মোশতাক আহমেদ মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছেন— খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। গ্রামে বাজার-হাটের সুবিধা নেই। চট করে কিছু জোগাড় করা মুশকিল। এখানে সব জোগাড় হয়েছে। দুটা খাসি জবেহ হয়েছে। রান্নাও শুরু হয়েছে। রুটিগোশত করা যাচ্ছে না, চাল-গোশত হচ্ছে। বাঙালের দেশে এসে বাঙালি ব্যবস্থা। ক্ষুধার্ত অবস্থায় কোনো খাবারই খারাপ লাগবে না।
মোশতাক আহমেদ চুরুট ধরিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। এখন আকাশ পরিষ্কার। তারায় তারায় ঝলমল করছে। ঐ তো দেখা যাচ্ছে সপ্তর্ষিমণ্ডল। শহর থেকে সপ্তর্ষিমণ্ডল ভালোমতো দেখা যায় না। এই সাতটি তারা দিগন্তরেখার কাছাকাছি। এদের দেখতে হলে খোলা জায়গায় যেতে হবে। থানা কম্পাউন্ডটা খুব খোলামেলা। দুশ গজের ভেতর গাছপালার সংখ্যা কম। বর্তমান সময়ের জন্য এটা খুব জরুরি। প্রতিটি থানাকে থাকতে হবে থ্রি নট থ্রি রাইফেল রেঞ্জের বাইরে। গাছপালার কভারে কোনো অতি-উৎসাহী যেন গুলি করার স্পর্ধা না করে।
মগভর্তি এক মগ কফি মোশতাক আহমেদের পাশে এনে রাখা হলো। কফি নিয়ে এসেছেন নীলগঞ্জ থানার সেকেন্ড অফিসার ফরিদ উদ্দিন। থানার চার্জ বর্তমানে তাকে দেওয়া হয়েছে। ফরিদ উদ্দিন মেজর সাহেবের সামনে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চলে যেতে পারছেন না, আবার দাড়িয়ে থাকতেও পারছেন না। তার পা অল্প অল্প কাপছে। তিনি যেন তার সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যু দেখতে পাচ্ছেন। মোশতাক আহমেদ কফির মাগে চুমুক দিয়ে বললেন, Do you have something in your mind?
প্রশ্ন না বুঝেই ফরিদ উদ্দিন বললেন, Yes sir.
Speak out.
ফরিদ উদ্দিন আগে যেমন দাঁড়িয়ে ছিলেন, এখনো তেমনি দাঁড়িয়ে রইলেন। মেজর সাহেব হাতের ইশারায় তাকে চলে যেতে বললেন। সেই ইশারাও তিনি বুঝতে পাবলেন না। ফরিদ উদিনের মাথা আসলে এলোমেলো হয়ে গেছে। এখনো তাঁর বিশ্বাস হচ্ছে না, এমন নির্বিকার ভঙ্গিতে এতগুলি মানুষকে মেরে ফেলা যায়! নদীর পাড়ে নিয়ে লাইন করে দাঁড়া করাল। কী হচ্ছে বোঝার আগেই একজন হাই তুলে বলল, ফায়ার। দ্রুত বাজনার মতো কিছু গুলি হয়ে গেল। গুলি করা হচ্ছে তাও ফরিদ উদ্দিন বুঝতে পারেন নি। পুরো ব্যাপারটা মনে হচ্ছে স্বপ্লের মধ্যে ঘটে গেছে। কে জানে, হয়তো স্বপ্লই। স্বপ্ন ছাড়া বাস্তবে এত ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে না। বাস্তবে কেউ হাই তুলতে তুলতে ফায়ার বলে না। হাই তোলার ব্যাপারটা বানানো না। যে ফায়ার বলেছে তিনি তার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। তালগাছের মতো লম্বা একটা মানুষ। পাতলা গোফ আছে। নিচের ঠোঁটে শ্বেতীর দাগ। ফরিদ উদ্দিন নিশ্চিত জানেন–বাকি জীবনে তিনি অসংখ্যবার দুঃস্বপ্নের ভেতর এই মানুষটাকে দেখবেন।
মেজর সাহেব। আবারো হাত ইশারা করে ফরিদ উদ্দিনকে যেতে বললেন। কফি খেতে ভালো হয়েছে। তিনি একা একা আরাম করে কফি খেতে চান। ক্ষুধা নষ্ট করার জন্যও কফি দরকার। রাতের খাবার খেতে দেরি হবে।
ফরিদ উদ্দিন থানায় ওসি সাহেবের চেয়ারে বসে আছেন। তাঁর খুব ঘাম হচ্ছে। থানার ভেতর মিলিটারিদের কেউ নেই। দুজন কনস্টেবল আছে–তারা ংশুমুখে বসে আছে লম্বা বেঞ্চটায়। ফরিদ উদ্দিনের সামনের চেয়ারে বেশ আয়েশ করে বসে আছে হারুন মাঝি। মেজর সাহেব সব হাজতিদের ছেড়ে দেওয়ার হুকুম দিয়েছেন।
সব হুকুমই মুখে। কাগজপত্রে কিছু নেই। পরবর্তীতে এই নিয়ে নিশ্চয়ই ঝামেলা হবে। এক ফাঁকে জেনারেল ডায়েরিতে লিখতে হবে–মেজর মোশতাক আহমেদের মৌখিক নির্দেশে থানার সকল হাজতিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। হাজতিদের মধ্যে ছিল কুখ্যাত ডাকাত হারুন মাঝি।
নদীর পাড়ে যে হত্যাকাণ্ডগুলো হয়–তার কথাও লেখা থাকা দরকার। কীভাবে লিখবেন? ঘটনার সময় তিনি নিজে উপস্থিত ছিলেন। কোনো এক সময় যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়–পুলিশের উপস্থিতিতে এমন ঘটনা ঘটল, পুলিশ কেন বাধা দিল না? স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তো পুলিশের। তাকে যদি বলা হয়, ফরিদ উদ্দিন, দণ্ডবিধির ৩২৪ নম্বর ধারায় তুমি কেন মিলিটারিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে না? ৩২৪ নম্বর ধারা তো অতি স্পষ্ট, বিপজ্জনক অস্ত্র দ্বারা বা বিপজ্জনক উপায়ে ইচ্ছাকৃত আঘাত করা। ১৪৮ ধারায় মামলা হতে পারে–মারাত্মক অন্ত্রে সজ্জিত হইয়া দাঙ্গা।
ওসি সাহেব!
ফরিদ উদ্দিন চমকে উঠলেন। হারুন মাঝি হাত বাড়িয়ে বসে আছে। হারুন মাঝির মুখ হাসি হাসি। ফরিদ উদ্দিন বললেন, কী হয়েছে?
বিড়ি সিগারেট কিছু একটা দেন ওসি সাহেব, দুইটা টান দেই।
ফরিদ উদ্দিন কথা বাড়ালেন না। একটা সিগারেট এগিয়ে দিলেন। তার নিজেরও সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছে না।
অবস্থা তো ওসি সাহেব গুরুতর।
হুঁ।
এক কথায় আটজনের মৃত্যু–সাক্ষাৎ আজরাইল। কী বলেন ওসি সাহেব?
হুঁ!
এর নাম পাক-মিলিটারি, ইচ্ছা হইল গুলি কইরা হিসাব শেষ কইরা দিল। নগদ হিসাব। বাকির কারবার নাই।
বেশি কথা বলিস না হারুন। হারুন মাঝি গলা নামিয়ে বলল, মৃত্যুর সময় আমরার আগের ওসি সাহেব কী করল? কান্দাকাটি কবল?
জানি না।
জানেন না বললেন ক্যান? আপনে তো লগে ছিলেন।
না, আমি ছিলাম না।
কয়েকটা হিন্দু ধইরা আনতে বলল – আপনে না ধইরা আনলেন?
ফরিদ উদ্দিন তিক্ত গলায় বললেন, হারুন, সময় খুবই খারাপ। কথা যত কম বলবি তত ভালো। তোকে ছেড়ে দিয়েছে–তুই চলে যা। ডাকাতি শুরু কর। এত কিসের কথা?
