কিন্তু পালাতে হলে তো আণ্ডারগ্রাউণ্ডে যেতে হয়। সে সব কলাকৌশল। তো আমার জানা নেই।
মুশকিল ঐখানে। আওয়ামী লীগ সোজাসুজি গণতান্ত্রিক পদ্ধতির রাজনীতি জানে। তার শ্রেষ্ঠ অস্ত্র ধর্মঘট, অসহযোগ আন্দোলন ইত্যাদি নির্বাচনের মাধ্যমে। ক্ষমতা হস্তগত করার কৌশলটুকুই তার আয়ত্তে। কিন্তু এর প্রত্যেকটিই হচ্ছে ভদ্রলোকের দেশে উদ্ভুত পন্থা। কোরায়শী একদিন তর্ক করেছিলেন ফিরোজের সঙ্গে—
তোমাদের নির্বাচন, অসহযোগ আন্দোলন-এ সবের কোনটা দিয়ে তুমি মধ্যযুগে ক্ষমতায় যেতে পারতে শুনি!
হ্যাঁ, কথাটা ঠিক। মধ্যযুগের রাজনীতি ছিল যুদ্ধের রাজনীতি। কোরায়শী, ভুল বলেন নি। ফিরোজদের পথ এ কালের পথ। একালের ধ্যান-ধারণায় যারা বিশ্বাসী হবে কেবল তাদের সঙ্গেই একত্রে এই পথে যাওয়া চলে। তর্ক করব, আলোচনা চালাব, এবং জনগণের মত যাচাই করে যদি দেখি আমার পেছনে। তাদের সমর্থন নেই তা হলে নিঃশব্দে সরে দাঁড়াব; কিন্তু কোনো অবস্থাতেই গায়ের জোর খাটাব না।—এই নীতি মধ্যযুগে কেউ কি মানত? এবং এখনো কি মানবে যারা মধ্যযুগে বাস করে? তাদের জন্য তো সেই মধ্যযুগীয় পন্থাই উত্তম। এসো, যে যাকে পারি, জোর যার, মুলুক তার। এই কথাই মাও-সে-তুঙ বলেছেন একটু আধুনিক ভাষায় ক্ষমতার উৎত্র হচ্ছে বন্ধুকের নল। বন্ধুকের নল দেখিয়ে বিগত চব্বিশ বছর পাকিস্তানের একটি সংখ্যালঘু অংশ সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কে শাসন ও শোষণ করে আসছে। কি কচুটা তোমরা করতে পেরেছ শুনি। আওয়ামী লীগের মধ্যে কোরায়শী ছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবের। পক্ষপাতি। পঁচিশে মার্চের রাতের পর কোরায়শী সাহেবের মর্যাদা বহু গুণ বৃদ্ধি। পেয়েছে। এখন কোরায়শী সাহেবের যুক্তি-পরামর্শ সকলের কাছেই গুরুত্ব পাচ্ছে। ফিরোজকে তিনি পরামর্শ দিলেন—
আণ্ডারগ্রাউণ্ডে তোমার যাওয়ার দরকার নেই। আপাততঃ কেবল ঢাকা ছাড়লেই চলবে। কিন্তু বাড়ি ছাড়তে হবে আজই।
আজ বাড়ি ছাড়ব, কাল ঢাকা ছাড়ব। তারপর? দেশ ছাড়ব কবে?
দরকার হলে তাও ছাড়তে হবে। কিন্তু সে পরের কথা। আমরা আপাততঃ চেষ্টা করব, পাকিস্তানিদের কেবলি ঢাকা শহরে আবদ্ধ রাখতে।
না পারলে? সে সম্ভাবনা কোরায়শী সাহেব একেবারে অস্বীকার করেন না। তখন বাংলার যে-কোন খানিকটা অঞ্চলকে মুক্ত করে রেখে সেইখানে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকার করতে হবে এবং ধীরে ধীরে সারা বাংলাকে মুক্ত করতে হবে।
কথাগুলো শুনতে শুনতে সুদীপ্তর মনে হচ্ছিল, তিনি যেন স্বপ্ন দেখছেন। স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকার—স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা—এ সব কি বলছেন কোরায়শী সাহেব! এ সব তো তাঁর নিজের মনের কথা। বোধ হয় শুধু তাঁরই নয় প্রত্যেকটি বাঙালির মনের কথা। যে মন স্বপ্ন দেখে সেই মনের কথা। এবং একদিন যে তা সত্য হবে তাতেও সন্দেহ নেই। কিন্তু এখন সে। কথা ভাবা যায়!
কেন, দুদিন আগে সে কথা তোমরা ভাববা নি? সেই শিল্পী-সাহিত্যিকদের মিছিল। রাইটার্স গিল্ড থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত শোভাযাত্রা। কিংবা ঢাকা শহরের সকল শিক্ষায়তনের শিক্ষকদের সেই মিলিত শোভাযাত্রাবায়তুল মোকাররম থেকে শহীদ মিনার। সেখানে তোমরা শ্লোগান কি দিয়েছিলে, মনে আছে? মনে আছে। পাক-বাহিনী খতম কর—বাংলাদেশ স্বাধীন কর। বাংলাদেশ স্বাধীন কর-বীর বাঙালি অস্ত্র ধর। সেই স্বাধীনতার কথাই তো। এখন বলছেন কোরায়শী সাহেব। অস্ত্রবলে স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনার কথা। বলছেন। তা হলে? তা হলে আর কী! ভালো কথাই বলেছেন। কিন্তু? একটা কিন্তু কিছুতেই মন থেকে দূর হতে চায় না।
কোরায়শী সাহেব চলে যেতেই ফিরোজের তাড়া খেয়ে সুদীপ্ত স্নানের ঘড়ে ঢুকলেন। পেছনে পেছনে ওরাও ঢুকল। সেই ভাবনাগুলি। ছেলেবেলায় সুদীপ্ত একবার একটা কুকুর পুষেছিল। কিছুতেই সে পেছন ছাড়তে চাইত না। লাথি। মেরে তাড়াতে চাইলে সে আরো বেশি করে পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে লেজ নাড়ত। আজ তার ভাবনাগুলি তেমনি অনুগত কুকুরের মতো হয়ে উঠেছে। ঐ দেখো, সে জল ভরতি টবে লাফিয়ে পড়ে গলা বাড়িয়ে দিয়েছে। চৈত্র মধ্যাহ্নের তপ্ত আবহাওয়াতে ঐ জলটুকু লোভনীয় ছিল বৈ কি। কিন্তু এখন যেন তা অস্পৃশ্য হয়ে গেছে। তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন সেই টবের সামনে।–এখন তবে যাই কোথায়! ফিরোজের তো নিজেরই এখন অত্যন্ত দুর্দিন। তার স্ত্রী একটু আগেই যা বলেছিলেন সেটা তা হলে খুবই সত্যি কথা। আমিনার কাল সকালের যুক্তিটাই বোধ হয় ভালো ছিল। কিন্তু কাল সকালে তখন কোনটা যে ভালো ছিল, আর কোনটা খারাপ, সে সব চিন্তার কোন অবকাশ ছিল নাকি! কী তাড়াতাড়ি তখন এক চক্কর ঘুরে এসেছিলেন! তাও আবার ফিরেছিলেন ফিরোজের গাড়িতে। কিন্তু তার জন্যই কতো রাগ আমিনার।
তোমার আক্কেলের বলিহারী যাই। কই, তাকিয়ে দেখ দেখি একবার, নীলক্ষেত এলাকায় কারা এখনও বসে আছে!
সত্যি কথা! ইতিমধ্যেই তখন নীলক্ষেত এলাকা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। কিন্তু পথে এতোখানি বুঝা যায় নি। সেখানে অনেক মানুষ তখনও ছিল। অনেক অস্বাভাবিক মানুষ। আতঙ্ক-অঙ্কিত ললাট নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় সন্ধানে পথে-বেরুনো আদম-সন্তানেরা। তার মধ্যে তার মতো কেবলি দেখতে বেরিয়েছে এমন মানুষও ছিল। দেখলেই চেনা যাচ্ছিল তাদের। তাদের হাতে কোনো বোচকা নেই বা সঙ্গে কোন স্ত্রীলোক কি শিশু নেই। যানবাহনের দুর্ভিক্ষই সব চেয়ে বেশি। ভদ্র ঘরের নবনীকোমল মেয়েরাও ভারি ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে হেঁটে চলেছেন। তাদের অনেকেরই হয়ত গাড়ি আছে। কিন্তু গাড়ির তেল নেই। পেট্রোল পাম্পগুলি পাকিস্তানিরা নষ্ট করে দিয়েছে, অথবা ঐ রাতে ওখানকার কর্মচারীদের সব মেরে ফেলেছে। দরিদ্র রিক্সাচালক কিংবা স্কুটার-ড্রাইভার বেশির ভাগই বোধ হয় মারা পড়েছে গত দুদিনে। তা না হলে এখানে-ওখানে রিক্সা-স্কুটার অনেক পড়ে আছে, কিন্তু চালক নেই কেন?
