সেই আফরোজা গতকাল থেকেই ফাঁক খুঁজছিল। গতকাল সুদীপ্তরা যখন এখানে এসে পৌঁছলেন, তখনই জানলার ফাঁক দিয়ে দৃশ্যটা দেখে নিতে আফরোজা ভুল করে নি। অতঃপর আজ এই বেলা এগারটার দিকে এসে এক সময় আমিনাকে একা পেয়ে বলে গেছে—এঁরা পাড় আওয়ামী লীগার। আর্মির। নজর ষোল আনা এদের পরে।
কথাটা কিছু অস্বাভাবিক তো মনে হয় নি। আমিনার মনে হয়েছিল এ কথা আগেই তারা ভাবতে পারতেন। ভাবা উচিত ছিল। হাঁ তো, আওয়ামী লীগারদের এখন বিপদ বৈ কি। এবং সে বিপদ এখানে এলে তাদের ঘাড়েও কিছুটা পড়তে পারেই তো। অতএব সরে যাওয়া কর্তব্য। সেই কর্তব্যের কথা তিনি স্বামীকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। এবং ঐ পর্যন্ত। রাস্তায় যানবাহন নেই। অতএব অচলাবস্থা।
স্বামী-স্ত্রী, সুদীপ্ত ও আমিনা, দুটি পৃথক সোফায় নিঃশব্দে মুখ গুজে বসে রইলেন।
১৪. মন যে ঘুরে ঘুরে ঐখানেই যেতে চায়
মন যে ঘুরে ঘুরে ঐখানেই যেতে চায়। ঐ সেই নারকীয় রাত্রির চত্বরে। তেইশ নম্বরে শেষ দুটি রজনীর নানা প্রহরের গলিতে নিশী পাওয়া ব্যক্তির মত ঘুরে ঘুরেই মরতে হবে? যে-কোন মুহূর্তে নির্জন পেলেই সুদীপ্তর মন তৎক্ষণাৎ সেই দুটি রজনীর অধিবাসী হয়ে উঠে।
কিন্তু আমিনা? তিনি এখন ঠিক তেমনিভাবে বসে আছেন যেমন বসে ছিলেন সেই গতকাল সকালে। কারফিউ উঠার সময়। কারফিউ উঠলে আমিনা ঘর থেকে বেরিয়ে নিঃশব্দে এসে বারান্দায় বসেছিলেন। ইকবাল হলের দিকে চোখ রেখে একটা চেয়ারে যেন সহসা পুতুল হয়ে গিয়েছিলেন। সুদীপ্ত যখন বাইরে যাবার পোশাকে ঘর থেকে বেরিয়ে স্ত্রীকে বলেছিলেন–
আমি একটু নীচে থেকে আসি।
আমিনা তখন কোনো কথা বলেন নি। ছত্রিশ ঘণ্টা পর সবে তখন কারফিউ উঠেছে। রাস্তায় মানুষ বেরুতে শুরু করেছে। নীচেও জমা হয়েছে কিছু মানুষ। সুদীপ্ত দোরগোড়া পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এলেন। আমিনা বাধা দিচ্ছেন না দেখে খুবই অবাক হয়েছিলেন তিনি। বললেন–
আশে পাশে একটু ঘুরে দেখে আসব। আধ ঘণ্টা খানেক দেরি হতে পারে। তোমরা ঘাবড়ে যেও না যেন। আর তৈরি হয়ে থেকো। এখানে থাকা যাবে না। কোথাও কেটে পড়তে হবে।
না। তাও কিছু বললেন না তাঁর স্ত্রী। স্ত্রীকে এমন অনুগত তার বিবাহিত জীবনে একদিনও দেখেন নি সুদীপ্ত। স্ত্রীর মুখের উপর সেই মুহূর্তে কী দেখেছিলেন সুদীপ্ত। প্রায় সারা রাত না ঘুমিয়ে ভোরের দিকে গুলি-গোলার আওয়াজ কিছুটা কম হতেই ছেলে–মেয়েরা একটু ঘুমিয়েছে। এখনো ঘুমিয়েই আছে তারা। কিন্তু স্বামী স্ত্রী কেউ ঘুমোন নি। কেউ কাউকে কথাও খুব একটা বলেন নি। স্ত্রী আমিনার চোখে কেমন একটা নির্বিকার ভাব। স্বামী এখন কোথায় যেতে চায়, এখনি বেরুতে গেলে কোন বিপদ হতে পারে কি না, একান্তই যদি বেরুতে চায়, কতক্ষণে তবে ফিরতে পারবে—ইত্যাদি বহু প্রশ্নই তো এখন আমিনার থাকার কথা। কিন্তু কোন প্রশ্নই স্ত্রীর চোখে সুদীপ্ত দেখলেন। না। এখন সুদীপ্তও যেন কেমন হয়ে গেছেন। তা না হলে এমন নিরুৎসুক, যেন। প্রাণহীন স্ত্রীকে রেখে কি বেরিয়ে পড়তে পারতেন? মেয়েটার হল কি—এমন একটা প্রশ্ন অন্ততঃ একবারও তো মনে জাগতে পারত। কিন্তু জাগেনি। বিশ্বাস, বিস্ময়, উৎসাহ এবং কৌতূহলের যে সকল গ্রন্থি জীবনকে নানা জগৎ-ব্যাপারের সঙ্গে গ্রথিত রাখে তার সব কটি কি মরে গেছে সুদীপ্তর মধ্যে? তা হলে এখন বাইরে বেরুনোর ঝোকটাই বা মাথায় চাপে কেন?
সত্যকার বাইরে বেরুনো কাকে বলে সেটা বারান্দায় বেরিয়েই কিঞ্চিৎ টের পেয়েছিলেন সুদীপ্ত। গত ছত্রিশ ঘণ্টা এই বারান্দায় তারা কেউ পা দিতে পারেন। নি। ঘরের সংলগ্ন বারান্দা। সেখানেও পা দিতে ভয়! ভয় তো হবেই। বারান্দায় পা দিলেই ইকবাল হলের মসজিদের ছাদে মরা মানুষের সারি সারি লাশগুলো দেখা যাচ্ছিল। এখনো দেখা যাচ্ছে। এবং শেষ পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল। কাক-শকুনে খেয়ে নেবার পর সেখানে কঙ্কাল পড়ে ছিল আঠারোই এপ্রিল পর্যন্ত। সুদীপ্ত সে সব জানতেন না। জানতেন না যে, তাদেরও ছাদে তিরিশ-চল্লিশ জনের মৃতদেহ, অবশেষে কঙ্কাল, অমনি পড়েছিল এপ্রিলের আঠারো তারিখ পর্যন্ত। অতঃপর সরানো হয়। সরানোনা হতেও পারতো। কিন্তু বাহির বিশ্বে পাকিস্তান যে সকলের মুখ হাসিয়েছিল। কেলেঙ্কারি যা। করেছিল তা নিয়ে বাইরের লোকের কানাকানির অন্ত ছিল না। সর্বত্র বদনাম কুড়োতে হচ্ছিল। অতএব সতীত্ব প্রমাণের তাগিদেই তখন কিছু কিছু সাংবাদিককে এ দেশ দেখে যাবার অনুমতি না দিয়ে তার আর উপায় ছিল না। এবং তখন অতি দ্রুত তার কুকীর্তির চিহ্নগুলি মুছে ফেলার জন্য তাকে তৎপর হতে হয়েছিল। অতএব কঙ্কালগুলি সরানো হয়েছিল, বস্তির আধ-পোড়া টিন-কাঠ প্রভৃতি সরিয়ে তার উপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের পাঁয়তারা শুরু হয়েছিল। এবং কামানের গোলায় বিধ্বস্ত বাড়ি ও দেওয়াল মেরামতের হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা পাকিস্তানিরা যত সহজ ভেবেছিল আসলে তত। সহজ ছিল না। অত ধ্বংসস্তূপ কদিনে মানুষ সরাতে পারে। সরাতে গেলে তো সময় আরো বেশি লাগে। অতএব সোজা উপায় — পোড়ানো বস্তির উপর দিয়ে বুলডােজার চালিয়ে পার্ক কিংবা রাস্তা বানিয়ে দাও। তাতে সময় বাঁচানো যাবে, কর্মীও লাগবে কম। কর্মী পাওয়াটা শহরে তখন একটা সমস্যা। গরীব লোকগুলো বেশির ভাগই হয় সংসার ত্যাগ কিংবা শহর ত্যাগ করেছে। এত দ্রুত সকলে শহর ত্যাগ করেছে যে, নিকট আত্মীয়ের মৃতদেহ পর্যন্ত কেউ সরাবার এবং গোর দেওয়ার বা দাহ করার কথা ভাবে নি। জননীও তার কোলের ছেলেকে কাক-শকুনের কাছে সঁপে দিয়ে পালিয়েছে, কিংবা পালাতে গিয়ে বন্দিনী হয়ে ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় পেয়েছে–দেশের জওয়ানদের মনোরঞ্জনের ভার নিতে হবে তাকে। হবে না! জওয়ানরা তোমাদেরকে বাঁচানোর জন্য এসেছে সেই সুদূর পাঞ্জাব মল্লুক থেকে, আর তাদেরকে একটু আমোদ দেবার জন্য তোমাদের মেয়েরা সতীত্বটুকু দিতে পারবে না! এই তোমাদের দেশপ্রেম! দেখছ না, জওয়ানরা তোমাদের জন্য কতো যুদ্ধ করেছে!
