সালা বাঙালি কুত্তা ভাগ গিয়া।
বলতে বলতে বেরিয়ে চলে গেল ওরা। একটা আলমারিতে ও খাটের এক কোণে আগুন ধরে গেছে ততক্ষণে। আর তো খাটের নিচে থাকা চলে না। কিন্তু সৈনিকরা যদি বাইরে ওত পেতে বসে থাকে। না, থাকবে না। ওরা না। জেনে গেছে, বাঙালি কুত্তা ভাগ গিয়া। তবু যদি–। না, না যদি-র কোন অবকাশ নেই। পুড়ে মরার চেয়ে গুলি খেয়ে মরা ভাল। সকলে বেরিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে স্নান-ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। ভাগ্যক্রমে কলে পানি ছিল। আগুন তখনও খুব বেশি ছড়ায় নি। ওরা স্বামী-স্ত্রীতে সহজেই সে আগুন নিভিয়ে।
ফেললেন। আর তাঁরা কেউ খাটের নিচে গেলেন না। মেঝেতে বসে থেকেই এখন বাকী রাতটুকু কাটাবেন। কিন্তু কাটাবেন কী করে। ওরে মা রে, এ কি আওয়াজ!
এতো প্রচণ্ড আওয়াজ সুদীপ্ত কখনো শোনেন নি। এতক্ষণ এই আওয়াজটা কই ছিল না। সম্ভবতঃ কামান দাগছে ওরা, কিন্তু কোথায়? সারা এলাকার ঘর-বাড়ি সব ধূলিসাৎ করে দেবে নাকি। গুলির হাত থেকে বেঁচে এখন ছাদচাপা পড়ে মরতে হবে। উহ্ কি বিকট আওয়াজ। আর গন্ধ। বিশ্রী ঝাঁঝালো গন্ধে বাতাস ভরে গেছে। ছদি যদিও মাথায় না ভেঙ্গে পড়ে তা হলেও এই গন্ধেই মরতে হবে। এই কূটগন্ধ দূষিত বাতাস কিছুক্ষণ টানলেই নির্ঘাত। মৃত্যু। সুদীপ্ত জানলা বন্ধ করতে গেলেন। উত্তর দিকের জানলা বন্ধই ছিল। পূর্ব ও দক্ষিণের জানলা দুটো পর্দা-আড়ালে দেহ লুকিয়ে বহু সন্তর্পণে তিনি বন্ধ। করলেন। পায়ের নিচে অনুভব করলেন ভাঙা কাচের টুকরো। তখনি মোজা-জুতো পরিয়ে দিলেন ছেলে-মেয়েদের পায়ে।
চারদিকে ফর্সা হয়ে এলে অতি সন্তর্পণে জানলার পর্দা একটু ফাঁক করে পুব দিকের খোলা মাঠের পানে তাকালেন সুদীপ্ত। এ্যা! এ কী কাণ্ড! এত মৃতদেহ! মাঠের এক কোণে অনেক লাশ পড়ে আছে। অনেক লাশ! ওদেরকে কোথাও মেরে ঐখানে জমা করেছে? নাকি, জ্যান্ত ধরে এনে ঐখানে দাঁড় করিয়ে গুলি করেছে? যাই ওরা করে থাকুক, ঐখানে এমনি করে ফেলে রাখার কারণটা কি? লাশের আদমশুমারী করবে নাকি!
দক্ষিণ দিকের জানলা দিয়ে এবার দৃষ্টি ফেললেন সুদীপ্ত। ইকবাল হলের মসজিদের ছাদে কয়েকটি লাশ। একটি লাশ পড়ে আছে সেখানে পাইপের একটি বড় ছিদ্র দিয়ে ঝর ঝর করে জল পড়ছে। বোধ হয়, গুলি খাওয়ার পরও জীবিত ছিল ছেলেটি, এবং পিপাসার্ত হয়েছিল। তখনি বোধ হয় সে কোনো মতে নিজেকে ঐ জলধারার নিচে নিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু মুখ তো জলের। নাগাল পায় নি। পানির পেয়ালা হাতে পেতেই প্রাণ নিঃশেষিত হলে? সে পানি পাওয়া না-পাওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে? হায় হায়, ছেলেটা পিপাসা নিয়েই মরেছে। সুদীপ্ত দেখলেন, জলের ধারা ঝরছে তার গলার কাছে বুকের উপর। তখনও ঝরছে। কয়েকদিনই ঝরেছিল অনবরত। এবং ঝরে ঝরে তার গায়ের উপর দিয়ে গড়িয়ে গেছে। বিশুদ্ধ পিপাসার জল। কিন্তু পিপাসা-নিবৃত্তির প্রয়োজনে লাগে নি।
শুক্রবার ছাব্বিশে মার্চ সারাদিন সুদীপ্তকে ছেলেমেয়ে নিয়ে শোবার ঘরে কাটাতে হল। বারান্দায় বেরুনোর উপায় নেই। সামনে ইকবাল হলের নিচের তলায় প্রভোস্ট অফিসে আগুন জুলল বেলা প্রায় এগারোটা অবধি। আর ইকবাল হল ও তেইশ নম্বর বিল্ডিংয়ের মাঝখানে বাবুর্চি-বেয়ারাদের জন্য যে ঘর বানানো হয়েছে তার বারান্দা অধিকার করে কয়েকটি মিলিটারি জওয়ান বসে থাকল সারাদিন। তেইশ নম্বরের বারান্দা ঠিক মুখোমুখি। এখন তা হলে। ছেলে-মেয়েদের খাওয়ানো হবে কী? হামাগুড়ি দিয়ে শরীর লুকিয়ে রান্নাঘরের কাছে পৌঁছানো যায়। কিন্তু পৌঁছানোই যায় শুধু। লাভ তো কিছু হয় না। তালা। খুলবার জন্য মাথা তুললেই ওদের নজরে পড়তে হবে যে! পুব দিকের মাঠে যেখানে রাশি রাশি লাশ পড়ে আছে যেখানে মিলিটারি জওয়ান টহল দিয়ে। বেড়াচ্ছে। আর, শকুনেরা লোভ ও সতর্কতা নিয়ে চারপাশে তাকাচ্ছে। সত্যি, শকুন বলেই মনে হচ্ছে এই টহলদার সৈনিকগুলোকে। শকুনেরাই ভালবাসে। মৃতদেহ-মৃতদেহ ঘিরে বসে থাকে, ঘুরে বেড়ায়। শকুনেরা ভালোবাসে প্রাণ নয়, মৃতের শরীর। প্রাণবান মানুষকে দেখলেই তাকে শব বানাবার ইচ্ছে জাগবে ওদের, মুহূর্তের মধ্যে গর্জে উঠবে হাতের রাইফেল। অতএব বাঁচতে হলে ওদের দৃষ্টি এড়াতে হবে। কিন্তু রান্নাঘরের তালা খুলতে গেলে ওদের নজরে পড়ার সম্ভাবনা পৌণে ষোলো আনা যে। তা হলে ছেলে-মেয়েদের খাওয়ার কী হবে? ঘরে শুধুই চাল আছে। আর কিছু নেই। ইলেকট্রিক হিটার রান্নাঘরে। রান্নাঘরের মিটসেফে গতরাতের বাসি ব্যঞ্জনও আছে। নষ্ট হয় নি। জ্বাল দিয়ে খাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সে কথা আমিনা এখন মনেও আনলেন না। পানিতে চাল ভেজাতে দিলেন। ঘরে চিড়ে থাকত যদি! কতো কাল তারা। চিড়ে খায় নি। এই মুহূর্তে মনে হল চিড়ে অতি উত্তম খাদ্য। ঘণ্টা খানেক পরে চালগুলো ভিজে একটু নরম হলে তা-ই একটু চিনি দিয়ে ধরলেন ছেলে-মেয়েদের সামনে। নিজেরাও খেলেন। খাওয়া মানে দু বার মুখে দিয়ে এক গ্লাস করে পানি খাওয়া। কতো জনের এই খাওয়া জন্মের মতো ঘুছে গেল এই রাতে! তাদেরও যেতে পারত।….এমন চিন্তায় আক্রান্ত হলে কোনো-কিছু। আর খেতে ভালো লাগার কথা নয়। সুদীপ্তর ক্ষিধে কোথায় উরে গেল।
…আচ্ছা, তখন মরে গেলে আমরা এখন কোথায় থাকতাম। ওই যে লাশগুলো পড়ে আছে ওর মালিকরা গেছে কোথায়?—খুবই ছেলেমানুষের মতো একটা ভাবনা এল সুদীপ্তর মধ্যে। বোধ হয়, মনে মনে খুবই দুর্বল হয়ে বাল্যভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তিনি আর ভাবছিলেন—মরবার পর একবারও কি এই ফেলে-যাওয়া সংসারে বেড়াতে আসা যায় না। হ্যাঁ, তা। গোপনেই তো। তার এই বিছানা-বালীশ, টেবিল-চেয়ার সবি ঠিক এমনিই থাকবে, কোনো সময় কেউ না থাকলে, গোপনে এসে একবার তিনি ব্যবহার। করে যাবেন। ঐ আলমারির বইগুলি মাঝে মাঝে এসে নেড়েচেড়ে দেখবেন। সম্ভব নয় সেটা? না না, এ প্রচণ্ড অবিচার। তার সব কিছু থাকবে, কেবল তিনি। থাকবেন না—এ কখনো হয়, না। কিন্তু সংসারে সেইটেই তো হয়। পরকালের বাগানের একটি ফুলও মর্ত-সংসারের কাউকে উপহার দেবার অধিকার তোমার নেই। পুব দিকের জানলার পাশে দাঁড়িয়ে অকারণেই নানা চিন্তার সুলত শিকারে পরিণত হতে দিচ্ছিলেন নিজেকে। ঐখানে না দাঁড়ালেই তো হয়। বার। বার তবু এই পুব দিকের জানলার পাশেই দাঁড়াচ্ছিলেন এসে। এবং একটি মাত্র চোখ মেলে দেওয়া যায় এমনি একটুখানি পর্দা ফাঁক করে বাইরে দেখছিলেন। পডেই আছে সেই লাশগুলো। কতগুলো হবে? গুণে দেখবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। গায়ে গায়ে জড়াজড়ি হয়ে এমনভাবে সেগুলো পড়ে আছে যে, গণনার। চেষ্টা বৃথা। আজ রোদটাও হয়েছে অতি প্রখর। লাশগুলো ঝলসে যাচ্ছে। জীবনে ওরা নিশ্চিন্ত ছায়ার আশ্রয়ে দুদিন বাঁচতে চেয়েছিল।
