বেকুবদের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়। ঐ মন্দিরের কত ছবি কতজনের কাছে আছে সে হিসেব হয়ত মনেই থাকবে না।
আর একটু এগোতেই শেরে-বাংলা ফজলুল হকের মাজার, তাঁর পাশে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিন। জীবদ্দশায় ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী পূর্ব বাংলার স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছিলেন। নানাভাবে নানা সময়ে সেজন্য তাদেরকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কোপদৃষ্টিতে পড়ে লাঞ্ছনা সইতে হয়েছিল। পক্ষান্তরে খাজা নাজিমুদ্দিনের সমগ্র জীবনে একটি কর্মও নেই যার সঙ্গে বিশেষ করে বাঙালির স্বার্থ জড়িত ছিল। অতএব এই দুই দেশ-নায়কের পাশে খাজা নাজিমুদ্দিনের নাম উঠতেই পারে না। এই নিয়ে ক্লাবের আড়ায় একদিন তর্ক উঠেছিল মাজারের কাছে আসতেই সে কথা সুদীপ্তর মনে পড়ল। না, নিজে তিনি তর্কে যোগ দেন নি। কেননা এ সব রাজনীতির ব্যাপার ভালো বোঝেন না তিনি। বস্তুতঃ নিজে তিনি তাই মনে করেন। তাই চুপচাপ তিনি শুনেছিলেন ওদের কথা। একজনের বক্তব্য ছিল–
শেরেবাংলা-সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে নাজিমুদ্দিনের মাজার কেমন খাপ ছাড়া দেখায় বরং ওটা করাচীতে জিন্না কিংবা লিয়াকত আলির পাশে মানানসই হত।
তা যদি বলেন, তবে সোহরাওয়ার্দীর কবর হওয়া উচিত ছিল কলকাতায়। শরৎ বোসের সঙ্গে স্বাধীন যুক্ত-বাংলার কথা তুলে এক সময় ভদ্রলোক জন্মলগ্নেই পাকিস্তানকে ছুরিকাঘাত করতে চেয়েছিলেন।
এবং ঠিক ঐ কাজটির জন্যই সোহরাওয়ার্দীর আর সকল ভুলভ্রান্তি চাপা পড়ে যাবে। তিনি ভবিষ্যৎ বাঙালির কাছে ন্যাশনাল হিরোর মর্যাদা পাবেন।
প্রতিপক্ষ এ কথায় ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। ঘটনাটা উনিশ শশা ঊনসত্তরের মার্চের। তখন পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করার কল্পনা কারো মাথায় ছিল না। কোনো কালেই কি সে কল্পনা কারো মাথায় জাগত? একাত্তরে এসে যদি ইয়াহিয়া-টিক্কার গণহত্যা শুরু না হত তা হলে? পঁচিশে মার্চের ওই হত্যাকাণ্ডের পর সোহরাওয়ার্দী-শরৎ বসুর সেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের চিন্তা এখন অধিকাংশ বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে পেয়ে বসেছে। বুদ্ধিজীবীদের দোষ নেই। পাকিস্তানিরা তো প্রমাণ করে দিয়েছে, বাংলা ও পাকিস্তান দুটো আলাদা দেশ। বাংলাকে ওরা যদি বিদেশই না ভাববে তা হলে এমন নির্বিচার গণহত্যা সেখানে চালাতে পারে! যতোই অমানুষ হোক, নিজের দেশের লোককে এমন কুকুর-শেয়ালের মতো তাড়িয়ে ধরে মারতে পারে কেউ?
১৬. ওরা হাইকোর্টের কাছে গাড়ি ঘুরিয়ে
ওরা হাইকোর্টের কাছে গাড়ি ঘুরিয়ে শান্তিনগরের দিকে মোড় নিলেন। রাজারবাগ পুলিশের সদর দফতর দেখলেন। দেয়ালে প্রকান্ড আয়তনের গর্তগুলি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিকট মুখভঙ্গির প্রতীক হয়ে তাদের দিকে ব্যঙ্গ ছুঁড়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের বাড়িঘরগুলির উপর কি অবাধ অধিকার। যেখানে ইচ্ছে কামান দেগে বড়ো বড়ো ফুটো বানিয়ে দাও। যেখানে ইচ্ছে আগুন দাও। ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দাও। যা তোমার মর্জি।…মনে মনে অসম্ভব রকমের তেতে উঠলেন ফিরোজু। ওদের মর্জির উপর আমাদের জীবন? ইস, কিভাবে আগুন দিয়ে সারা এলাকাটাকে জ্বালিয়েছে। পুলিশরাও সব আওয়ামী লীগের লোক ছিল নাকি! সকালবেলার হাসিম শেখের কথা সুদীপ্ত স্মরণ করলেন। আর ফিরোজ? তিনি তখন ভাবছিলেন, এখানে কয়েকটি ছবি নেওয়া যায় না? ওরে। বাবা, লোহার টুপিধারী খবিশগুলো রাইফেল হাতে কিভাবে তাদের পানে তাকাচ্ছে দেখেছ। অন্য কেউ কোথাও না থাক, খবিশগুলো ঠিকই আছে। ফিরোজ তার গাড়ির গতি সামান্য একটু মন্থর করেছিলেন মাত্র। একেবারে থামান নি। কিন্তু একজন সৈনিক তাকে একেবারেই থামবার নির্দেশ দিল। অগত্যা থামতে হল। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মতো এখানেও আবার। গাড়ি-তল্লাশি হবে বোধ হয়। অতএব গাড়ি থামতেই ওরা নামলেন। প্রথমে। নামলেন সুদীপ্ত, তারপর ফিরোজ। এবং ফিরোজ নেমে মেয়েদের নামার পথ। করে দিতে গেলেন। কিন্তু থমকে গেলেন সুদীপ্তর অবস্থা দেখে। সুদীপ্ত নামতেই রাইফেলের নল এসে ঠেকেছিল তার বুকে। গুলি করবে নাকি! ফিরোজ বিবর্ণ হয়ে গেলেন। কি অদ্ভুত প্রশ্ন রে বাবা।
তোম বাঙালি হ্যায়, না বিহারী হ্যায়, না হিন্দু হ্যায়? বোলো।
তুমি বাঙালি? না বিহারী? না হিন্দু?—এ কোন ধরনের শ্রেণীকরণ? শ্রেণীকরণ সম্পর্কে জ্ঞান থাকে কাদের? কিন্তু এতো সব প্রশ্ন নিয়ে আন্দোলিত হবার অবকাশ তখন সুদীপ্তর ছিল না। এই মুহূর্তে সামান্য ভুলের মাশুল অতি চরম হতে পারে। তিনি এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই কেমন একটা অলৌকিক শক্তি আয়ত্ত করেছেন যেন। ঠিক সময়ে ঠিক উত্তরটি মুখে এসে যায়। তিনি বললেন–
হাম মুসলমান হায়, হাম পাকিস্তানি হ্যায়।
কিন্তু না। এ উত্তরে পাকিস্তানি জওয়ান খুশী হল না। এ ধরনের ঘোরাননা প্যাচানো জবাব সে জানেন, কেউ তেমন জবাব দিলে তা সে বরদাশত করতেও মা রাজী নয়। অতএব সুদীপ্তকে একটা ধমক খেতে হল। ওই সব চলবে না। সোজা আমার জবাব দাও।
সিধা বাত কাহো।
সুদীপ্ত তখন সিধা কথাই বললেন–না, সবটাই তার সত্য নয়। কিছুটা। সত্য, এবং অনেকখানিই মিথ্যা। তিনি বললেন, তিনটের কোনোটাই তিনি নন। তিনি কলকাতা থেকে এসেছেন, তিনি মোহাজের। তবে তার পূর্বপুরুষ বিহারী ছিলেন বটে। কিন্তু দাদার আমল থেকে ঢাকায় আশ্রয় নিয়েছেন।
আচ্ছা ঠিক আছে। তোমাকে তা হলে এখন ছাড়া যায় মনে হচ্ছে। সুদীপ্তকে ছেড়ে রাইফেলের নল এবার প্রসারিত হলো ফিরোজের পানে। ফিরোজ আবার উর্দু বলতে পারেন না। হয়তো শিখলে পারতেন। শেখেন নি। পশ্চিম পাকিস্তানিরা যেমন বাংলা শিখতে চায় না, তেমনি আমাদের উর্দু শিখতে চাওয়া উচিত নয়।—এমনি একটা যুক্তি ফিরোজের দিক থেকে ছিল। কিন্তু ফিরোজের যুক্তি সকল বাঙালি মানেন না। তাঁরা পাল্টা যুক্তি খাড়া করেন–তুমি অধম, তাই আমি উত্তম হইব না কেন? হাঁ, তাই হও। চিরকাল। উত্তম হতে গিয়েই তো মরেছ বাবা।
