আজ বিদেশী শত্রুদের স্ব-দেশভূমি থেকে বিতাড়িত করতে প্রতিবেশী বন্ধুদের সাহায্য চাই। অতি সরল কথা।
কেমনি সব পুরুষ আপনারা আমিনা আবার মুখ খুললেন, বাইরে থেকে কারা এসে আপনাদের সাহায্য করবে, তারপর দেশকে মুক্ত করবেন, সেই আশায় গোঁফে তা দিচ্ছেন এখানে বসে!
সহসা গর্তে পড়ে গেলে কিভাবে লাফ দিয়ে পালাতে হয় সে কায়দা।–ফিরোজ জানতেন কিছুটা। বলে উঠলেন—
আমার কিন্তু গোঁফ নেই ভাবী, এই দেখুন!
সেই জন্যই ভারি সুন্দর দেখায় মুখোনা, ঠিক মেয়েদের মতো।
না, আমিনা নয়, মীনাক্ষী বললেন কথাগুলি। এ্যাঁ, মীনাক্ষী ভাবী এমন করে বলতে পারেন! সুদীপ্ত মীনাক্ষীর মুখের দিকে তাকালেন। মীনাক্ষী কথাটা বলেই যেন লজ্জা পেয়েছেন এমনভাবে মুখ নামিয়ে নিয়েছেন। তার ফলেই আরো সুন্দর দেখাচ্ছে তাঁকে। এমন চমৎকার রসিকতাও জানেন মীনাক্ষী ভাবী!
এই রসিকতার ফল কিন্তু ভালো হল। কিছুক্ষণের জন্য অন্তঃত সকলে। তারা বর্তমানের উদ্বেগাকুলতা থেকে মুক্তি পেলেন। কিন্তু শীঘ্রই তারা এল। খাওয়া শেষ হতেই আবার সেই দুশ্চিন্তার কুয়াশায় দৃষ্টির সম্মুখবর্তী অতি নিকট ভবিষ্যতও অত্যন্ত অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য হয়ে উঠল। অতএব কর্মসূচী স্থির করতে অক্ষম হয়ে সুদীপ্ত সব ভার স্ত্রীর উপর ছেড়ে দিয়ে চুপ করে বসে রইলেন। অগত্যা কথা যা হল তা ফিরোজের সাথে আমিনার। কিন্তু আমিনার কথা অনুসারে কাজ হল না। খালার বাড়ি আজ কিছুতেই নয়, সে আগামীকাল দেখা যাবে।
না, তা বলে এ বাড়িতে থাকতেও বলছি নে আপনাকে। বিশ্বাস করে চলুন না আমার সাথে। নিশ্চয়ই বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দিতে নিয়ে যাচ্ছি নে।
ইচ্ছে করলেই তা পারবেন নাকি! এখান থেকে বঙ্গোপসাগর কতো দূরে জানেন। সেখানে পৌঁছবার সাধ্যই নেই আপনার।
অবশ্যই নেই। ফিরোজ আমিনার যুক্তি মেনে নিলেন বিনা প্রতিবাদে। অতঃপর মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই। ফিরোজ-মীনাক্ষী, সুদীপ্ত-আমিনা এবং তাদের তিন সন্তান-ফিরোজের ভক্সওয়াগনে বেরিয়ে পড়লেন। নীরবে, এবং নত নেত্রে।
পথে দু-একটি গাড়ি চলছিল, কিন্তু হেঁটে-চলা মানুষ একটিও না। নিউ মার্কেটের পাশ দিয়ে যাবার সময় সুদীপ্ত দেখলেন, বলাকা বিল্ডিংয়ের ফুটপাথের ধারে আমনের লাশ তখনও পড়ে আছে। ফিরোজও দেখলেন। কিন্তু মেয়েদেরকে দেখানো হল না। তারা নিজেরাই তখন দেখছিলেন। অন্যদিকের ফুটপাথেও কয়েকটি শব তখনও ছড়িয়েছিল। কিন্তু অন্য সময় কতো মানুষ থাকে ঐ পথে চব্বিশ ঘণ্টার এক মুহূর্তও এ স্থান জনশূন্য থাকে না।
মোড় ঘুরতে গর্তের মধ্যে কয়েকজনকে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছিল–একজনের পায়ের কয়েকটা আঙ্গুল এখনো দেখা যাচ্ছে। সহসা দেখা যায় না। কিন্তু আমিনা। কিভাবে যেন দেখে ফেলেছেন। তিনি শিউরে উঠলেন। তিতাস গ্যাসের পাইপ বসানোর জন্য রাস্তার পাশে গর্ত করা হয়েছিল। সেই গর্তকেই গোর বানিয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের ঈমানদার মুসলিম বেরাদরগণ। হাজি মহসিন হলের মাঠের কাছে গাড়ি আসতেই পচা দুর্গন্ধে সকলের নাক যেন জ্বলে উঠল। নাকে রুমাল চাপলেন সকলে। আর্টস্ বিল্ডিংয়ের কাছে পৌঁছবার। মুখে গন্ধ আরো তীব্র হল। বাঁ দিকের মাঠে মৃতদেহ ছিল কতগুলি? কাক চিল শকুন কিন্তু অনেকগুলি দেখা গেল। ডানদিকে উপাচার্যের শূন্য বাড়িটার দিকে সুদীপ্ত একবার তাকালেন। উপাচার্য আবু সাঈদ চৌধুরী এখন দেশের বাইরে না? হাঁ তো, পনেরোই এপ্রিল পর্যন্ত তার বাইরে থাকার কথা। আশ্চর্য, তিনিও। বাইরে চলে গেলেন, এদিকে বিদায় নিলেন প্রদেশের গভর্ণর, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আহসান সাহেবও। আহসান সাহেবের মতো ভদ্রলোক পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন? কেন? পশ্চিম পাকিস্তানের সকলেই ইয়াহিয়া-টিক্কার মতো হবে নাকি! সেখানে আজম খান, ইয়াকুব খান ছিলেন না? তোমাদের এখানে মোনায়েম খান নেই? ঐ একটা সমাবেশ ঘটেছিল বটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে—আচার্য মোনায়েম খান, আর উপাচার্য ওসমান গনি। আচার্য বললে মোনায়েম খান। চটতেন।–
আমারে কি তোমরা হিন্দু ঠাওরাতেছ? মুসলমানের আচার্য কওয়া বড়োই দুষের (দোষের) কথা। কুটি কুটি (কোটি কোটি) টাকা খরচ কইরা তোমাদেরে আচ্ছা কইরা শিক্ষা দিবার লাইগা এই যে বিন্ডিং বানাইয়া দিছি তা কি এমনি কাফের হওন লাইগা? কেন, আমারে তোমরা চ্যাঞ্চেলর কইতে পার না!
চ্যান্সেলর কথাটা মোনায়েম খান ঠিকমত উচ্চারণ করতে পারতেন না, কিন্তু ঐ পদের গৌরবটুকু ভোগ করতেন ঠিকই। এক সভায় সম্মুখে উপবিষ্ট ওসমান গনি সাহেবকে দেখিয়ে বলেছিলেন–
এই যে আপনারা ওসমান গনি সাবরে দেখতেছেন, আমি হ্যারে ভাইচ চ্যাঞ্চেলর বানাইলাম। হেইডা ল্যাখা-পড়ায় বালো ছাওয়াল আচিল। আমি তার মতো পি-এইচ, ডি এম এইচ ডি কিছুই করবার পারি নাই। কিন্তু আল্লাহ আমারে গভর্ণর কইরা চ্যাঞ্চেলর বানাইয়া দিল। আর ওইটা আমার অধীনে ভাইচ চ্যাঞ্চেলর হইল।
মোনায়েম খানের অধীনে অতি দৌর্দণ্ড প্রতাপে ভাইস চ্যান্সেলরগিরি। করেছেন জনাব ওসমান গনি। কি যে ভয়ে ভয়ে তখন কেটেছে সুদীপ্তদের দিনগুলি! কবে কোন ছাত্র এসে তাদের পিটিয়ে দেয় সেই এক ভয়। তার উপর। ভয় চাকরির। কোনো কারণে অপছন্দ হলেই হল, কোন দিক দিয়ে ফাঁক বের করে দয়া করে একটা চিঠি পৌঁছে দেবে তোমার বাড়িতে—অমুক দিন থেকে তোমার চাকরির দরকার নেই আর। ওদের দুজনের মধ্যে একজন তো ছিলেন। পাড় মূখ-বাংলা বিভাগের তৎকালিন অধ্যক্ষ মুহম্মদ আবদুল হাইকে রবীন্দ্র সঙ্গীত রচনার ফরমায়েস দিয়েছিলেন। এবং আর একজন? কেবল নিজের উচ্চাভিলাষ পূরণের জন্য যিনি একজন মূখের তাঁবেদার হতে পারেন তার নাম কি দেওয়া যেতে পারে? সে কি যেমন তেমন তাঁবেদারি? হুজুরের নির্দেশে ছাত্রদের ডিগ্রি কেড়ে নেওয়া থেকে শুরু করে ছাত্ৰনামধারী গুণ্ডা লেলিয়ে দিয়ে। অধ্যাপককে পিটানো পর্যন্ত কোনোটাই বাদ যায় নি। অতঃপর আবু সাঈদ চৌধুরী যখন এলেন। উনিশ শো সাতচল্লিশ খ্রিস্টাব্দের পনেরোই আগস্টের মতো মনে হয়েছিল দিনটাকে। ধোয়া-ভরতি বদ্ধ ঘরে দম আটকে মরতে মরতে সহসা যদি নির্মল নদীতীরের বাতাসে মুক্তি মেলে তা হলে কেমন লাগে। সেটা? ওসমান গনির পর আবু সাঈদ চৌধুরী ছিলেন ঠিক তেমনি। এখন বাইরে, বেঁচে গেছেন ভদ্রলোক। হাঁ, বেঁচেছেন। এখানকার সব চোখে দেখলে শোকেই হয় তো মরে যেতেন। ছাত্র-শিক্ষকদের যা ভালোবাসতেন? সকল মানুষকেই ভালোবাসতেন। ভালোবাসার তো মৃত্যু নেই। তিনি যেখানেই থাকুন দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে কর্মের পথ দেখাবে।
