থেকে উকুন টপটপ করে মাটিতে পড়ছে।
তিনি বললেন, তুই একা কেন? ওদের কোথায় রেখে এসেছিস?
তার উত্তরেও শাহেদ বিড়বিড় করে কী বলল। তিনি বললেন, বিড়বিড় করছিস কেন? কী বলবি পরিষ্কার করে বল। কেশে গলা পরিষ্কার করে নে। তোর দেখি মাথা ভর্তি উকুন। তুই গোসল করিস না?
শাহেদ বলল, ভাইজান, বিরাট বিপদে পড়েছি। বলেই কাঁদতে শুরু করল। তখন তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। সেই রাতে তাঁর ঘুম হলো না। তিনি শাহেদকে চিঠি লিখতে বসলেন।
শাহেদ,
দোয়া গো। পর সমাচার এই, আমরা মঙ্গলমতো আছি। তোমাদের কোনো খবর না পাইয়া বিশেষ চিন্তাযুক্ত। ফুলপুর টেলিগ্রাম অফিস হইতে তোমাকে পরপর দুইটি টেলিগ্রাম করিয়াছি, কোনো জবাব পাই নাই। টেলিগ্রাম ছাড়াও তোমাকে পত্ৰ দিয়াছি, তাহারও জবাব পাই নাই।
নীলগঞ্জের অবস্থা এখন মোটামুটি ভালো। প্রথম দফায় জনৈক আধাপাগল সামরিক অফিসার নীলগঞ্জে কয়েক ঘণ্টার জন্য এসেছিলেন। তিনি কোনোরকম কারণ ছাড়াই কিছু মানুষ মেরে ফেলেছেন। তার মধ্যে নীলগঞ্জ থানার ওসি ছদরুল আমিন সাহেবও ছিলেন। আল্লাহর অশেষ রহমত উনি অতি অল্প সময়েই প্ৰস্থান করেছেন। বর্তমানে নীলগঞ্জ থানায় একদল মিলিটারি অবস্থান করিতেছে। তাহাদের প্রধান একজন ক্যাপ্টেন, নাম মুহাম্মদ বাসেত। অতি ভদ্র ও সজ্জন। সবচেয়ে বড় কথা ধর্মপ্রাণ। গত জুম্মার দিনে তিনি সকলের সঙ্গে জুম্মার নামাজ আদায় করিয়াছেন। খোতবার শেষে তিনি ইংরেজিতে একটা বক্তৃতা দিয়াছেন। বক্তৃতাটি আমার বিশেষ পছন্দ হইয়াছে। তিনি বলিয়াছেন–বহু দুঃখ ও বহু কষ্টে আমরা ইংরেজের গোলামি হইতে মুক্ত হইয়াছি। এখন আবার নতুন চক্রান্ত শুরু হইয়াছে। আমাদের সবাইকে সেই চক্রান্ত সম্পর্কে সাবধান থাকিতে হইবে। একজন মুসলমান অন্য আরেকজন মুসলমানের ভাই। ভাই সবসময় থাকিবে ভাইয়ের পাশে। এক ভাই যদি ভুল করে অন্য ভাই তাহা শুধরাইয়া দিবে।
