অবশ্যই নিরস্ত্র বাঙালির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কিন্তু সেইটুকুর জন্যই সেনাবাহিনীর পূর্ণশক্তি পাকিস্তানকে নিয়োগ করতে হয়েছিল। গোলন্দাজ বাহিনী, ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া বাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী–বাকি ছিল কোনটা? কিচ্ছু না। শুধু যদি বিমান বাহিনীর ব্যবহার না করতে, তা হলেই দেখা যেত কত বীর তোমরা। কার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল পাকিস্তানের বীর সৈনিকের দল? অসহযোগ আন্দালনে ব্রতী দেশবাসীর বিরুদ্ধে। হাতে অস্ত্র নিয়ে কেউ অসহযোগ আন্দোলনে নামে না। বাঙালির হাতে পদাতিক বাহিনীর অস্ত্র ও ছিল না— বিমান বাহিনী ও নৌ-বাহিনীর কথা তো ওঠেই না। এ হেন বাঙালির বিরুদ্ধে নৌ, বিমান ও সাঁজোয়া বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণ। তাও সে বীরপুঙ্গবেরা দিনের আলোয় বেরুতে সাহস করে নি। এসেছিল রাতের আঁধারে। সুদীপ্তরা তখন ঘুমিয়ে পড়েছেন।
প্রলয়-গর্জনে সুদীপ্তর যখন ঘুম ভেঙ্গেছিল তখন কত রাত? ঐ মুহূর্তে তিনি ঘড়ি দেখেন নি। এতে শব্দ কিসের সেই কথাটিই সুদীপ্ত বিছানায় শুয়ে থেকে একটু ভাবতে চেষ্টা করেছিলেন। ক্লাব থেকে ফেরার সময় গত সন্ধ্যাকে অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়েছিল কি? ক্লাবেও তো কোনো অস্বাভাবিকতার। আভাস মেলেনি।
উহ্, কী ভয়ঙ্কর শব্দ রে বাবা! এ যে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে মালা গাঁথার। দুশ্চেষ্টা। টা-টা-টা-টা……. পট-পটু-পট……গুড়ুম-দ্রুম্ …হুডুম। একই সঙ্গে শব্দের এতো বিচিত্র চেহারাকে সুদীপ্ত কখনো দেখেন নি। ঠিক ঘটছেটা কী? ইতিমধ্যে আমিনাও জেগে উঠেছেন।
ওগো কী হয়েছে! শুনছো?
আমি তো অনেকক্ষণই শুনছি।
সদীপ্ত উঠে বাইরে এলেন। উত্তর দিকের বারান্দায় গিয়ে দেখেন, পশ্চিম দিকের রেল–কলোনির ঘর-বাড়ি জ্বলছে। উত্তর-পূর্ব কোণেও আগুন। আগুন কোনদিকে নেই? আর সব দিক থেকে ভেসে আসছে অসহায় মানুষের আর্ত চী কার। শুরু হয়েছেটা কী? ফজলুর রহমান সাহেবকে ডাকবেন নাকি! দক্ষিণের বারান্দায় এলেন সুদীপ্ত। রান্নাঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়ালেন গিয়ে। ওইখানে দাঁড়ালে নিচের তলায় ফজলুর রহমান সাহেবের বারান্দা দেখা যায়। ভদ্রলোকের স্ত্রী বিলেতে। পি. এইচ. ডি. করতে গেছেন। কয়েক মাসের মধ্যে রহমান সাহেবও যাবেন কথা আছে। আপাতত বিরহ যাপন করছেন। এ নিয়ে প্রায়ই সুদীপ্ত আজকাল রহমান সাহেবকে জ্বালিয়ে যাচ্ছিলেন। জ্বালিয়ে খাওয়া কথাটা রহমান সাহেবেরই।
আপনি আমাকে জ্বালিয়ে খেলেন দেখি। দাঁড়ান, কালই প্লেনের টিকিট কাটছি।
ব্যাস্, একখানা টিকেটেই বিরহের অবসান! রঙ্গ-রসিকতার মূল্য কতো টুকুই বা! কিন্তু এই সব নিয়েই চলছিল উপরে নিচে দুজন অধ্যাপকের পাশাপাশি দুটি জীবন-ধারা। কয়েক ঘণ্টা আগেই ঠিক এই রান্নাঘরের দোর। গোড়াতে দাঁড়িয়েই সুদীপ্ত ফজলুর রহমানের খাওয়া-দেখছেন। বারান্দায় টেবিল পেতে সেখানে রহমান সাহেবেরা খাওয়া-দাওয়া করেন এবং সে জায়গাটা এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। সুদীপ্ত দেখছিলেন। আর মনে মনে আগামীকাল কী-বলে রহমান সাহেবকে বিব্রত করবেন তার একটা রিহার্সাল দিচ্ছিলেন।
দেখুন রহমান সাহেব, অন্যায় একটা করেছি। তবে আপনার গৃহিণী। থাকলে করতাম না।
এইভাবে ভনিতা করে কথা শুরু করতে হবে। তারপর তুলতে হবে সেই ডাল মেখে ভাত খাওয়ার কথা। কিন্তু হায়, সুদীপ্ত কি তখন জানতেন যে, সে কথা তুলবার কোনো সুযোগই সারা জীবনে আর পাবেন না।
কয়েকবার সুদীপ্ত রহমান সাহেবের নাম ধরে ডাকলেন। কিন্তু বাইরের এতো আওয়াজে সুদীপ্তর ক্ষীণ আওয়াজ কারো কানে গেল না বোধ হয়। ইতিমধ্যে আমিনা এসে হাত ধরে সুদীপ্তকে ডাকলেন—
ওগো পাগল হলে তুমি। শিগগির ঘরে এসো। দেখছ না, কীভাবে চারপাশে গুলি ছুটছে। তোমাকে লাগতে পারে তো।
তা তো পারেই। খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপদ নয়। স্ত্রীর সঙ্গে সুদীপ্ত ঘরে এলেন। ছেলে-মেয়েরা তখন সকলেই জেগে উঠেছে। ঘরের মধ্যেও জানলা দিয়ে গুলি এসে তাদেরকে লাগতে পারে। আমিনা অতএব খাটের নিচে চুকলেন অনন্ত ও এলাকে নিয়ে। ছোট মেয়ে বেলা বাপের কোলে। বাপের। কোল যখন পাওয়া গেছে তখন সে নিঃসন্দেহে নিরাপদ। নিরাপত্তার বোধটুকু বেলার ক্ষুদ্র বুকে সঞ্চারিত হওয়া মাত্রই ভীতি প্রকাশের সাহস পেল মেয়ে। এতক্ষণ কাঁদতেও যেন ভয় পাচ্ছিল।
আব্বু, ওইখানে চল না। ভয় করে।
খাটের নিচে আঙুল দিয়ে দেখাল মেয়ে।
হ্যাঁ মা, চল যাই!
খাটের নিচে বস্তায় এক মণ চাল ছিল। সুদীপ্ত সেই বস্তাটাকে সামনের দিকে একটা আড়াল সৃষ্টির চেষ্টা করলেন। কিন্তু এক মণ মাত্র চালের আড়ালে কজন আর লুকোতে পারে!
গুডুম–দ্রুম্ ..ট্রা–রা-রা-রা…..টা-টা-টা-টা-….ট্রা-রা-রা-রা….টা টা… দ্রুম–গুড়ুম……।
কতো রকমের মারণাস্ত্র ব্যবহার করছে ওই বর্বরের দল! এবং আমাদের বিরুদ্ধে। আল্লাহ, আমাদের হাতে দুটো মর্টার কিংবা মেশিনগান যদি থাকত! একটা বন্দুকও নেই যে! এমনি খালি হাতে মরতে হবে। একেবারে খালি। হাতে দাঁড়িয়ে মরতে হবে কথাটা মনে হতেই সুদীপ্তর কান্না পেল। পৃথিবীতে আজোও বর্বর দানবের অস্তিত্ব যখন আছে তখন পুরোপুরি অস্ত্র বর্জন করে লেখনী হাতে নেওয়া বাঙালির উচিত হয় নি। ঠিক এমন একটা অবস্থার মুখোমুখি না হলে এই জ্ঞানোদয়টা সুদীপ্তর কখনোই হত না।
ওরা এবার খুব কাছাকাছি এসে গেছে মনে হচ্ছে। তাদের বিল্ডিংয়ের পাশেই ওদের চিৎকার করে বলা দু-একটা কথা কানে আসছে। কিন্তু কি বলছে বোঝা যাচ্ছে না। বোঝা গেল আমিনার কণ্ঠস্বর
