কিন্তু এটা কি মুসকিলে পড়া গেল! পাকিস্তানি পতাকা লাগিয়ে গাড়ি বের করতে হবে এমন তো জানা ছিল না ফিরোজের। এর জন্য আবার শাস্তি পেতে হবে না তো! হলে তা কি ধরনের। মনে মনে একটু তিনি ঘাবড়ে গেলেন বৈ কি। কিন্তু ঘাবড়াবার সময় তো ছিল না। এখন কৈফিয়ৎ দিতে হবে! হাঁ, গাড়ি সার্চ হবে। সে পরের কথা। তার আগে কৈফিয়ৎ দাও, তোমার গাড়িতে ঝাণ্ডা নেই কেন? জানতাম না বললে রেহাই মিলবে না—ফিরোজ জানতেন। অতএব বুঝতে চেষ্টা করলেন—
সকলেরই গাড়িতে পতাকা লাগানোর অধিকার তো নেই। সে অধিকার থাকতেও নেই।
ফিরোজ পরিষ্কার ইংরেজিতে তার বক্তব্য পেশ করলে পাকিস্তানি জওয়ান তার কিছুই বুঝল না। তবু প্রচুর বুঝেছে এমনি ভান করে বলল–
নেহি। তোম হামারা সাথ মে চালো।
তোমার ও-সব কিছু শুনতে চাই নে। আমার সঙ্গে চল। যেতে হল। দুজন মহিলা ও তিনজন শিশু নিয়ে ফুটপাথের উপর একাকী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন সুদীপ্ত। ফিরোজ গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কেন্দ্রের অভ্যন্তরে, যেখানে সেনাবাহিনীর একজন মেজর ছিলেন। এবং ফিরোজের সৌভাগ্য। মেজরটি ছিলেন করাচীর অধিবাসী, জাতিতে বালুচ। তিনি ফিরোজের বক্তব্য শুনলেন। এবং জওয়ানটিকে আদেশ দিলেন—গাড়িতে ঝাণ্ডা থাকার দরকার নেই। যাও। জওয়ানটি ফিরে এসে প্রত্যেকটি গাড়ি থেকে। পতাকা নামিয়ে ফেলার হুকুম জারি করল। কিন্তু ফিরোজের পেছনের গাড়িটা ছিল হাইকোর্টের একজন জাস্টিসের। তার গাড়ি থেকেও পতাকা নামাতে হবে। নাকি। না বললেও চলে, তার গাড়িতে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা ছিল না, ছিল হাইকোর্টের নিজস্ব পতাকা। এ আবার কী ধরনের ফিলাগ? জওয়ানটি কয়েক সেকেণ্ড পতাকাটাকে দেখল, এবং ভাবল। স্বাধীন বাঙলার পতাকা সে বিস্তর দেখেছে। এটা সে জিনিস নয়। তবে কোনো বিদেশী কূটনীতি মিশনের পতাকা? না তো। গাড়ির মালিক এই তো দাঁড়িয়ে আছেন! দিব্যি মালুম হচ্ছে দেশী আদমী। এবং বাঙালি। তা হলে! দূর, আর চিন্তা করা যায় না। গাড়িতে পতাকা থাকবে না কারো। মেজর সাহেব বলে দিয়েছেন। ব্যাস। ওই নিয়মই চলবে। পতাকা নামিয়ে ফেল। নীরবে পতাকা নামিয়ে গাড়ির ভেতর রাখা হল। আইনের বিচার যেখানে নেই, সেখানে বিচারকের সম্মানই বা থাকে কোথায়!
অতঃপর গাড়ি সার্চ করার পালা। ফিরোজদের গাড়িতে আলপনা আঁকা। একটা লক্ষ্মীর ভাঁড় দেখেই এক লাফে দু পা পিছিয়ে গেল জওয়ানটি।—ওরে। বাবা, বোমা নাকি।
না, ওটা বোমা যে নয় সেটা প্রমাণ করতে হিমসিম খেতে হল ফিরোজকে। এবং শেষ পর্যন্ত ভেঙে দেখিয়ে তবে রেহাই পাওয়া গেল। লক্ষ্মীর আলপনা-দেওয়া সুন্দর গোল ভাঁড়টা-চারিদিক বন্ধ, কেবল একটি ফুটো দিয়ে ভেতরে পয়সা ফেলা যায়। ভাড়টা এলার ভারি পছন্দ হওয়ায় আজ সকালেই মিনাক্ষী ওটা তাকে উপহার দিয়েছেন। এবং খালা যখন, তখন তো আর এমনি দেওয়া যায় না। ওর মধ্যে পাঁচ টাকার একখানা নোটও দিয়েছিলেন। ফিরোজ ওটাকে ফুটপাথে ভেঙে দিতেই নোটটা ছিটকে পড়ল এক পাশে। তজ্জব কা বাত! বোমার ভেতর থেকে টাকা বেরিয়ে আসতে জওয়ানটি কখনো দেখে নি। তাড়াতাড়ি সে নোটখানা কুড়িয়ে নিয়ে ফিরোজদের একখানা সালাম ঠুকে সরে দাঁড়াল।—আপ চলা যাইয়ে।
তারা চলতে শুরু করল। চুপচাপ সকলে চড়ে বসল গাড়িতে। কথা বলার প্রবৃত্তি কারো নেই। কিন্তু ফিরোজের মনের জোর বোধহয় মোটামুটি বজায়। ছিল। নাকি সবাই যেখানে ঘাবড়ে যায় সেখানে কারো না কারো মনে কোনো অদৃশ্য একটা শক্তি উড়ে এসে বাসা বাঁধে। ফিরোজের মনে হচ্ছিল, তার সঙ্গের এতোগুলি নারী পুরুষকে বাঁচানোর চেষ্টা তাঁকেই করতে হবে। তাতে আনন্দ আছে না! দায়িত্ব ঘাড়ে এসে চাপলে তা কি শুধুই বোঝা হয়? একটা পৌঁরুষ তখন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। পৌঁরুষের উদ্বোধনই পুরুষের পক্ষে আনন্দের।
একটু এগিয়ে এক পাশে কলোকালের প্রাচীন কালি-মন্দির। আর-এক পাশে বাংলা একাডেমী। দুটোই ছিল ওদের চক্ষুশূল। ওই দেখ না, গোলার আঘাতে বাংলা একাডেমীর একাংশ কেমন ঝাঝরা করে দিয়েছে। মাত্র একাংশ? কি জানি, শহীদ মিনারের দুর্ভাগ্য থেকে কি করে যে বাচল ওটা! কী। করে এখনো টিকে রইল ওই কালিবাড়ি? অবশ্যই কালি-মন্দিরের সম্মান রক্ষা পায় নি। পাকিস্তানি দুবৃত্তরা ওর ভেতরে প্রবেশ করেছিল। সেখানে সেবায়েত কতোজন ছিলেন কেউ জানেন না। কিন্তু হানাদাররা জীবিত একটাকেও রাখে। নি। শেষ পর্যন্ত কালি-মন্দিরটাকে রাখবে তো! না, রাখতেও পারে। বাইরের জগতের সামনে এতোগুলি সেবায়েত হত্যার কৈফিয়ৎ খাড়া করতে হবে না।
বিচ্ছিন্নতাবাদীরা মন্দিরে প্রবেশ করে সেখানে থেকে পাক-ফৌজের উপর। গুলি চালাচ্ছিল। অগত্যা পাক-ফৌজকে তখন কামান দাগাতে হয়েছিল মন্দির লক্ষ্য করে। তার ফলেই মারা গেছেন মন্দিরের সেবায়েতগণ। বিশেষ করে ঐ সেবায়েতগণকেই হত্যা করা আমাদের সেনাবাহিনীর অভিপ্রায় ছিল না এই ধরনের কোনো যুক্তির আড়ালে নিজের অপকর্মের সাফাই গাওয়ার দরকার ওই দুর্বৃত্তদের অতি শীঘ্রই হতে পারে। তখন প্রশ্ন উঠবে, তোমাদের কামানের গোলা বেছে গিয়ে কেবল মানুষ হত্যা করল, মন্দিরের গায়ে তার বিশেষ কোনো আঁচড়ই লাগল না। এ কেমন কথা! অতএব
শীঘ্রই হয়ত দেখবে সুদীপ্ত কথা তুলেছিলেন, মন্দিরের কিয়দংশ ভেঙে রেখে দেবে ওরা।
অথবা গোটা মন্দিরটাকে গোড়াসুদ্ধ উপড়ে ফেলতে পারে, তখন বলতে পারবে—ওখানে মন্দিরই ছিল না কোনো কালে। অতএব সেবায়েত হত্যার কথা শত্রুদের বানানো কাহিনী।
