আওয়ামী লীগের ফিরোজ সাহেবের বাড়িটা চেনেন? তার পশ্চিম দিকে আমাদের বাসা।
কোথা থেকে সাবির চৌধুরী শুনেছিল, ফিরোজ সাহেব এবার প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হচ্ছেন। তারপর থেকেই ফিরোজের সঙ্গে দেখা হলে সালাম দেওয়া অভ্যাস করেছিল। এবং সে যে ফিরোজ সাহেবের প্রতিবেশী সে কথা যত্রতত্র বলে বেড়াচ্ছিল। সেই সাবির চৌধুরী গতকাল গিয়েছিল পুরোনো ঢাকায় খাজা সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। সেখান থেকে ফিরে বলে বেড়াচ্ছে, সে নাকি বাসা বদল করবে। আওয়ামী লীগের লোকের পাশে আর থাকবে না।
স্বামীর অনুরূপ স্ত্রী সচরাচর হয় না হয়ত। কিন্তু কখনো তো হয়ও। প্রাচীন সাহিত্যের উপমা অনুসারে হাঁড়ির মতন সরা এযুগেও একেবারে দুর্লভ যে নয়। তারই প্রমাণ সাবির চৌধুরী ও তার স্ত্রী আফরোজা সাবির। দুটি নামই অ্যাফিডেভিট করে পাওয়া। সাবির চৌধুরীর পূর্ব নাম ছিল ছাবের আলি এবং আফরোজা ছিল আফজা। আফজা আই. এ. পাস। প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষয়িত্রী। ছাবের আলি বি. এ. ফেল করে প্রথম দিকে একটা অফিসে কেরানী ছিল। মোনায়েম খান গভর্ণর হলে সহসা ছাবের আলি আবিষ্কার করে যে, মোনায়েম খানের স্ত্রী হচ্ছেন তার মায়ের ফুপাতো বোনের ননদ। মায়ের বোন মানে খালা। ছাবের আলি খালাকে ধরে গভর্ণর হাউসের কৃপা লাভে সমর্থ হয়েছিল। তারপরেই হয়েছিল বি, ডি, মেম্বার এবং ওয়ার্কস প্রােগ্রামের কাজে বিস্তর কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে অঢেল টাকা কামিয়েছিল। সেই টাকার বলেই আজ সে ঢাকা শহরে মাসে অন্ততঃ কয়েক হাজার টাকা উপার্জনক্ষম ব্যবসায়ী। কিন্তু এই উপার্জন কার বদৌলতে। আয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র না খুললে? কোথায় থাকতো সাবির চৌধুরীর ব্যবসা। সে কি সাবির চৌধুরীই হতে পারত? আজো সেই ছাবের আলি হয়ে থাকতে হত। অতএব আয়ুবের পতনে সত্যই যাদের চোখের জল পড়েছিল সেই তাদের একজন ছাবের আলি, ওরফে সাবির চৌধুরী। অতঃপর বড়ো দুর্দিন গেছে সাবিরের। তাকে দুর্দিনই বলে। বহু যত্ন সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের শিবিরে ঢোকার কোনো প্রয়াস তার সফল হয়নি। কিন্তু কোন প্রয়াসই কি পৃথিবীতে একেবারে ব্যর্থ যায়? সহসা এক সময় প্রতিবেশী ফিরোজ সাহেবের কথা মনে হয়েছিল সাবিরের। এবং তার পরেই। আফরোজা সাবির সেদিন বিকেলে একটু বিশেষ রকমের প্রসাধন করে মীনাক্ষীর সঙ্গে আলাপ করতে গিয়েছিল। হাজার হলেও প্রতিবেশী। এতোদিন যে আলাপ-পরিচয়টা হয় নি সেটা দুর্ভাগ্য বৈ কি। আধুনিক নগর জীবনের এই হচ্ছে সব চেয়ে বড়ো অভিশাপ।
মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কটা এখানে তাই বড়ো শিথিল, আমার তো একটুও ভালো লাগে না।
বলেছিল আফরোজা। প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষয়িত্রী এই কথাটি বলবার জন্য অনেক তালিম নিয়েছিল মনে মনে। কিন্তু কাজ হয় নি। মীনাক্ষী অতি সরল মেয়ে। খুব সরল বুদ্ধিতেই তিনি বলেছিলেন–
তা আর কি করবেন বলুন। সবাই এখানে আপন আপন স্বার্থ নিয়ে ঘোরে কিনা তাই নিঃস্বার্থ হৃদয়–সম্পর্কের কারবারটা বড়ো একটা চলে না এখানে। তা ছাড়া হাতে সময়ও থাকে বড়ো কম। এখানে লোকের কতো কাজ।
ওহ, মাগী কি সেয়ান দেখেছ। ঠিকই সন্দেহ করেছে গো। অতএব সেদিন আর আলাপ খুব জমে নি। কেবল লাভের মধ্যে এটুকু হয়েছিল, ফিরোজের দেখাটা শেষ পর্যন্ত মিলেছিল। প্রথমেই গিয়ে যখন সে জেনেছিল যে ফিরোজ বাড়িতে নেই তখন বেশ আফসোস হয়েছিল। এতো যতের সকল সাজগোজ কি ব্যর্থ হবে? শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ যে হয় নি তাতে খুবই খুশি হয়েছিল আফরোজা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরোজ ঘরে ফিরেছিলেন। আফরোজা তখন বুকের আঁচল ঠিক করতে গিয়ে সম্পূর্ণ আঁচলটাকেই দু-হাতে সরিয়ে নিয়েছিল। এবং সাদা ডিমের মতো ফর্সা পেটের ইঞ্চি ছয়েক অনাবৃত অংশে ফিরোজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমন কায়দায় আঁচলটাকে তাড়াতাড়ি ঘাড়ের উপর স্থাপন করেছিল যে সেখানে তা স্থায়ী হয়েছিল কয়েক সেকেও মাত্র। রেশমের শাড়ির আঁচল—একটা আদাব দেবার চেষ্টা করতেই ঘাড়ের উপর থেকে খসে পড়েছিল। ব্লাউজের নামে আফরোজা যেটা পরেছিল সেটাকে ব্রেসিয়ারের একটু চওড়া সংস্করণ বলেই মনে হয়েছিল ফিরোজের। কেবল স্তন দুটি ছাড়া আর সবি দেখা যায়। কিন্তু দেখতে কি ভালো লাগে? প্রাইমারী স্কুলের মাস্টারনী আফরোজাকে ফিরোজের ভালো লাগে নি। তবে একটা লোভ হয়েছিল। রমণীর অনাবৃত দেহাংশ পুরুষ-চিত্তে স্বাভাবিক একটা লোভের সঞ্চার করেছিল। ওটা ভালগালা নয়। ভাল লাগা ও লোভ লাগা কি এক। তবে লোভটাকে ফিরোজ অস্বীকার করেন না। আফরোজার দেহ-সৌন্দর্য ফিরোজ অস্বীকার করেন নি। মধ্যবয়সী, তবুও তনু তোমার/আশ্বিন আলো ছড়ায় আমার মনে। ফিরোজ একটু ভেবে দুছত্র কবিতা স্মরণ করেছিলেন। কিন্তু আফরোজার দেহ ঘিরে আশ্বিন আলোর উৎসবকে ফিরোজ কি সত্যই প্রত্যক্ষ করেছিলেন? তবু দুই চক্ষের প্রশংসা দিয়ে তাকে চেটেছিলেন। আফরোজাকে ঘিরে কোনো কবিতার চরণ স্থানকালপাত্রপোযোগী বলে মনে হয় নি। তবু তার সঙ্গেই হেসে কথা। বলেছিলেন। যদিও মামুলি কথা, তবু তাতেই খুশি হয়ে আফরোজা বাড়ি ফিরেছিল। বিশেষ করে খুশি হয়েছিল ফিরোজের শেষ বিদায় বাক্যটিতে।–
আসবেন আবার। আবার দেখা হবে এই আশায় থাকলাম।
শুনে আফরোজার দেহ ঐ মুহূর্তেই গলে জল হয়ে যেতে চেয়েছিল। বেশি নয়, ফেব্রুয়ারি মাসের কথা সেটা। মাস খানেক মাত্র পার হয়ে পঁচিশে মার্চ পৌঁছতেই ফিরোজের সামনে এখন বেগম আফরোজা সাবির মধ্যযুগীয় কুলবধূ হয়ে উঠেছে। পর-পুরুষের সামনে লজ্জা দেখাতে হয়।
