দুতলার সিঁড়িতেই দৃশ্যটা ছিল সবচেয়ে মর্মান্তিক। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে সুদীপ্ত প্রায় মূৰ্ছা যাচ্ছিলেন। দেয়ালের গায়ে স্ত্রীলোকের মাথার চুল। মনে হচ্ছে দেয়ালের শরীর ছুঁড়ে বেড়িয়েছে। একটা দুটো নয়, এক গোছা চুল প্রায় দু ফুট দীর্ঘ। ঠিক তার সামনেই দুধাপ পরে রক্তের ধারা জমাট বেঁধে আছে। সুদীপ্তর মনে হয়েছিল ছাদের ঐ তিন-চার মাসের শিশু-কন্যার সাথে এই রক্তের যোগ আছে। যুবতী মায়ের কোল থেকে ঐ শিশুকে ছিনিয়ে কথার উপর ফেলে দিয়ে মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল বর্বরের দল। সন্দেহে কয়েকবার চী কার করেছিল সেই যুবতী জননী, তারপর সংজ্ঞা হারিয়েছিল! অসংবৃতার বিস্রস্ত দেহলতা চারতলা দালানের ছাদ থেকে চুল ধরে টেনে নামাচ্ছে। দৃশ্যটা কল্পনায় আসতেই সুদীপ্ত শিউরে উঠলেন। ঠিক অমনি করে চুল ধরে টেনে হিচড়ে যদি না নামাবে তা হলে এক খাবলা মাংসসুদ্ধ চুলের গোছাটা এমন ভাবে উঠে আসবে কেন? আর উঠে আসতেই তারা সেটাকে ছুঁড়ে মেরেছিল দেয়ালে। কাচা মাংস দেয়ালে গাঁথা পড়ে চুলের গোছাটা এখন ঝুলছে। আর সেই মেয়েটি? মাংসসুদ্ধ মাথার চুল উঠে যাওয়ার ফলে নিশ্চয়ই বীভৎসদর্শনা হয়ে গিয়েছিল। তাই গুলি করে সেই মুহূর্তেই মারা হয়েছিল তাকে। এই রক্ত তার। আর এক তলায় নেমে সিঁড়ির প্রশস্ত চাতালের সেই রক্ত? ওখানেও পিশাচেরা কাউকে গুলি করে থাকবে। কাকে? তার নাম নেই। কিন্তু চিহ্ন রেখে গেছে। ওই দেখ, ময়লা কাঁথা-বালিশের পুঁটলি, আর গুঁড়া দুধের পরিত্যক্ত টিনপাত্রে কিছু চাল-বড়ো জোর সের খানেক হবে। ওই নিয়েই। বাঁচতে এসেছিল এখানে। ওই সবি ফেলে এখন কোথায় গেছে? যেখানে গেছে আর সেখানে মৃত্যু নেই। প্রতি মুহূর্তে কি একটা আগলে-বেড়ানোর দায় নেই। অতএব শঙ্কাও নেই।
এতো শঙ্কা বয়ে বেড়াচ্ছি কেন আমরা? বাঁচতে চাই বলে? প্রতি মুহূর্তে শঙ্কা বুকে বয়ে বেঁচে থাকা যায় নাকি! বাঁচার নাম আনন্দ—সে জন্য শঙ্কা-পোষণ কেন? আনন্দ কুসুমের জন্ম সাহসের বৃন্তে। অতএব সাহস সঞ্চয়ের চেষ্টা করলেন সুদীপ্ত। সাহস প্রার্থনা করলেন। তাও ব্যর্থ হল। এখন কেবলি। তার শঙ্কিত হওয়ার পালা?…।
সে কে? তার ভিক্ষাপাত্রে এক সের চাল ছিল, সেই যুবতী জননীর কোলে শও-কন্যাটি ছিল। সব ফেলে তারা চলে গেছে। বাসায় এক বস্তা চাল ও কয়েক হাজার টাকার বই ও আসবাবপত্র ফেলে সুদীপ্তও চলে এসেছেন। কিন্তু সেই শঙ্কাটাকে সঙ্গে এনেছেন ঠিকই।
সেই শঙ্কাটা এখানেও সুদীপ্তকে তাড়া করল—ফিরোজের এই সুসজ্জিত ড্রয়িং রুমের মধ্যেও। দেয়ালে ঝুলে থাকা সেই চুলের গোছা সুদীপ্তর চোখের। সামনে ভেসে উঠল। কে যেন একখণ্ড ভারি পাথর ঝুলিয়ে দিল বুকের উপর। আমিনা কখন উঠে চলে গেছেন। এখন তিনি ঘরে একা। এবং সেইটেই সব চেয়ে যন্ত্রণার। সামনের সাদা দেয়াল ফুড়ে এখনি যদি অমনি দীর্ঘ চুল গজায়? আরো তীক্ষ্ম একটা ভয় তাকে আক্রমণ করতে এগুচ্ছিল। কিন্তু তিনি বাঁচলেন একজন ভদ্রলোকের আগমনে। ভদ্রলোকের মুখ-ভরা দাড়ি। মৌলভী সাহেব বোধ হয়। পরিধানে পাজামা ও সেরওয়ানী, মাথায় টুপি। তিনি এসেই পরিষ্কার উর্দুতে ফিরোজ সাহেব ভেতরে আছেন কি না জিজ্ঞাসা করলেন। সুদীপ্ত একেবারে অবাক। এই ধরনের মানুষের সাথেও ফিরোজের দোস্তি আছে নাকি। সুদীপ্ত একটু বিস্ময় অনুভব করলেন। এবং বিস্ময় তার সপ্তমে চড়ল যখন। ফিরোজ এসে আগন্তুককে দেখেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
যাক তুমি এসে গেছ তবে। এখন খবর কি বল?
কিছু বলতে আগন্তুক ইতস্তত করছিলেন। ঘরে তৃতীয় ব্যক্তি আছেন। ফিরোজ তা বুঝতে পেরে বললেন
হ্যাঁ, এর সামনে স্বচ্ছন্দে মুখ খুলতে পার। আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। তদুপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। চেষ্টা করলেও আমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সম্পর্কে তোমার ধারণা তো বেশ উচ্চমানের বোধ হচ্ছে।
আগন্তুক ভদ্রলোক এবার পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠলেন—
আপনি ভাই রাগ করবেন না আপনাদের কিছু সংখ্যক অধ্যাপক সম্পর্কে আমাদের ধারণা সত্যই খুব নিম্ন মানের। উপকার-অপকারের প্রশ্ন বাদ দিন, কোনো কিছু করার ক্ষমতাই তারা রাখেন না। কয়েকটা কথা মুখস্থ করে সেইগুলি বছরের পর বছর ধরে আওড়ে অর্থোপার্জনটা একজন যথার্থ তোতা পাখির কর্ম ছাড়া কি?
এ্যাঁ। এই মৌলভী সাহেব ধরনের লোকটি বলছেন এ কথা! চমকে উঠতেই তো হয়। মৌলভী সাহেব হলেই কেবলি হাদিস কোরানের কথা জানবেন তার কি মানে আছে। সুদীপ্ত বললেন, সে কথা, ধরুন, আলাদা ভাবে বলে কিছু লাভ নেই। কর্মজীবনের নানা স্তরে অমনি তোতা পাখিদেরই তো সংখ্যাধিক্য। যেমন দেশ, দেশের মানুষ যেমন, তেমনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরাও তেমনি। সমাজের কোনো-একটা অংশকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে পারেন কি?
বুঝলে হে কোরায়শী, ফিরোজ বললেন, এই জন্যই এ ভদ্রলোক আমার বন্ধ। তমি যতোই ঘা দিয়ে কথা বল, চটবেন না। তুমি রাগাতে চাইলেই উনি রাগবেন ভেবেছ।
সুদীপ্ত বুঝলেন, ফিরোজ কথার মোড় অন্য দিকে ফেরাতে চাইছেন। অতএব তিনি চুপ মেরে গেলেন। এবং যথারীতি আলোচনা অন্য মোড় নিল।
কোরায়শী নামক আগন্তুকটি জানালেন।–
তোমার বাড়িতে থাকা চলবে না। ওদের প্ল্যান হচ্ছে, আওয়ামী লীগের সকলকে ওরা হয় সাবাড় করবে, না হয় নীতি বিসর্জন দিয়ে দালালির কাজে লাগতে বলবে। সামনে খুব দুর্দিন।
