তুমি অত করে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে থেকো না তো।
আমিনা তাড়া দিলেন সুদীপ্তাকে। হ্য, জানলার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়। তাছাড়া, জানলার বাইরে তো দৃশ্য আজ একটাই। সকাল থেকে যেমনটি দেখে আসছেন ঠিক তেমনি ওই মাঠ, মাঠের এক কোণে মরা মানুষের স্তূপ, ওই সেই আপন আপন জায়গায় দাঁড়িয়ে-থাকা গাছগুলি, ওই বিপুল সুউচ্চ জলাধার, ওই ক্লাব, ক্লাবের ওপাশের লাল দো-তালা বাড়িটা…সব সব আছে—একটি মাত্র ছবির মতো। অন্যদিকে হাঁ এরাই জন্ম দেয় প্রতি মুহূর্তের কতো অজস্র দৃশ্যমালার। আজ সেই দৃশ্যেরা কোথায়? ক্লাব-প্রাঙ্গণের গাছটা। কতো নিঃসঙ্গ। সুদীপ্তর নিঃসঙ্গতাকে সে যেন সান্তনা দিচ্ছে ওইখান থেকে।
শেষ পর্যন্ত জানলার কাছ থেকে সরে এলেন সুদীপ্ত। স্ত্রীর কথাতেই সরে এলেন। কিন্তু। সরে এলেই বা স্বস্তি কই? উত্তর দিকের জানলায় আবার চোখ রাখলেন অতি সন্তর্পণে। সামনের একতালা পাশাপাশি দুটো বাংলো। খালি পড়ে আছে। পুব দিকেরটাতে থাকতেন উর্দু ও ফারসী সাহিত্যের অধ্যাপক ডঃ সাদানী। কবি ও পণ্ডিত হিসাবে তার খ্যাতির কথা সুদীপ্ত শুনেছেন। শুনেছেন। কেননা জানবার অবসর জীবনে পাননি। দেখা হলে সুদীপ্ত তাকে সালাম। দিয়েছেন বহুবার। এবং উত্তর পেয়েছেন। তার অতিরিক্ত একটা কথাও নয় কিন্তু। ওই দিক থেকে, সুদীপ্ত ভেবে দেখেছেন, একজন মানুষের মতো মানুষ। ছিলেন অধ্যাপক ডঃ গোবিন্দচন্দ্র দেব, সংক্ষেপে জি. সি. দেব। সুদীপ্ত সবে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে দেখা হতেই যথারীতি আদাব দিয়ে তিনি সরে যাচ্ছিলেন। গোবিন্দবাবু যেতে দিলেন না। নতুন মানুষ দেখে পরিচয় শুধালেন। এবং সুদীপ্ত অবাক হলেন এই দেখে যে নাম শুনেই গোবিন্দবাবু তাকে চিনলেন। তাঁর সদ্য-প্রকাশিত কবিতার বইটি তিনি পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সাহিত্যের অধ্যাপকও তা পড়েন নি। এতো বিচিত্র পিপাসা ছিল ভদ্রলোকের। দর্শনের অধ্যাপক হয়েও কবিতার পিপাসা, হিন্দু হয়েও ইসলামকে জানার পিপাসা, বিশুদ্ধ বাঙালি হয়েও বিশ্বমানবের সকলের সঙ্গে মিলনের পিপাসা। পক্ষান্তরে প্রফেসর সাদানী? বাংলাদেশে অমন কম করে হলেও তিরিশ বছর বাস করেছেন। সাহিত্যের অধ্যাপক। তাও আবার কবি। অথচ কবি রবীন্দ্রনাথের ভাষা বাংলার প্রতি কোনো আগ্রহ কখনো তার মধ্যে দেখা যায় নি। বাংলা বলতেও শেখেন নি। এবং তা না শেখার জন্য তার নাকি একটা গর্ববোধ ছিল মনে মনে। সামাজিক কুপমণ্ডুকতা সৃষ্টি করে রক্তের বিশুদ্ধি রক্ষার মতো তিনি নাকি তার জবানের বিশুদ্ধতা রক্ষা করেছেন। অনার্য বাঙালির সঙ্গে বেশি মাখামাখি তিনি পছন্দ। করতেন না। সেই সাদানী গতবার মারা গেলে বাঙালিরাই বুক ভাসিয়েছিল। সভা করে। বলা হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্তম্ভ নাকি খসে গেছে। কিন্তু ঐ স্তম্ভটা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কি শোভা বাড়াচ্ছিল সেটা সুদীপ্তর কাছে স্পষ্ট হয় নি কোনদিনই।
ডঃ সাদানীর বাংলোর পশ্চিম-সংলগ্ন এই বাংলোতে থাকতেন অধ্যাপক মনিরুজ্জামান—পরিসংখ্যান বিভাগের প্রধান। বাংলোটা এখন খালি। সপ্তাহ দুয়েক হল, তিনি চৌত্রিশ নম্বর দালানের একটা ফ্ল্যাটে চলে গেছেন। ভালোই করেছেন। বেঁচে গেছেন ভদ্রলোক। তার ভাগ্যই তাকে এই অভিশপ্ত এলাকা। থেকে সসম্মানে নিরাপদ এলাকায় নিয়ে গেছে। কী আশ্চর্য বোকার মতো। সুদীপ্তর তখন মনে হচ্ছিল, একমাত্র তাদের এলাকা ছাড়া ঢাকা শহরের আর সকলে দিব্যি সুখে আছে খাচ্ছে, গল্প করছে, কিংবা ঘুমুচ্ছে। না হয় তাস খেলছে। মানুষ বোধ হয় নিজের ট্রাজেডিকেই বড়ো করে দেখতে ভালোবাসে। আবার স্ত্রীর তাড়া খেলেন সুদীপ্ত—
জানলার ধারে এতো কি দেখছ তুমি! তুমি দেখছি একটা বিপদ না। বাধিয়ে ছাড়বে না?
তাই তো। কি এতো দেখছেন তিনি! উত্তরের এই জানলাটা দিয়ে ওই প্রধান সড়কের কিয়দংশ দেখা যায়। সেই মুহূর্তে একটা ট্যাঙ্ক ছুটে যাচ্ছিল। সুদীপ্ত জীবনে এই প্রথম ট্যাঙ্কের দৌড় দেখলেন! ঢাকা শহর কি তা হলে এতোই বিদ্রোহী হয়েছে! ট্যাঙ্ক ব্যবহার না করলে হালে পানি পাচ্ছে না। পাক-বাহিনী!
আমিনার তাড়ায় জোহরের নামায পড়ে কোরান শরীফ নিয়ে বসতে হল। সুদীপ্তকে। নামাজ ও কোরান পাঠের জন্য ইতিপূর্বেও তিনি একাধিকবার স্ত্রীর তাড়া খেয়েছেন। কিন্তু অধম স্ত্রীজাতির কথাকে কখনো আমল দেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করেন নি। আজ কিন্তু ভারি সুবোধ অনুগত স্বামীর ভূমিকা পালনে প্রবৃত্ত হলেন। মনে পড়ল, সেই কবে কতো কাল আগে মরণাপন্ন মায়ের। কাছে বসে কোরান পড়েছিলেন। তিনি তো জানতেন না, আজো তিনি যে কোরান নিয়ে বসেছেন তাও একটি মৃত্যু-শিয়রের পাশেই। তিনি জানতেন না। যে, নিচের তলায় পড়ে ডঃ ফজলুর রহমানের মৃতদেহ, নাকি হতচেতন দেহে মৃত্যু আসতে কিঞ্চিৎ বিলম্ব ছিল তখনো। ডঃ রহমানের নিকটতম জীবিত ব্যক্তি সুদীপ্ত কোরান নিয়ে বসেছেন। আহা, এই এলাকার কতো জনই তো মরেছে আজ! সকলের আত্মার কল্যাণ হোক। অনেক বছর পর অনেকক্ষণ ধরে। কোরান শরীফ পাঠ করলেন অধ্যাপক সুদীপ্ত শাহিন। ক্রমে সন্ধ্যা এল।
সেই সন্ধ্যার অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে আমিনা গিয়ে রান্নাঘর খুললেন। স্বামী ও ছেলে-মেয়েদের সামনে যখন ভাত-তরকারি তুলে ধরলেন তখন কত রাত। তাকে রাত বলে না। সন্ধ্যা আটটা। সেই সন্ধ্যা আটটাতেই তখন ঢাকা। শহরকে মৃত প্রেত-পুরী মনে হতে লাগল। কোথাও কোনোদিকে একটু আলো জুলুক! কিম্বা কোনো শব্দ! ওহ, কী ভয়াবহ। সুদীপ্তর মনে হল, ছোট-বড় মিলিয়ে তারা এই পাঁচজনই কেবল সমগ্র ঢাকা শহরে জীবিত আছেন। এক বিশাল আলবাট্রসের পাখার নিচে সমগ্র নগরী যেন দুঃস্বপ্নগ্রস্ত। খেতে গিয়ে। একটি গ্রাসও মুখে তুলতে পারলেন না সুদীপ্ত। উঠে পড়লেন।
