উপাচার্যের বাসার বিপরীত দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন। কলাভবনের প্রাঙ্গণে সেই সুপ্রাচীন বটবৃক্ষ। এই বটতলার এক বিশাল সভায় প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। গত দোসরা মার্চ। পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে উড়িয়েছিল বাংলাদেশের পতাকা। আইনের চোখে ওটা দোষের? কিন্তু বেআইনী, কর্ম তো গত তেইশ বছর ধরে তোমরাই চালিয়ে আসছ। সৈনিক দিয়ে দেশ শাসন করাটা কি আইনসম্মত? আইনের শাসন তোমরা পাকিস্তানে চলতে দিয়েছ কবে শুনি? পাকিস্তানের তেইশ বছরের ইতিহাসে দেশে সাধারণ নির্বাচন হয়েছে মাত্র একবার। কিন্তু সেই নির্বাচনের রায়কেও বানচাল করার জন্য তোমরা যখন ষড়যন্ত্র শুরু করলে তখনই তো ক্ষিপ্ত হয়ে ছাত্ররা, তাও ছাত্ররাই, পাকিস্তানের পতাকা পুড়াল, বাংলাদেশের পতাকা উড়াল। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার শপথ নিল তারা এই তো সেদিন। এই বটতলায়। হাঁ, শহীদ মিনারের মতো এই বটতলাও ছাত্রদের সংগ্রামী প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সে জন্য–
শহীদ মিনারের মতো এই বটতলার উপরেও ওদের তো রাগ থাকার কথা।
রাগ আছেই তো। একদিন দেখবে, বটগাছটাকে ওরা নির্মূল করে দিয়েছে।
গবেটদের পক্ষে ওটাই সম্ভব বটে।
সুদীপ্ত বলেন। এবং রোকেয়া হলের সামনে এসে আমিনা বললেন—
একটু দাঁড়ান না!
আমিনার এক বান্ধবী এখানকার হলের হাউস টিউটর। একবার তার খোঁজ নেওয়া যায় না! ফিরোজ গাড়ি থামালেন। কিন্তু নামবার সাহস কারো হল না। সকলেই দেখলেন, রোকেয়া হলের প্রাচীরের একাংশ ভাঙা। রোকেয়া। হলের ভেতরের প্রাঙ্গণে কোনো গাড়ি যাবার পথ না থাকায় কামান দেগে ভেতরে যাবার পথ করে নিয়েছিল পাক-ফৌজের দল। তারপর? ওরা কেউ ভেতরে গেলে দেখতেন, আট-দশজন মেয়ের মৃতদেহ তখন গলতে শুরু করেছে! শকুন ছিল মাত্র তিনটি কি চারটি আর গুটি কয়েক কাক ও একটা কুকুর। কতো আর খাবে তারা। বহু মৃতদেহই এখনো পাখি কিংবা কুকুরে স্পর্শ করে নি। পথে পথে তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে। কেউ গেলে দেখতেন, দুটো লাশ তখনও সনাক্ত করা সম্ভব। কোথাও একটু ক্ষত চিহ্ন পর্যন্ত নেই। কেবল মনে হয়, শরীরটাকে কে যেন ধরে দুমড়ে মুচড়ে রেখে গেছে।
তার কারণ তারা গুলিতে মরে নি। পঁচিশ তারিখের রাতে কামান দেগে প্রাচীর ভেঙ্গে যারা ঢুকেছিল তারা মেয়েদের সন্ধান বিশেষ পায় নি। ঘরে ঘরে ঢুকে মেয়ে জোর সময় ছিল না তাদের। এদিকে ওদিকে এলোপাথাড়ি গুলি করে সামনে ঝি-চাকর যাদের পেয়েছিল তাদের মেরে চলে গিয়েছিল তারা। আওরাত-সন্ধানী সৈনিকেরা এসেছিল ছাব্বিশ তারিখের দিনের বেলা। বেলা তখন দেড়টা কি দুটো জুমার নামাযের সময় তখন। গত রাত্রি থেকে একটানা কারফিউ থাকায় কেউ পালাতে পারে নি। যতীকলে ইঁদর আটকে থাকার মতো হলের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল তারা। এবং সকাল বেলাটা আশঙ্কায়-উদ্বেগে অতিবাহিত হওয়ার পর দুপুরের দিকে মেয়েরা একটু নিশ্চিন্ত বোধ করেছিল কেন করেছিল তার কোন কারণ নেই। সম্ভবতঃ দীর্ঘক্ষণ ধরে। শঙ্কিত থাকার ক্ষমতা মানুষের নেই। নাকি তারা ভেবেছিল, জুমার দিনে কি আর তাদের ওপর ওরা অত্যাচার করবে! ওরা মুসলমান না! যে ভাবেই হোক, একটু নিশ্চিত বোধ হতেই ক্ষিধে পেয়েছিল মেয়েদের। সারা সকাল অভুক্ত থাকলে ক্ষিধে তো হবেই। ওরা তখন আলু সিদ্ধ-ভাতের ব্যবস্থা করে নিয়ে সবে খেতে বসেছিল। এবং তখনই আক্রান্ত হয়েছিল। সৈনিকদের আগমন টের পেয়ে পাতের অন্ন পাতে রেখেই তারা ছাদে উঠে গিয়েছিল। ছাদের কর্মসূচী আগে থেকেই ঠিক করা ছিল তাদের। মুসলমান মেয়েরা মনে মনে কলেমা পড়ে আল্লাহর নাম নিয়ে তৈরি হয়ে গেল। একজন হিন্দু মেয়ে ছিল তাদের। মধ্যে, সে মনে মনে মা কালিকে স্মরণ করল। তারপর আওরাত-লোলুপ রাইফেলধারিদের আবির্ভাব হতেই এক সঙ্গে সকলে ঝাপ দিল নিচে। খুবই সামান্য ঘটনা। সৈনিকরা ফিরে চলে গেল। এর জন্য আবার আফসোস কিসের? এতোগুলো চমৎকার শিকার যে হাতছাড়া হয়ে গেল সে জন্যও একটু দুঃখ হতে পারত। ধুত্তোর, ঢাকা শহরে আবার আওরাতের অভাব! [ সকালে গোপনে কয়েকজন সাংবাদিক এসে এই মেয়েদের ছবি নিয়ে গেছে। হয়ত ফিরোজও ছবি নিতেন। একটা ক্যামেরা তাঁর হাওয়াই সার্টের নিচে গোপনে রক্ষিত আছে। কিন্তু গাড়ি থেকে নামতেই কেমন যেন ভয়। করতে লাগল। মনে হল হাঙর-সঙ্কুলিত সমুদ্রে একটি ক্ষুদ্র ভেলায় তিনি বসে আছেন। হলের ভাঙা দেয়ালের পানে তাকিয়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ড কিছু একটা যেন ভাবতে চেষ্টা করলেন। অতঃপর গাড়িতে ষ্টার্ট দিতে দিতে বললেন–
না ভাবী, যেতে পারবেন না। ভয়াবহ অবস্থা।
অবস্থার ভয়াবহতা নিয়ে কেউ আর কোন প্রশ্ন তুললেন না। গাড়ি এগিয়ে গেল। কিন্তু বেশি দূরে এগোতে পারল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কেন্দ্রের কাছে সেনাবাহিনীর দুজন জওয়ান পথ আটকাল। সামনে দুখানা গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। ফিরোজের গাড়ি হল তিন নম্বর। পরক্ষণেই আর-একখানা গাড়ি এসে থামল ফিরোজের পেছনে। ফিরোজ দেখলেন, কেবল তার গাড়ির ছাড়া আর প্রত্যেকটিতেই একটি করে ছোট পাকিস্তানি পতাকা। শোভা পাচ্ছে। আর সামনের গাড়িটার নম্বর দেখলেন উর্দুতে লেখা। গতকালও গাড়ির নম্বর ছিল সব বাংলাতে। এক রাতেই তা পালটে উর্দু হয়ে গেল! আর এক রাত পেরোলে বাংলার পরিবর্তে সবি উর্দু হয়ে যাবো নাকি! এইভাবে বাঙলার অস্তিত্বই বিলুপ্ত করার খোয়ব দেখছে নাকি আমাদের মুসলিম বেরাদরগণ! সে গুড়ে বালি।
