চুপ থাক।
ভুখ লাগছে তো। ফাঁস দিলে ফাঁস দিবেন। না খাওয়াইয়া মারবেন–এইটা কেমন বিচার?
হারামজাদা চুপ।
হারুন মাঝি হেসে ফেলল। তার গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। সুন্দর মায়া কাড়া চেহারা। এই লোক ঠাণ্ডা মাথায় দশ-বারোটা খুন করেছে ভাবাই যায় না। ছদরুল আমিন বললেন, ঘরে অসুবিধা আছে। পাক হয় নাই।
না খাইয়া থাকমু? চিড়া-মুড়ির ব্যবস্থা করেন।
চিড়া-মুড়ির ব্যবস্থা অবশ্যি করা যায়। সেটাই ভালো হয়। তিনি খানিকটা খেয়ে নেবেন। উতারের জন্যেও কাউকে পাঠাতে হবে। তিনি আশপাশে কোনো কনষ্টেবল দেখলেন না। কী দিন ছিল আর কী দিন হয়েছে। আগে চব্বিশ ঘণ্টা সেন্ট্রি ডিউটি থাকত। ঘন্টায় ঘণ্টায়। ঘণ্টি পিটে সময় জানানো হতো। গ্রামের মানুষ থানা-ঘন্টি শুনে সময় বুঝত। আজ কিছুই নেই। ছদরুল আমিন থানার বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন–আর তখনি চোখে পড়ল দুটা জিপ আর তিনটা ট্রাক আসছে। আস্তে আস্তে আসছে। রাস্তা ভালো না–দ্রুত আসার উপায়ও নেই। তার বুক ধ্বক করে উঠল— মিলিটারি। আসছে! ইয়া গফরুর রহিম-মিলিটারি।
মিলিটারি কনভয় নিয়ে যাচ্ছিলেন পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মেজর মোশতাক। তার গন্তব্য ভৈরব। হঠাৎ তাকে বলা হলো ভৈরব না গিয়ে নীলগঞ্জ থানায় হল্ট করতে। কারণ কিছুই ব্যাখ্যা করা হলো না। ওয়ারলেসের সংক্ষিপ্ত ম্যাসেজ। পথে কোনো ঝামেলা হয়তো আছে। ছোটখাটো ঝামেলা তৈরি হচ্ছে। গুরুত্বহীন ঝামেলা। অতি উৎসাহী কিছু ছেলে।পুলে মিলিটারি কনভয় দেখে থ্রি নট থ্রি রাইফেলে গুলি ছুঁড়ে বসল। হাস্যকর কাণ্ড তো বটেই। হাস্যকর কাণ্ডগুলোর ফলাফল মাঝে মাঝে অশুভ হয়। তবে এখনো তার ইউনিটে কিছু হয় নি। বাঙালি সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করেছে বলে শোনা যাচ্ছে। সরাসরি যুদ্ধে নেমে পড়েছে এমন খবর নেই। তাদের কাছে অস্ত্রশস্ত্ৰও নেই। অন্ত্রের সমস্যা তারা অবশ্যি মিটিয়ে ফেলতে পারবে। গায়ের সঙ্গে গা লেগে আছে হিন্দুস্থান। পাকিস্তানকে একটা শিক্ষা দেবার জন্যে ১৯৪৭ সাল থেকেই তারা খাপ ধরে বসে আছে। এই তাদের সুযোগ। মুর্থ বাঙালি বোঝে না হিন্দুস্থান আসলে কী চায়। তারা পূর্ব পাকিস্তান গিলে খেতে চায়। তবে সেই সুযোগ তারা পাবে না। উচিত শিক্ষা তাদের দেয়া হবে। সেই সঙ্গে উচিত শিক্ষা দেয়া হবে বদমাশ বাঙালিদের।
প্রবল ঝাকুনি খেয়ে মেজর মোশতাকের জিপ থেমে গেল। তিনি জানালা দিয়ে বিরক্তমুখে গাড়ির চাকা দেখার চেষ্টা করলেন। বোঝাই যাচ্ছে চাকা পাংচার হয়েছে। মিনিট দশেক সময় নষ্ট হবে। চলন্ত কনভয়ের কাছে মিনিট দশোক সময় অনেক সময়। এই সময়ে বড় ধরনের অঘটন ঘটে যেতে পারে। দেশে গেরিলা একটিভিটিজ নেই। যদি থাকত তিনি তার বাহিনীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে সতর্ক অবস্থায় নিয়ে যেতেন। এখন তেমন সাবধানতা গ্রহণের সময় আসে নি। দরিদ্র একটা অঞ্চলের কাঁচা রাস্তা। দুপাশে ধানক্ষেত। ভয়ের কিছুই নেই। মেজর সাহেব জিপ থেকে নেমে গাড়ির চাকার বদল দেখতে লাগলেন। গরমে শরীর ঘেমে যাচ্ছে। নীলগঞ্জ থানায় রাত কাটাতে হলে একটা শাওয়ার নেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
গত তিনদিন ধরে তিনি খাকি পোশাক গায়ে নিয়ে ঘুরছেন। শরীর ঘামছে। সেই ঘাম শরীরে শুকিয়ে যাচ্ছে। কুৎসিত অবস্থা। গত সপ্তাহের নিউজ উইক সঙ্গে আছে–এখনো পড়া হয় নি। রাতে পড়া যেতে পারে। গাড়ির চাকা বদলাতে অনেক সময় লাগল। সব কী রকম ঢিলাঢ়ালা হয়ে গেছে। যুদ্ধ অবস্থায় কোচকালেন। মনের বিরক্তি প্ৰকাশ করলেন না।
নীলগঞ্জ থানার ওসি মেজর সাহেবকে স্যালুট দিলেন। তার পেছনে তিনজন কনষ্টেবল। তারা প্রেজেন্ট আর্ম ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।
মেজর সাহেব বললেন, সব ঠিক হ্যায়?
ছদরুল আমিন বললেন, ইয়েস স্যার।
ভেরি গুড। হোয়াটস ইয়োর নেম?
ছদরুল আমিন।
নাম তো বহুত আচ্ছ হ্যায়।
মেজর মোশতাক আবারো হাসলেন। ছদারুল আমিনের বুকের রক্ত এবং পেটের ক্ষুধা দুই-ই মিলিটারি দেখে পানি হয়ে গিয়েছিল। মেজর সাহেবের মুখের হাসি দেখেও লাভ হলো না। বুক ধ্বক ধ্বক করেই যাচ্ছে।
মেজর সাহেব হ্যান্ডশোকের জন্যে হাত বাড়ালেন; ছদারুল আমিন হ্যান্ডশেক করলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, ডরতা কেউ ডরো মাৎ।
এই ঘটনা ঘটল দুপুর তিনটায়। বিকেল পাঁচটায় ঘটল সম্পূর্ণ অন্য ঘটনা। ছদরুল আমিনকে সোহাগী নদীর কাছে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হলো। ছদরুল আমিন সাহেব একা ছিলেন না। তাঁর সঙ্গে ছিল পাঁচজন হিন্দু, দুজন আনন্দমোহন কলেজের ছাত্র–এরা মুসলমান।
মৃত্যুর আগে আগে ছদরুল আমিন একটা ব্যাপার নিয়ে ভাবছিলেনউতার আনতে যাকে পাঠানো হয়েছে, সে কি এসেছে?
মৃত্যুর আগে মানুষ কত কী ভাবে–তার মাথায় শুধু ঘুরতে লাগল। উতার–এর পানি। উতার শব্দটা বারবার উচ্চারণ করতেও তাঁর খুব মজা লাগছিল।
নীলগঞ্জ থানা কম্পাউন্ড খুব জমজমাট। গেটে মিলিটারি সেন্ট্রি। থানার মূল বিল্ডিং-এর বারান্দায় দুটা পেট্রোম্যাক্স জুলছে। রাজ্যের পোকা এসে জড়ো হয়েছে। পোকাদের আনন্দের সীমা নেই।
থানার পেছনেই বঁধানো কুয়া। কুয়ার পাশে মেজর সাহেবের থাকার জন্য তাঁবু খাটানো হয়েছে। আজ রাত মেজর সাহেবকে নীলগঞ্জে থাকতে হবে। মেজর মোশতাক আহমেদ তার তাবুর সামনে চেয়ারে বসে আছেন। টুলের উপর পা তুলে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করছেন। তিনি গা থেকে দুদিনের বাসি কাপড় এখনো খোলেন নি। তবে শিগগিরই খুলবেন। তাঁর গোসলের জন্য কুয়া থেকে বালতিভর্তি ঠাণ্ডা পানি তোলা হয়েছে। তিনি মানে যাওয়ার আগে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চান যে, তার দলটির রাতে থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। জোয়ানদের রাতে ঘুমানোর ব্যাপারটা তেমন জরুরি নয়, তবে খাওয়ার ব্যবস্থােটা জরুরি। পুরো দলটি বলতে গেলে সারাদিন না খাওয়া।
