কিন্তু এখন যে ফিরোজেরই মরণ। সুদীপ্ত চট করে বলে উঠলেন—
উন লোগ মেরা গাড়িকা ড্রাইভার হ্যায়।
হাঁ, ড্রাইভার হতে পারে। প্যান্ট ও হাওয়াই সার্ট খুব একটা কেতাদুরস্ত নয়। এমন পোশাক ড্রাইভারদেরও হতে পারে। সুদীপ্তকে একটা সালাম ঠুকে সৈনিকটি তার স্বস্থানে দাঁড়াতে গেল।
মালিবাগের মোড়ে এইখানে ফারুক ইকবালের কবর ছিল না? এই তো। কয়েক দিন মাত্র আগে মিছিল পরিচালনা করার সময় পাকিস্তানি জওয়ানদের গুলিতে নিহত হয়েছিল তরুণ কলেজছাত্র ফারুক ইকবাল। তার স্মৃতিকে অমর করার জন্য এই তো এখানে মালিবাগের মোড়ে এই ক্ষুদ্র গোল পার্কে তার কবর দেওয়া হয়েছিল। সে তো এই মার্চ মাসেরই কথা। কিন্তু কবরও। চুরি যায় নাকি। সত্যই ওরা ফারুক ইকবালকে কবর থেকে চুরি করে নিয়ে কেবল স্তুপাকার ইটগুলো কোনোমতে এখনো কবরের সাক্ষ্য বহন করছে মাত্র। হায় হায়, এতোদিন পরে কি ছিল কবরে! কয়েকখানা হাড় বৈ তো নয়। তা হোক, তবু সে তো বিপ্লবীর হাড়। প্রত্যেকটি বিপ্লবীই দধীচি। দধীচির হাড়ে বজ নির্মিত হয়েছিল, সেই বত্র যা দিয়ে অসুর ধংস করে স্বর্গের পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছিল দেবতাদের পক্ষে। পাকিস্তানিরা অসুর ছাড়া কি? কিন্তু একটি বিপ্লবীর কঙ্কাল চুরি করে তারা করবে কি? ফারুক তো একজন নয়। ফারুকের মা তো কান্নাজড়িত কণ্ঠে সেই কথাই বলেছিলেন ফারুকের বন্ধুদের লক্ষ্য করে তোমাদের মধ্যেই আমার ফারুক বেঁচে রইল বাবারা। তোমরা। আমাকে মা ডেকেছ। তোমাদের মধ্যেই ফিরে পেয়েছি আমার ফারুককে। হ্যাঁ, বাংলাদেশ আজ শত শত ফারুকে ভরতি হয়ে গেছে।
সুদীপ্ত মনে মনে ফাতেহা পাঠ করলেন। ফিরোজের কিন্তু সে কথা মনেই এল না। কি করে প্রতিশোধ নেওয়া যায় সেই কথাটাই তীব্রভাবে কয়েকবার ঘুরপাক খেল তার মনের মধ্যে। আর মেয়েরা? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কেন্দ্রের কাছেই তারা মূক বধির হয়ে গেছেন। মীনাক্ষী তো বটেই, আমিনাও মনে মনে আল্লাহকে ডেকে চলেছেন চোখ-কান বন্ধ করে। ফিরোজ তাঁর বন্ধু ও বন্ধু পত্মীকে নিয়ে তার চাচার বাসায় উঠলেন।
মালিবাগের একটা গলিতে ফিরোজের এক চাচা থাকেন, তার বাপের। চাচাত ভাই— জামাতে ইসলামের সমর্থক। কিন্তু তাতে কি। ওতে চাচা ভাইপোর সম্পর্কে কখনো ফাটল সৃষ্টি হয় নি। আওয়ামী লীগের প্রবল। আধিপত্যের সময় চাচা দিব্যি দাড়িতে হাত বুলিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন—ভাইপো ফিরোজ থাকতে তার ভাবনা কি? ভাইপোকে আভাসও দিয়েছিলেন জামাতে ইসলামের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করবেন তিনি। মওলানা মওদুদী আর আগের। মতো নেই। তিনিও খালি পশ্চিম পাকিস্তানেরই স্বার্থ দেখছেন। ঐ দলের সাথে। আর সম্পর্ক রাখা যায় না।
না, এ সকল কথা ফিরোজ মোল আনা বিশ্বাস করেছিলেন এমন নয়। কেবল এইটুকু বুঝেছিলেন যে, চাচা তার সাহায্য চান। জামাতে ইসলামের কাজ করেছেন বলে আওয়ামী লীগকে ভয় পাচ্ছেন তিনি। হাঁ, যেভাবে ওই জামাতে ইসলাম নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের কুৎসা রটিয়েছিল তাতে নির্বাচনের পর তার ভীত হওয়ার কারণ কিছু ছিল বৈ কি। কিন্তু আওয়ামী লীগ চাচা, তোমাদের মতো পার্টি নয়—ফিরোজ মনে মনে বলেছিলেন, আর হেসেছিলেন। তোমরা বৃথাই ভয় পাচ্ছ চাচা। অবশ্য তোমরা জিতলে আওয়ামী লীগকে এবার যে সাতঘাটের পানি খাওয়াতে সেটা তোমরাও জান। তাই এখন নিজেরা সেই ভয়ে ভীত হচ্ছ। কিন্তু চাচা, আওয়ামী লীগ নির্ভেজাল গণতন্ত্রে। বিশ্বাসী—এটা মনে রেখো।
ফিরোজ মনে রেখেছিলেন, ব্যক্তিগতভাবে চাচা তার হিতাকাতক্ষী। সেই ধারণাতেই এসে উঠেছেন চাচার বাসায়। আমিনাকে নিয়ে নাজমা ভেতরে চলে। গেছেন। এ বাড়িতে মীনাক্ষী নাজমা শুধুই নাজমা। মীনাক্ষী শব্দটা চাচা-শ্বশুরের ভারি অপছন্দ। অতএব সুদীপ্ত শব্দটাও চাচার পছন্দ হবে না—এটা ফিরোজ জানতেন। তিনি সুদীপ্তর পরিচয় দিলেন এইভাবে–
ইনি শাহিন, ইউনিভার্সিটির একজন সিনিয়র লেকচারার, আমার বন্ধু!
ইউনিভার্সিটির টিচার? এ তো বহুত ভয়ের কথা বাপ ইউনিভার্সিটির কথা শুনলেই মেলেটারি আজকাল ক্ষেপে উঠতেছে।
তাই নাকি। তা হলে তো চাচা তোমার বাড়িতে রাত্রি-যাপনের বাঞ্ছাটা পরিত্যাগ করতে হয়। কিন্তু এসেই তো আর ওঠা যায় না। হাতের ঘড়ি দেখে নিলেন ফিরোজ, এবং ঠিক করলেন, পাঁচ মিনিট পরেই উঠে পড়বেন। কিন্তু দুমিনিট পরেই চাচা তার গাড়ির চাবি চেয়ে বসলেন।
এই একটু বাপ যাব আর আসব। পাঁচ মিনিটের বেশি লাগবে না।
কিন্তু চাচা আমরা বেরুবো এখনি।
আজকের রাতটা না হয় বাপ গরীবের বাড়িতে থেকেই গেলে। ক্ষতি হবে তাতে? আমার একটু বাইরে যাওয়া বিশেষ দরকার। অথচ গাড়িতে তৈল নাই। ভাইপো হয়ে আমার মুশকিলে আসান করবে না একটু।
তা তো করতেই হবে। ভাইপো যখন হয়েছেন তখন চাচার সুবিধা অসুবিধা একটু দেখতে হবে বৈ কি। তা ছাড়া, একটা রাত চাচা তো থেকে যেতেই বলেছেন। হাঁ, থাকতেই হবে। আজ আর পথে বেরুনোর প্রবৃত্তি নেই। অতএব পাঁচ মিনিট কেন, পঁচিশ মিনিট কাটিয়ে আসুন না—কে বাধা দিতে যাচ্ছে। ফিরোজ চাবি বের করে দিলেন। কিন্তু চাচার গাড়ি কি কেবলি তেলের জন্য অচল হয়ে আছে? এতো শীঘ্র দেশে তৈল-সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে নাকি! না বোধ হয়। কিন্তু সত্যই যদি এরি মধ্যে তেলের সঙ্কট সৃষ্টি হয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে সত্যই পাকিস্তানি শাসকদের মনে বাংলাদেশকে ঘিরে কোনো দুরভিসন্ধি ছিল না। অথচ দুরভিসন্ধি ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসেই সারা এয়ারপোর্ট বিমান বিধ্বংসী কামান ও রাডার দিয়ে সাজানো হয়েছিল কি ওর শোভা বাড়ানোর জন্য? তখন থেকেই দেশের মাশরেকী মুলুকে তলে তলে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল বর্বর ক্ষমতা লোলুপ ইয়াহিয়া ও তার দলবল। অতএব নিঃসন্দেহে গাড়ির তেলও প্রচুর পরিমাণে মজুদ রেখেছে তারা। অতএব তেলের সঙ্কট সৃষ্টি হতেই পারে না। হাঁ, ফিরোজের অনুমান সত্য ছিল। চাচার গাড়ি কিছুকাল থেকেই অকেজো হয়ে পড়েছিল। কেন থাকবে। না। কিনলেন তো একখানা পুরোনো ফিয়াট গাড়ি। গাড়িই যদি কিনবে চাচা, তা হলে কি অত কৃপণতা করলে চলে!—এইভাবে চাচাকে কেন্দ্র করে ফিরোজ সুদীপ্তর কাছ থেকে যেন বহু দূরে সরে গিয়েছিলেন। অতএব ফিরোজের পাশের সোফাতে বসে থেকেও সুদীপ্ত এখন ভীষণভাবে একাকী। হয়ে পড়েছেন। কিন্তু ইচ্ছে করলেই তো এখন একটা কথা বলে তিনি ফিরোজকে নিজের সঙ্গী করে নিতে পারেন। এসো না ভাই যতোক্ষণ আছি, আমরা একসঙ্গে থাকি।…কিন্তু নাহ্, কিছু ভাল লাগছে না। একটি কথাও। বলতে ইচ্ছে করছে না। কোনো মতে একটু ঘুমিয়ে পড়া যায় না এখন?…
