মিলিটারি কি এইখানেই থাকব?
জানি না।
আগের ওসি সাহেবের যে সন্তান হওনের কথা ছিল সেই বিষয়ে কিছু জানেন? সন্তান হইছে?
জানি না।
উতারের পানির জন্য ওসি সাহেব লোক পাঠাইছিল। পানি নিয়া আসছে কিনা জানেন না?
হারুন, চুপ।
জি আইচ্ছা, এই চুপ করলাম। দেন, আরেকটা সিগ্রেট দেন।
ফরিদ উদ্দিন নিঃশব্দে আরেকটা সিগারেট দিলেন। হারুন মাঝি প্রথম সিগারেটের আগুন দিয়ে সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, আমরার আগের ওসি সাহেব, ছদরুল সাহেব বিরাট সাহসী লোক ছিল। বাঘের কইলজা ছিল।
ফরিদ উদ্দিন জবাব দিলেন না। হঠাৎ করে তাঁর প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। তিনি মাথা তুলতেই পারছেন না। এরকম কখনো হয় না। আজ কেন হচ্ছে?
ওসি সাহেব, ছদরুল স্যার আমারে ক্যামনে ধরছে হেই গল্প শুনেন। সে এক ইতিহাস।
ইতিহাস বলতে হবে না। চুপ করে থাক।
আমি গেছি আমার বড় শ্যালকের বাড়িত। তার একটা পুত্রসন্তান হয়েছেসংবাদ পেয়ে গিয়েছি। সন্তানের মুখ দেখে একশ টাকার একটা চকচকা নোট দিলাম। শ্যালক বলল, দুলাভাই রাতটা থাকেন–ভালোমন্দ চারটা খান। আমি রাজি হইলাম। শেষ রাইতে বাড়ি ঘেরাও দিল পুলিশে। ব্যাগের ভিতরে আমার গুলিভরা বন্দুক। টান দিয়া হাতে নিতেই দরজা খুইল্যা ওসি সাহেব ঢুকলেন। বললাম, ওসি সাব, গুলি কইরা দেব। ওসি সাহেব বললেন, কর, গুলি কর। বন্দুকের সামনে এই রকম কথা বলা সহজ না। কইলজা লাগে। বাঘের কইলজা লাগে। ওসি সাহেবের ছিল বাঘের কইলজা।
হারুন, আর কথা না। আরেকটা কথা বললে হাজতে নিয়ে ঢোকাব।
হারুন মাঝি দাত বের করে হাসতে হাসতে বলল, এইটা পারবেন না! মিলিটারি মুক্তি দিছে, আফনের কিছু করনের ক্ষ্যামতা নাই। ছদারুল আমিন স্যার হইলেও একটা কথা ছিল। তার ছিল বাঘের কইলজা। আর আফনের হইল খাটাসের কইলজা। হিহিহি। মনে কষ্ট নিয়েন না। ওসি সাব। সত্য কথা শুইন্যা মনে কষ্ট নিতে নাই।
রান্না হয়ে গেছে। জোয়ানদের খাবার দেওয়া হচ্ছে। মেজর সাহেব কুয়ার পাড়ে গোসল করছেন। তিনি সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে নিচু একটা জলচৌকিতে বসে আছেন। দুজন ব্যাটম্যান হিমশীতল পানি বালতি বালতি তুলে তার মাথায় ঢালছে। স্নানপর্ব মেজর সাহেবের অসাধারণ লাগছে। শরীরের ক্লান্তি সম্পূর্ণ দূর হয়ে গেছে। এখন নেশার মতো লাগছে। কয়েকটা বিয়ার খেয়ে নিলে হতোব্যাপারটা আরো জমত। সঙ্গে বিয়ার নেই। এক বোতল ভদকা আছে, ভালো এক বোতল ফ্রেঞ্চ ওয়াইন আছে। ওয়াইনের বোতলটা আনন্দময় উৎসবের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। সেই আনন্দময় উৎসবের তারিখটা হলো মে মাসের এগারো তারিখ, তার ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি। রোজিনা তাকে বলে দিয়েছে–সে যেভাবেই হোক মে মাসের এগার তারিখে বাঙািল মুলুকে উপস্থিত হবে। তের বছরের বিবাহিত জীবনে সব ম্যারেজ ডে-তে তারা একসঙ্গে ছিলেন। এ বছর ব্যতিক্রম হবে না। যুদ্ধবিগ্রহের এই ভয়াবহ সময়ে রোজিনা কী করে বাঙাল মুলুকে আসলে তিনি জানেন না। তবে এসে যেতে পারে। রোজিনার বুদ্ধি ও সাহস সীমাহীন। তারচে বড় কথা রোজিন লে. জে. গুলহাসান খানের ভাগ্নি। পাকিস্তানের লেফটেনেন্ট জেনারেলরা অনেক কিছু পারেন।
গোসল করতে করতেই ওয়্যারলেসে খবর এলো–কর্নেল মোশতাককে তার দল নিয়ে এই মুহুর্তেই দুর্গাপুরে রওনা হতে হবে। কর্নেল সাহেব খবরটা শুনে নিচু গলায় বললেন, বাস্টার্ডস! কাদেরকে বললেন তা বোঝা গেল না।
দলটাি দুৰ্গাপুরের দিকে রওয়ানা হলো রাত তিনটায়। সেই সময়ই ওসি ছদরুল আমিন সাহেবের স্ত্রী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন। শিশুটির ফুসফুসে অসম্ভব জোর। সে ওঁয়া ওঁয়া চিৎকারে থানা কম্পিাউন্ড মাতিয়ে দিল। জিপে উঠতে উঠতে কর্নেল সাহেল সেই ওঁয়া ওঁয়া চিৎকার শুনলেন। চিৎকার শুনেই বোঝা যাচ্ছে নিউবর্ন বেবি। নিউবর্ন বেবির কান্নার শব্দ অত্যন্ত শুভ। কর্নেল সাহেবের যাত্রা শুভ হবে। তিনি আনন্দিত মুখে জিপে উঠে বসলেন।
সকাল থেকে বিরামহীন বৃষ্টি
সকাল থেকে বিরামহীন বৃষ্টি। দুপুরে একটু থেমেছিল। বিকেলে আবার আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামল। আসমানী বৃষ্টি দেখছিল। দারোগাবাড়ির টানা বারান্দায় দাঁড়ালে চোখ অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায়। খোলা প্রান্তরে বৃষ্টি দেখতে অন্যরকম লাগে। সাদা একটা পর্দা যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছে। বাতাস পেয়ে পর্দাটা কাঁপতে থাকে, একেবেঁকে যায়। বড় অদ্ভুত লাগে। শহরে বসে এই বৃষ্টি দেখা যায় না। দোতলা বারান্দা থেকে দেখা যাচ্ছে রুনি ভিজছে। পা টিপে টিপে বাগানে নেমেছে। ফুল ছেড়ার চেষ্টা করছে। বেলি ফুল। সরফরাজ সাহেবের চোখে পড়লে প্ৰচণ্ড ধমক খাবে। ধমকের চেয়েও যেটা বড়–আবারো জ্বরজারি হবে। কয়েকদিন আগে মাত্র জ্বর থেকে উঠেছে। মেয়েটাকে শক্ত ধমক দেওয়া দরকার, ধমক দিতে ইচ্ছা করছে না। বাচ্চাদের শাসন করার সময় বাবা-মা দুজন থাকতে হয়। একজন শাসন করবে, আরেকজন আদর দিয়ে তা পুষিয়ে দেবে। এখানে আদরের কে আছে? শাহেদের কথা মনে করে আসমানীর চোখে পানি এসে পড়ার মতো হলো। সে নিজেকে সামলাল। কথায় কথায় চোখে পানি ফেলার মতো সময় এখন নয়। এর চেয়ে বরং বৃষ্টি দেখা ভালো। আচ্ছা বৃষ্টি যে চাদরের মতো পড়ে–এটা কোনো লেখকের লেখায় আসে নি কেন? সব লেখকই কি শহরবাসী? শাহেদের সঙ্গে দেখা হলে বৃষ্টির চাদরীরূপেব কথা বলতে হবে। সে এখন কোথায় আছে? যেখানে আছে সেখানে কি বৃষ্টি হচ্ছে? শাহেদ কি দেখছে? মনে হয় না। শাহেদের মধ্যে কাব্যভাব একেবারেই নেই। বর্ষা-বাদলার দিনে সে কাথামুড়ি দিয়ে ঘুমোতে পছন্দ করে। ঘুম ভাঙলে মাথা উঁচু করে বলে, এই একটু খিচুড়ি-টিচুড়ি করা যায় না? বেগুনভাজা দিয়ে খিচুড়ি হেভি জমতো। মানুষটার খাওয়া-দাওয়ার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। খিচুড়ি জমবে ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে, ভুনা গোশত দিয়ে। বেগুনভাজা দিয়ে খিচুড়ি আবার কী?
