সুদীপ্ত অবশ্য বেশি দূর যান নি। ইকবাল হল পেছনে ফেলে, সলিমুল্লাহ্ হল-জগন্নাথ হলের পাশ দিয়ে গিয়েছিলেন শহীদ মিনার পর্যন্ত। এবং ঐ পর্যন্তই আর এগোতে পারেন নি। ফিরেছিলেন ফিরোজের সঙ্গে। হায় হায়, ঐ, সব কি চোখে দেখা যায়! না, চোখে দেখে এগোনো যায়। জগন্নাথ হলের লাশগুলি অধিকাংশই ওরা পুঁতে দিয়েছিল। কিন্তু ইকবাল হল ক্যান্টিনের কাছে স্থূপীকৃত লাশগুলি ওরা সরায় নি। সেই লাশের স্তুপের মধ্যে একটা গুলি-করে-মারা। কুকুরও দেখা গেল। কি বলতে চায় ওরা? আমরা ওদের চোখে কুকুরের সমান? কোনো বাঙালির এ দৃশ্য সহ্য হবার কথা নয়। যারা দাঁড়িয়ে দেখছিল তাদের মধ্যে একজন কুকুরটার একটা ঠ্যাং ধরে একটু দূরে সরিয়ে রেখে এল। সুদীপ্ত সরে ইকবাল হল সংলগ্ন দিঘির দক্ষিণ দিকের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালেন। কয়েকজনকে সেখানে দাঁড়াতে দেখেই তিনি গেলেন। কী দেখছে ওরা? ওরে। বাবা, কি বিরাট গর্ত ইকবাল হলের দেয়ালে।
কামান দেগেছে ঐখানে।—ভীড়ের মধ্যে একজনের মন্তব্য।
আর একজনের মন্তব্য শোনা গেল–
ওরে বাবা, ঐ দিকেও কামান দেগেছে দেখা যায়। এ বিল্ডিং দুটোতেও ছাত্র থাকত নাকি!
দিঘির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের বিল্ডিং দুটোর কথা। ওইখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস-কর্মচারিগণ থাকেন। ওদের বিল্ডিংয়ের দেয়াল যে। একেবারে ঝাঝরা করে দিয়েছে। ওখানে কেউ থাকলে তিনি কি বেঁচে আছেন। তাদের তেইশ নম্বরেও তা হলে এমনি করে কামান দাগতে পারত৷ পারত বৈ কি। সুদীপ্ত আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানালেন। তারা তেইশ নম্বরে অনেকের চেয়েই সুখে ছিলেন। তাদের সেই অবস্থাটা যদি সুখের অবস্থা হয় তা হলে, হায় গো, দুঃখ কাকে বলে? জগন্নাথ হলের দেওয়ালের গায়েও অমনি কামানের গোলার আঘাতে প্রকাণ্ড ছিদ্র সুদীপ্ত দেখলেন। এ হলের অবস্থা কি হয়েছিল? কে বলবে কি হয়েছিল! কিছু বলার জন্য কেউ বেঁচে আছে নাকি! কিন্তু মরে গিয়েও তো অনেক কথা বলা যায়। যেমন বলছেন এই মেয়েটি। সামাজিক মর্যাদার কোন ধাপের এ মেয়ে তা এখন আর বুঝবার উপায় নেই। কেননা অঙ্গে বস্ত্র অলংকার কিছু নেই! তবে উলঙ্গ শরীরে অলঙ্কারের চিহ্ন আছে। কানের মাকড়ি খুলে নেবার ধৈর্য দুবৃত্তদের ছিল না। কান ভেঁড়া দেখেই বুঝা যায়, কী পৈশাচিক প্রক্রিয়াতে সেটা তারা হস্তগত করেছিল! চুড়ি খোলার সময় হাতের মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে গেছে-সে সব স্থানে রক্ত জমাট বেধে আছে। আর মুখের মধ্যে দাতে লেগে আছে কাঁচা মাংস। কামড়ে তুলে নিয়েছিলেন বোধ হয়। বোধ হয় কেন, সুদীপ্ত যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, সম্ভ্রম রক্ষার শেষ চেষ্টায় অসহায় নারী প্রাণপণে কামড়ে ধছেন বর্বরের পূতি-দুর্গন্ধ দেহ। দাঁতে লেগে থাকা মাংস তারই সাক্ষ্য। ঠিক এমনি কিছু না হলে তো ক্যান্টনমেন্টের গণিকাবৃত্তি ভাগ্যে জুটত। পেটের অবস্থা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, রমণী সন্তান সম্ভবা ছিলেন। এবং পাষণ্ডরা গুলি করেছে পেটের মধ্যে সন্তান থাকার সেই জায়গাটিতেই—তলপেটে, আর একটা বুকে। পেটের সন্তানকেও গুলির হাত থেকে রেহাই দেয় নি ওরা। ওই শবের পানে অধিকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলেন না সুদীপ্ত। মা গো, তোমার লজ্জা আমরা ঢাকব কি দিয়ে দুহাতে চোখ ঢেকে সেখান থেকে সরে এলেন সুদীপ্ত।
কোথায় এলেন তিনি। এখানে শহীদ মিনার ছিল না। সেটা কোথায় কোন চিহ্নই নেই। তবু চিহ্ন আছে। পড়ে আছে বালি-সিমেন্টের স্তূপ। ডিনামাইট দিয়ে গোড়াসুদ্ধ নির্মূল করে দিয়েছে বাঙালির মর্যাদার প্রতীক সেই প্রাণ প্রিয় শহীদ মিনার। এই তো কদিন আগে এইখানে শপথ নিয়েছিলেন। তারা—ঢাকার শিল্পী-সাহিত্যিকেরা। কবিবন্ধু শামসুর রাহমানের কণ্ঠে সুদীপ্তদের সকলের দৃপ্ত শপথ বেজে উঠেছিল—আমরা লেখনীকে আজ দেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের হাতিয়ার করব। তা করতেই হবে যে। আর তো ফুল খেলবার দিন নয়, ধংসের মুখোমুখি আমরা। সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে এখন যেন নতুন করে আবিষ্কার করলেন সুদীপ্ত। হাঁ তো, অবিকল সেই সুভাষদার কণ্ঠস্বর। সুদীপ্তর কানের কাছে মুখ রেখে তিনি বলে যাচ্ছেন— মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না/পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা/ প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয়, অদ্য/এসে গেছে ধংসের বার্তা/দুর্যোগে পথ হোক দুর্বোধ্য/চিনে নেবে। যৌবন-আত্মা।
এবারের একুশে ফেব্রুয়ারিতে রাত দুপুরের অনুষ্ঠানে সুদীপ্ত এখানে এসেছিলেন। কেননা শুনেছিলেন, স্বয়ং শেখ সাহেব ঐ সময় আসবেন। এসেছিলেনও শালপ্রাংশু বুজমানব শেখ মুজিবুর রহমান। কেমন যেন ম্লান। দেখাচ্ছিল না মুজিব ভাইকে? ওকে ম্লান বলে নাকি! ঠিক কেমন যে দেখাচ্ছিল কোনো শব্দ দিয়ে তা যেন প্রকাশ করা যায় না। দুর্জয় সেনাপতির প্রতিজ্ঞা, জননীর মমতা এবং ষড়যন্ত্রসঙ্কুল ভবিষ্যতের আশঙ্কা-সবকে এক পাত্রে ঢেলে। মিশালে যা দাঁড়ায় মুজিব ভাইয়ের মুখে-চোখে ছিল সেই ভাবের অভিব্যক্তি। বাইরের শত্রুর কাছে এতো কঠোর এতো দুর্দমনীয় যে ব্যক্তিত্ব, ঘরের লোকের কাছে তার একি রূপ! সুদীপ্ত তার চোখের দিকে তাকালেন। সেখানে তো কৈ সেই আগুন নেই! তবু আগুন আছে। আগুন চাপা দেওয়া আছে এবং চারপাশে। আপন জনের উদ্দেশ্যে উৎসারিত হচ্ছে বন্ধুর প্রীতি, শিশুর সারল্য আর বয়স্ক হৃদয়ের বাৎসল্য। এখন তিনি অকঠোর, কিন্তু সেই সঙ্গে অনমনীয় শপথে। আকীর্ণ। সেই আত্মপ্রত্যয়বিদ্ধ দুর্দমনীয়তার সঙ্গে কি-একটা এসে মিশেছে যেন। কি তার নাম? অপার্থিব দীপ্তি? স্বর্গীয় আভা? নাম যাই হোক, তিনি যে তখন ঐশীবাণীর আশীর্বাদ প্রাপ্ত ছিলেন তাতে তো কোনোই ভুল নেই। তা না হলে কি করে তখন উচ্চারণ করেছিলেন সেই অমোঘ বাণী!–
