ওগো আল্লাহকে ডাক।
ছাদে কিছুক্ষণ আগে থেকেই পদশব্দ শোনা যাচ্ছিল। সম্ভবতঃ রেলকলোনির মানুষ ওরা। ওদের কলোনি আক্রান্ত হলে যারা পেরেছে কোনো মতে প্রাণ নিয়ে এসে লুকিয়েছে।
কিন্তু লুকিয়েছে কোথায়? এই ভো, তেইশ নম্বরও এখন তিন দিক থেকে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে। সুদীপ্তদের জানলার কাঁচ ভেঙ্গে দু-একটি গুলি ঘরের মধ্যে এসে পড়তে শুরু করেছে।
ওগো, ওরা আমাদের মেরে ফেলবে। আল্লাহ্ বাঁচাও। ইয়া আল্লাহ। ওগো তোমরা সব আল্লাহকে ডাক।
আল্লাহ্, তোমার শক্তি এই মুহূর্তে কয়েকখানা মর্টার-মেশিনগান হয়ে আমাদের হাতে আসুক।
–সহসা প্রচণ্ড ক্রোধে সুদীপ্তর দুচোখ জ্বলে উঠল। কিন্তু নিভে গেল পরক্ষণেই। এদিকে সুদীপ্তর বুকের মধ্যে বেলা তার আব্বার কথা একটুও বোঝে নি। কিন্তু মায়ের কথা বুঝেছে ঠিকই। সে ততক্ষণে তার মায়ের অনুকরণে শিশু-কণ্ঠে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করেছে–
আল্লাহ আল্লাহ—আচ্ছা আব্ব, ওরা আমাদের মারবে কেন?
মা গো, এ কথার কি জবাব তোমাকে আমরা দেব! ওরা আমাদের মারবে কেন? মানব-শিশুর এই প্রশ্নের উত্তর আমরা চাইব কার কাছে? মানুষের কাছেই তো। কিন্তু মা, ওরা যে মানুষ নয়। মানব-জীবনের মূল্যবোধ নিয়ে কথা উঠলে ওরা যে, পশুর পর্যায়ে পড়ে। হাঁ, এই সবি ছিল সুদীপ্তর মনের। কথা। বলতে পারলে এই সব কথাই সে মেয়েকে বোঝাত। কিন্তু সেই মুহূর্তে সব কথা বুকের মধ্যে শুকিয়ে গিয়েছিল। কোনো কথাই সুদীপ্ত বলতে পারেন
–সিঁড়িতে পদশব্দ সুদীপ্ত শুনতে পান নি। কয়েকটি ভারি বুটের শব্দ বুলেটের আওয়াজে ডুবে গিয়েছিল। সিঁড়ির প্রতি ধাপে তারা গুলি করতে করতে এগিয়েছিল। প্রথমে ছাদের উপরে। ছাদের ছুটাছুটির শব্দ, আর বেধড়ক বুলেটেবাজি। কেবল একপক্ষের বুলেট আর-এক পক্ষ দাপাদাপি করে মরছে? মারছে না? কী দিয়ে মারবে শেখ সাহেব অহিংস আন্দোলন শুরু করেছিলেন। অন্ত্রের কথা কেউ তো ভাবে নি। এবং সকলেই ভেবেছিল, নিরস্ত্র মানুষকে ওরা প্রচণ্ডতম অস্ত্র দিয়ে আঘাত হানবে এটা হতেই পারে না। কিন্তু “ওরা” মানে। কারা—সেই কথাটা কারো চিন্তায় একবারও আসে নি।
ওগো ছাদে কারা গো! সব মেরে ফেলল।
আমিনার কণ্ঠস্বরে বঙ্গজননীর মমতা ও করুণ কোমলতা প্রকাশ পেল। কিন্তু সুদীপ্তকে তা স্পর্শ করল না। তিনি তখন একটি স্বার্থপরতাকে আঁকড়ে ধরে ভাবতে চাইছিলেন, ছাদ থেকে এবার ওরা নেমে যাবে। ছাদের লোকগুলিকেই ওরা মারতে উঠেছে। তাদের ঘরে ওরা ঢুকবে না নিশ্চয়ই। কেন ঢুকবে? তারা নিরীহ শিক্ষক বৈ তো নন। হাঁ, রাজনৈতিক মত একটা তাদের আছে। সে তা সব মানুষেরই থাকে। কিন্তু সক্রিয় রাজনীতি তো কখনো করেন। নি। অতএব, নেহি বেরাদর, কোনো অতএব নেই। টিক্কা ধার ঢালাও হুকুম-বাঙালিদের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দাও, তাদের হত্যা কর, তাদের রমণীদের ধর্ষণ কর। অতএব সুদীপ্তর ফ্ল্যাটে প্রবেশ-দরজায় ধাক্কা পড়ল। প্রচণ্ড ধাক্কা। কিন্তু ধাক্কা দিয়ে খোলা যাবে না। সুদীপ্ত জানেন তাদের প্রত্যেকটি ফ্ল্যাটের প্রবেশ দরজা দুটি—একটি দিয়ে ঢুকলে প্রথম পাওয়া যায় বারান্দা, অন্যটি দিয়ে এলে পাওয়া যায় বাইরের বসবার ঘর। দুটি দরজাই বেশ মজবুত এবং ভেতর থেকে শক্ত ছিটকিনি দিয়ে আঁটা। তা হলেও সামরিক বাহিনীর লোকেরা কি আর চেষ্টা করলে ঐ খিল ভাঙতে পারবে না? নিশ্চয়ই পারবে। কিন্তু কষ্ট কিছুটা হবেই। এবং কষ্ট করেই যদি ওরা ঢোকে তা হলে ভাগ্যে নির্ঘাত মৃত্যু। তার চেয়ে নিজে খিল খুলে দিয়ে ওদের কাছে আত্মসমর্পণ করাই তো ভালো। সুদীপ্ত মন স্থির করতে সময় নিয়েছিলেন দু-চার সেকেণ্ডের বেশি নয়। বেলাকে বুক থেকে সরিয়ে মায়ের কাছে দিয়ে চট করে বেরিয়ে এলেন খাটের নিচ থেকে। জামা গায়ে পরতে পরতেই ঘর-খুললেন! কিন্তু বারান্দায় পা দিতেই অনুভব করলেন পেছন থেকে স্ত্রী তাকে জড়িয়ে ধরেছেন।
ওগো তুমি পাগল হলে! ওই হাইয়ানদের সামনে যেতে আছে! শিগগির ঘরে এসো।
ঠিক সেই মুহূর্তে। সৈনিকদের গুলিতে ড্রয়িংরুমের প্রবেশ-দরজার ছিটকিনি ভেঙ্গে গিয়ে প্রবল শব্দে দরজা খুলে গেল। সেই সঙ্গে মুহুর্মুহু গুলির আওয়াজ। ড্রয়িংরুমে ওরা কি আস্ত ব্যাটেলিয়ানের মুখোমুখি হয়েছে? ঘরটা। যে গুলি করে ঝাঝরা করে ফেলল! কিন্তু সুদীপ্তর ভাবনারা তখন কোথায়! সেই যে চিন্তাটা তাঁকে ঘর থেকে বারান্দায় এনেছিল সে হঠাৎ অদৃশ্য হল যেন। প্রচণ্ড ঝড়ে আন্দোলিত ডালে কি পাখি থাকতে পারে? স্বামী-স্ত্রী দু-জনেই ছুটে এসে ঢুকলেন খাটের নিচে। ঘরের দরজা পর্যন্ত ভেজানোের বুদ্ধিটুকুও তখন তাদের লোপ পেয়ে গেছে-খাটের নিচে বাপ-মা তাদের পুত্র-কন্যাদের বুকে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে মাথা গুজলেন। আল্লাহ্, রক্ষা কর। রক্ষা কর। বাঁচাও।
হ্যাঁ, আল্লাহই তাঁদেরকে বাঁচালেন। তা না হলে ঘরে ঢুকে বিছানা খালি। দেখেই ফিরে যাবার জন্য পা বাড়াবে কেন তারা? একটু উঁকি মেরে খাটের। নীচেটা দেখার কথা তো সহজেই মনে হতে পারত। হয় নি যে, ওইটুকুই আল্লাহর রহমত। এমনি করেই তার প্রেম নেমে আসে মানুষের জন্য। আরো দেখ, সৈনিকরা যাবার সময় খালি বিছানার এক কোণে শেল মেরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে গেল। কাণ্ডটা তারা বিছানার মাঝখানে করতে পারত, কিবা একাধিক শেল ছুঁড়তে পারত সারা বিছানা ভরে। কিন্তু না। এক মুহূর্তও দাঁড়ায় নি তারা। ঘরে তাদের স্পর্শযোগ্য কিছু ছিল না। কেবল বই ছিল—রাশি রাশি বই। ও ভি শায়তান কা হাতিয়ার—বই হচ্ছে শয়তানের হাতিয়ার। অতএব সেই দিকেও তারা একটা শেল ছুঁড়ে দিয়ে একটা আলমারিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল এবং ঐটেই আল্লাহর কৃপা যে, বই—বিছানা সব পুড়ে-যাওয়ার দৃশ্যটা তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে নি।
