এবং তখনি মনে হল ডঃ ফজলুর রহমানের ভাগ্যেও কি তবে…? না, তা হতেও পারে। তাদের মতোই তিনিও লুকিয়ে বাঁচতে পারেন না? হাঁ, বেঁচেই আছেন হয়ত। আশাটাকে দুহাতে বুকে চেপে সুদীপ্ত ভেতরে গেলেন। হায় হায়, কাঞ্চন যে! শয়ন কক্ষের সামনে বারান্দায় কাঞ্চনের লাশ পড়ে আছে। ডঃ ফজলুর রহমানের ভাগনে কাঞ্চন। মামার কাছে থেকে কলেজে পড়ত। কলেজে? ব্যাস, তবে আর কথা নেই। এ ছেলে রাষ্ট্রদ্রোহী না হয়ে যায় না। রাষ্ট্রদ্রোহী যে, তার আরো প্রমাণ আছে। স্বাস্থ্য ভালো ছিল কাঞ্চনের। খেলাধুলা করা সবল সুস্থ একজন বাঙালি যুবক। ওরে বাবা। তা হলে তো একে বাঁচতে দেওয়া যায় না। ভাগনে কাঞ্চনকে মেরে শোবার ঘরে ঢুকে মামাকে মেরেছে। দেয়াল-আলমারির পাশে কাত হয়ে পড়ে আছেন ডঃ ফজলুর রহমান। আলমারি খোলা! আলমারিতে উঃ রহমান কিছুই রাখতেন না নাকি! নিশ্চয়ই মূল্যবান কিছু রাখতেন। কিছুই তার অবশিষ্ট নেই। রহমান সাহেবের গায়ের সৌখিন পাঞ্চাবীতেই সাক্ষ্য দিচ্ছে, তিনি ভদ্র পোশাকে ভদ্রলোকের। মুখোমুখি হওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। এবং ঐখানেই ভুল করেছিলেন। ভুল করতে যাচ্ছিলেন সুদীপ্তও। স্ত্রীর বুদ্ধিতে বেঁচে গেলেন, স্ত্রী ছিলেন না বলে রহমান সাহেবের ভুল শুধরে দেবার কেউ ছিলেন না। কিন্তু অনেকেরই তো স্ত্রী ছিলেন। যেমন অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের, ডঃ জ্যোতির্ময়। গুহঠাকুরতার, ডঃ মুকতাদিরের। তাঁদেরকে ভালো মানুষ সেজে ডেকে নিয়ে গিয়ে মেরেছে। কিন্তু সাদেক সাহেবকে তো মেরেছে স্ত্রীর সামনেই গুলি করে। না, কোনো এথিকস মেনে ওরা কাজ করে নি। যা ইচ্ছে করেছে। যা ইচ্ছে? এমনি করে ইচ্ছার লাগাম ছেড়ে দেওয়া কি মানুষকে সাজে। বার বার চিন্তায় ভুল হয়ে যাচ্ছে সুদীপ্তর। তার চিন্তা কেবলি বিবর্তিত হতে চাইছে মানুষকে কেন্দ্র করে। অতএব এ হেন চিন্তা সম্পদ নিয়ে অমানুষের কার্যকলাপের ব্যাখ্যা তিনি কেমন করে পাবেন? হুহু করে শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন সুদীপ্ত। ভাই ফজলুর রহমান, দুজনে সেদিন কত তর্ক করলাম রে! তর্ক হয়েছিল সংস্কৃতির ব্যাখ্যা নিয়ে। ডঃ রহমান সংস্কৃতির বিকাশে ধর্মের গুরুত্বকে স্বীকার করেন প্রবলভাবেই। সুদীপ্ত করেন না। তাই নিয়ে তর্ক। কিন্তু মনোমালিন্য নয়। মাত্র চার দিন আগের কথা। সদ্য তিনি অসুখ থেকে উঠেছেন। পানিবসন্তে ভুগে কেমন স্নান দেখাচ্ছিল ভদ্রলোককে। কিন্তু মুখের সেই হাসিটুকু ঠিকই ছিল। আর সেই হাসি সুদীপ্ত কখনো দেখবেন না। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বেরিয়ে এলেন। এবং তখনি মনে হল ছাদটা একবার দেখা দরকার। পরশু রাতে অত দাপাদাপিটা শোনা গিয়েছিল কিসের? ভাবতে ভাবতেই আর নিচে না নেমে উপরে চললেন। সিঁড়ির সর্বোচ্চ ধাপে একটি কাঁথার উপরে পড়ে আছে একটি শিশু-কন্যা। থমকে দাঁড়াতে হল। এতো কচি মেয়েটাকেও ওরা মেরেছে। গলায় গুলির দাগ। নাকি বেয়নেটের খোঁচা! কত বয়স হবে? দুমাস? তিন বা চারমাসের বেশি কিছুতেই নয়। কিন্তু মেয়ের মা কৈ? ছাদে কোনো যুবতী স্ত্রীলোকের লাশ সুদীপ্ত দেখলেন না। বয়স্ক পুরুষের লাশও না। বেশির। ভাগই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং কয়েকজন ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে। সব মিলে প্রায় তিরিশ-চল্লিশ জন হবে। ছোট ছেলে-মেয়েরা প্রাণের ভয়ে গড়িয়ে গিয়ে পানির চৌবাচ্চার নিচে লুকিয়ে ছিল। সেই খানেই গুলি করে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হাঁ, ঘুমিয়ে থাকার মতোই দেখাচ্ছে। অনেক কটি ভাই-বোন এক শয্যায় শুয়ে ঘুমালে সকাল বেলায় তাদের কেমন দেখায়? কে কোথায় পা রেখে, কোথায় মাথা রেখে এলোপাথাড়ি ঘুম দিচ্ছে, কোনো চিন্তা-ভাবনা কিংবা সৌজন্যবোধের বালাই নেই—এ যেন অনেকটা তেমনি। তেমনি? এমনি রক্তের উপর পড়ে থাকে নাকি তারা! আহা, এতোগুলি কচি ছেলে-মেয়েকে মারতে ওদের হাত পা কাপেনি! ফজলুর রহমানকে দেখে সুদীপ্ত কেঁদেছিলেন। কিন্তু এতগুলি মানবসন্তানের এই নিষ্ঠুর পরিণতি সুদীপ্তকে লজ্জা দিল। বনের পশুও তো কেউ এমন করে মারে না। দুমাসের শিশুকে বনের বাঘও তো আক্রমণ করবে না। ক্ষুদ্র মানব-শিশু রমুলাসকে লালন করে নি বনের এক বাঘিনী? হ্যাঁ, মানুষ পশুরও অধম কখনো হয়। কিন্তু সব মানুষ হয় না। যারা। হয় তাদের সঙ্গে কি একত্র থাকা চলে? না, আর ওদের সাথে নয়। ফিরোজ ঠিকই বলে। ফিরোজ বলে, ব্রিটিশ রাজত্বে বাংলাদেশের অবস্থা যেমন ছিল এখনো ঠিক তেমনি আছে। স্বাধীনতা-সংগ্রাম এখনো তাই শেষ হয় নি। শেষ কী? শুরুই তো হয় নি এতোকাল। শুরু হয়েছে, গত ৭ই মার্চ থেকে। মুজিবুর রহমান গণ-আন্দোলন শুরু করলেন।…আমাদের এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। স্বাধীনতা? প্রশ্ন তুলেছিলেন। সুদীপ্ত। বন্ধুর সঙ্গে তর্ক করেছিলেন। কিন্তু আর তো তর্কের অবকাশ নেই। পাকিস্তান নামে কোনো দেশ পাঞ্জাবসিন্ধু অঞ্চলে থাকতে পারে, বাঙলায় নেই। থাকলে তো ওরা-আমরা মিলেমিশে একই দেশের অধিবাসি হতাম। এবং তা। হলে এমনি করে নির্বিচারে নারী-শিশু-বৃদ্ধ সকলকে ওরা হত্যা করতে পারে? নিজের দেশের লোক হলে এমনি করে নিরপরাধ জনসাধারণকে মারতে পারে কেউ? পরের দেশেও এমন ঢালাও গণহত্যার কথা কচিৎ শোনা গেছে।
গতকালের দেখা সেইসব দৃশ্যাবলি সুদীপ্তর চোখে এখনও ভাসছে। এখন তার মনে হচ্ছে, জীবনে আর কখনো বোধ হয় কোনো মুহূর্তটি একা বসে। কাটাতে পারবেন না। একা হলেই ওরা এসে ঘিরে ধরে যে। চিলেকোঠার ছাদে সে বাপ-ছেলের লাশ! আর সিঁড়ির সর্বোচ্চ ধাপে দু-মাসের শিশু-কন্যা। কিংবা দেখ, জলের ট্যাঙ্কের নিচে সেই জড়াজড়ি করে পড়ে থাকা ছেলেরা। কে যেন কান ধরে ঐগুলোই দেখাতে নিয়ে যায় বারে বারে।
