এই শহীদ মিনারে আপনাদের সাথে এই বোধ হয় আমার শেষ দেখা।
শহীদ মিনারের সামনে থেকে এক মুঠো মাটি নিয়ে কপালে ঠেকিয়ে। বঙ্গবন্ধু আরো বলেন—
আমি যদি নাও থাকি, আপনারা থাকবেন। এই শহীদ মিনারকে ওরা যদি গুঁড়িয়ে দেয়, তবু থাকবে আপনার দেশের ধুলো-কাদা-মাটি। কখনো এই দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না।
কি কোমল প্রীতিস্নিগ্ধ কণ্ঠস্বর! ইনিই কি সেই দু সপ্তাহ পরের বমানব শেখ মুজিব। একুশে ফেব্রুয়ারির ঠিক দু সপ্তাহ পর। রমনা রেসকোর্সে সাতই মার্চের সেই বজ্রকণ্ঠ। সেই কণ্ঠ বিধ্বস্ত শহীদ মিনারের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আবার স্মরণ করলেন সুদীপ্ত। কাল থেকে কতো বারই তো স্মরণ করলেন। সেই কণ্ঠ ইতিপূর্বে কখনো কোনো বাঙালি শুনেছে? হয়ত কখনো শুনেছে শশাঙ্কের কণ্ঠে, হুসেন শাহের কণ্ঠে কিংবা সিরাজের সেনাপতি মোহনলালের কণ্ঠে। অতঃপর এই সেদিন নেতাজী সুভাষের কণ্ঠে। নেতাজীর প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু! তোমার প্রয়াস ব্যর্থ হবে না। আমরা ব্যর্থ হতে দেব না। সাতই মার্চের রমনা রেসকোর্সে যারা গিয়েছিল তারা কি জীবনের মতো অন্য মানুষ হয়ে যায় নি? অন্ততঃ সুদীপ্ত হয়েছিলেন। রাজনীতির ডামাডােলে। সুদীপ্ত কখনো ছায়া মাড়ান না। কিন্তু সাতই মার্চের রমনা রেসকোর্সের দৃশ্য দেখার পর এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতায়, তার সমস্ত চিত্ত ও দেহের প্রতি রক্ত কণা একটি দৃঢ় প্রত্যয়ের বৃন্তে সংহত সূর্যমুখি হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতা-উন্মুখ অনির্বাণ সূর্যমুখি।
আমাদের এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম…এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।….
সুদীপ্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু অন্যেরা কেউ দাঁড়াচ্ছেন না। তবে রুমাল বের করে চোখ মুছে নিচ্ছেন সকলেই। সুদীপ্ত চোখ মুছলেন না। দুই গাল। বেয়ে জলের ধারা গড়িয়ে গেলেও তিনি সেই ভগ্ন্যুপের পানে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। বরকত-সালামের মুখ মনে পড়ল। একই সময়ের ছাত্র। তারা। তাঁর জীবনের কতো স্মৃতির ইতিহাস গাঁথা হয়ে আছে ওদের ঘিরে। বরকতের বৃদ্ধা জননীর সেই কান্না মনে পড়ল। না, তিনি তো শুধুই বরকতের মা নন। কোটি কোটি বাঙালির অসহায় বঙ্গজননীর প্রতীক। নিজের মুখের ভাষা সন্তানকে শেখানোর অধিকার তোমার নেই, তোমার আম-কাঠালের ছায়া-ঢাকা প্রাঙ্গণে নিজের মতো হয়ে বাঁচার অধিকার তোমার সন্তানের নেই, তোমার ভাঁড়ারের রত্নসামগ্রী বিদেশীরা অপহরণ করে নিয়ে যাবে, তা আগলে রাখার অধিকার তোমার সন্তানের থাকবে না। রবীন্দ্রনাথ যথার্থই লক্ষ্য করেছিলেন—আমাদের মা দেবতার মেয়ে, কিন্তু দেবতার ক্ষমতা তার নেই, তিনি ভালোবাসেন, কিন্তু রক্ষা করতে পারেন না।…কিন্তু মা গো, তোমার ছেলেরা এখন বড়ো হয়েছে না! এখনো সন্তানকে রক্ষার প্রশ্ন ওঠে নাকি! এবার আমরাই তোমাকে রক্ষা করব।
এই সুদীপ্ত।
সুদীপ্ত তাকিয়ে দেখেন ফিরোজ। গাড়ির জানলা দিয়ে হাত বের করে তাকে ডাকছেন।
১৫. দুপুরের খাওয়ার টেবিলে
দুপুরের খাওয়ার টেবিলে এক পাশে একটা ছোট ট্রানজিস্টর রেখে তাঁরা একই সঙ্গে খাওয়া এবং সংবাদ শোনার কাজ সারলেন। ভারতীয় বেতার আকাশবাণীর সংবাদ। পরম আগ্রহে শুনলেন সকলে।
নাহ্, ওরা এখনো আমাদের দুর্গতির খবর বিশেষ কিছু শোনে নি। এখান থেকে আমাদের কারো যাওয়া দরকার।
।কিন্তু ভারত আমাদের জন্য কতোখানি করবে? এবং কেন করবে?
ফিরেজি প্রশ্ন তুললেন একজন খাঁটি রাজনীতিবিদের মতো। কিন্তু যার সামনে তুললেন তিনি কখনো রাজনীতির তর্ক করেন না। তিনি তাঁর মতো করেই বললেন…।
মানুষের এত বড়ো বিপর্যয় ওরা দেখবে চুপচাপ!
কিন্তু অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কোন কিছু করার সুযোগ তাদের কতখানি?-আমিনা আলোচনায় যোগ দিলেন।
অতএব সুদীপ্ত চুপ থাকতে পারেন না। তিনি বললেন–
তাই বলে পাশের বাড়িতে এক ভাই আর-এক ভাইকে পিটিয়ে মেরে ফেলবে আর আমরা প্রতিবেশী হয়ে চুপচাপ তা দেখব? বলব, ওটা ওদের। ঘরোয়া ব্যাপার!
এ যুক্তির কাছে ফিরোজ নতি স্বীকার করলেন। এবং সুদীপ্তর ঐ কথাটা মেনে নিলেন যে, এখনি বিশ্বের সর্বত্র আমাদের লোক ছড়িয়ে পড়া দরকার। এই বিংশ শতাব্দীতেও আসুরিক শক্তির কাছে সভ্যতাকে মৃত্যু বরণ করতে হচ্ছে এ সংবাদ তাদের জানা দরকার।
কিন্তু জানা সম্ভব ছিল না। পাকিস্তান বেতার থেকে প্রচার হচ্ছে অবস্থা সব। স্বাভাবিক। বিদেশী সাংবাদিকদের পূর্বাহ্নেই প্রদেশছাড়া করা হয়েছে। এখন। এরা যা বলবে তাই সত্য হবে। অর্থাৎ সকলে জানবে, কতকগুলো বাজে লোক দেশে অশান্তি ছড়িয়ে বেড়াচ্ছিল, তাদের দমন করে শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের ধন সম্পত্তি রক্ষা করা হয়েছে। দেশবাসী এখন পরম সুখলাভ করে সরকারের। কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে ব্যস্ত।
শালাদের……, বলতে থেমে গেলেন ফিরোজ। আমিনার উপস্থিতি তার কারণ। নিজেকে তিনি সংযত করে নিয়ে জলের গ্লাসে হাত বাড়ালেন! এক ঢোক পানি খেয়ে অতঃপর তার বক্তব্য ভদ্র ভাষায় প্রকাশ করলেন—
বর্বর পাকিস্তানিদের ঠাণ্ডা করতে হলে ডাণ্ডা ছাড়া কোনো ওষুধ নেই। আপাততঃ ভারত যদি আমাদের হয়ে দুঘা দিত ওদের পিঠে!
কিন্তু পয়ষট্টি সালে তোমরাই তো বাধা দিতে এগিয়েছিলে। তা না হলে ওদেরকে ডাণ্ডা সেবার ভারতের হাতে ভালো করেই খেতে হত।
সে কথা ওই বর্বরগণও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টই পঁয়ষট্টির যুদ্ধে ওদের লাহোর রক্ষা করেছিল। নিশ্চয়ই আজ আর ঐ কর্মের ভালোমন্দ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। যাই হোক, তবু আমরা তখন পাকিস্তানি ছিলাম। যা তখন করেছি, একজন নাগরিকের কর্তব্য হিসাবেই তখন তা করেছি। কিন্তু পঁচিশ মার্চ থেকে আমরা আর পাকিস্তানি নই। অতএব এখন আমাদের এই স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের বুক থেকে পাকিস্তানিদের নিশ্চিহ্ন করাই হবে আমাদের প্রধান কর্তব্য। ওরা পাকিস্তানি, ওদের দেশ পাকিস্তান, মানে পাঞ্জাব-সিন্ধু-বেলুচিস্তান ইত্যাদি। আমরা বাঙালি, আমাদের বাংলাদেশে ওরা বিদেশী। আলোচনা এগোতে থাকলে কথাটা এক সময় এই ভাবেই মোড় নিল। ফিরোজ এই আলোচনার সূত্রে বললেন–
