স্বামীর মানসিক অবস্থা নিয়ে সচেতন হতে গেলে স্ত্রীদের চলে না। আমিনা স্বামীর মন নিয়ে কখনো মাথা ঘামান না। পুরুষের মনকে প্রশ্রয় দিলে তার। আবদারের সীমা বেড়ে যায়। এতো বেড়ে যায় তখন তাকে সামলানো দায় হয়ে। ওঠে। মতটা আমিনার। বিদুষী আমিনা বলেন–দীর্ঘকালে স্ত্রীদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়া স্বামীদের অভ্যাস। সে অভ্যাসটাকে আরো বাড়িতে দিলে মেয়েদের দাসীতু কখনো ঘুচবে না।
অতএব নারীজাতির স্বার্থে আমিনা কখনো স্বামীর মন নামক পদার্থটিকে আমল দিতে শেখেন নি। সেজন্য সংসারের পক্ষে আশঙ্কাজনক কোনো ঝড়ের প্রাদুর্ভাবও লক্ষ্য করা যায় নি। ওটা আমিনার ভাগ্য। ভাগ্যিস তুই গোবেচারা স্বামী পেয়েছিস–মন্তব্যটা আমিনার বাল্যসখি সেলিমার।
ফিরোজ ও মীনাক্ষী বেরিয়ে গেলে স্বামীকে এবার একা পেয়ে আমিনা তার কর্তব্য শুরু করলেন। স্বামীর দিকে দু পা এগিয়ে কোমরে আঁচল জড়িয়ে ঠিক চোখের উপর চোখ রেখে বললেন—
দুঃখটা তুমি একাই পেয়েছ নাকি।
বারো বছরের পুরোনো স্ত্রীকে স্বামীর না চেনার কথা নয়। সুদীপ্ত স্ত্রীর মেজাজ টের পেলেন। স্ত্রী এখন চটেছেন। কিন্তু কি আর করা যাবে। কারো রাগকে আমল দেবেন–এমন অবস্থা এখন সুদীপ্তর কই? হাঁ, কিছু একটা বলে এখন স্ত্রীকে শান্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু কারো প্রয়োজন মেটাতে গেলেও একটা শক্তি লাগে। কোনো শক্তিই সুদীপ্তর ছিল না বোধ হয়। চোখ তুলে স্ত্রীর দিকে তাকানোর কথাও মনে এল না।
হোক তোমার বন্ধু, তা হলেও পরের বাড়ি। এখানে ঐ নাটকটা না করলে
তবু সুদীপ্ত মুখ খুললেন না। স্ত্রী বলে চললেন—
দয়া করে আর বোবা সাজতে হবে না। শোননা এখানেও অবস্থা সুবিধের নয়। যে কোনো সময় ফিরোজ সাহেরের খোঁজে আর্মি আসতে পারে। অতএব যাবে কোথায় এখন ভাবো।
প্রাণপণ প্রয়াসে সুদীপ্ত শুধু বললেন–
আজ এখন আর কোথায় যাই! রাস্তায় যানবাহন নেই।
তা নেই। তুমি এখানে এনে কি বিপদেই ফেললে আমাকে বললাম, চল খালার বাসায় যাই, তুমি শুনলে না।
হাঁ, আমিনা গতকাল এক ফাঁকে বলেছিলেন সে কথা। তেইশ নম্বরে ফিরোজ তখন সুদীপ্তর ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইকবাল হলের দিকে চেয়ে ছিলেন। একটা ঘরে জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল, মশারি টাঙানো আছে। ফিরোজ যেন দেখছিলেন, উতলা বাতাসে জানলা দিয়ে বাইরে উড়ে পালাতে চাইছে মশারিটা! কারফিউ উঠে যাওয়ায় এই অবকাশে ওটা এখন যেন পালিয়ে বাঁচতে চায়। এর মালিককে তারা গুলি করে মেরেছে। ওকে যদি পুড়িয়ে মারে। এখনও যে পোড়ায়নি সেইটেই ভাগ্য! ফিরোজ এইসব ভাবছিলেন। এবং আমিনা নিভৃতে ডেকে স্বামীকে বলছিলেন—
ফিরোজ ভাইকে বলি–আমাদের একটু খালার বাসায় পৌঁছে দিয়ে।
তা বলা যেতে পারে, তবে ফিরোজ নিজেই যখন আগ্রহ করে তার বাসায় নিয়ে যেতে চায়–
বাক্য শেষ করেন নি সুদীপ্ত। তাঁর চিন্তায় ছিল ফিরোজের সেই বিশাল বাড়ি! ওটা প্রায় খালিই পড়ে থাকে। এদের মাত্র স্বামী-স্ত্রীর সংসার। দরকার হলে একাংশ নিয়ে তারা আলাদা সংসার পাততে পারবেন। নীলক্ষেতের যা অবস্থা তাতে অদূর ভবিষ্যতে সেখানে যে তারা ফিরতে পারবেন তেমন সম্ভাবনা কই? অতএব মোটামুটি একটা দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা ফিরোজের বাড়িতে করা যেতে পারে। খালার বাসায় এটা সম্ভব হবে না? ফিরোজের বাড়িতে করা যেতে পারবে। বাসায় যেটা সম্ভব হবে না? ফিরোজের বাসাতেও ব্যাপারটা যে খুব সহজ হবে তা নয়। হয়ত ফিরোজ বলে বসবেন–তা হলে বেরিয়ে যেতে হবে আমার বাড়ি থেকে এবং সুদীপ্ত বললেন–তা হলে তাই যাব। কী আর করা যাবে। বন্ধু বলেই তো আর সিন্দাবাদের নাবিকের মতো তোমার ঘাড়ের উপর বৃদ্ধ সেজে অনন্তকাল বসে থাকতে পারি নে। এইভাবে কথা চলবে কিছুক্ষণ। অগত্যা সুদীপ্ত যখন বেরিয়ে পড়তে উদ্যত হবেন, তখন অগত্যা রাজি হতে হবে ফিরোজকে। মোটামুটি এইসব সুদীপ্ত ভেবে রেখেছিলেন। এবং আমিনাও খালার বাড়ি খুব একটা পছন্দ করেন এমন নয়। খালা একটু দূর। সম্পর্কের। তার মায়ের মামাতো বোন। তা ছাড়া দেখতে হবে, পাঁচ ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে খালার সংসারটি কতো বড়ো। বড়ো মেয়ের না হয় বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু বাকি ছজনের সংসারে তারা গিয়ে যুক্ত হলে ব্যাপারটা খুব সুবিধার হবে না সেটা আমিনাও বোঝেন বৈ কি। অতএব ফিরোজের বাড়ি সম্পর্কে তিনি খুব আর আপত্তি প্রকাশ করেন নি। কিন্তু এখানে এসেই তিনি। ভুলটা টের পেয়েছেন। না, মীনাক্ষী কিছু বলেন নি। এবং ফিরোজ তত বলতেই পারেন না আর বললেও সেটা সুদীপ্তকেই বলবেন। স্ত্রীলোকের সঙ্গে। হাস্য-পরিহাস চলে। কিন্তু যথেষ্ট আশঙ্কাজনক ও সিরিয়াস কোনো বিষয় নিয়ে। আলোচনার পক্ষে ওই জীব একেবারেই অযোগ্য মতটা ফিরোজের। অতএব বলাই বাহুল্য যে, এ বিষয়ে ফিরোজের আমিনার সাথে কোনো কথা হয়নি। কথাটা আমিনার কানে দিয়েছে পাশের বাড়ির প্রতিবেশিনী আফরোজা সাবির। প্রখ্যাত ব্যবসায়ী সাবির চৌধুরীর স্ত্রী। আফরোজা এক ফাঁকে এসে উপকারটি করে গেছে। বলে গেছে–
আপনারা তো ভাই তপ্ত কড়াই থেকে এসে জ্বলন্ত উনুনে পড়লেন। এঁরা। পাড় আওয়ামী লীগার। আর্মির নজর যোল আনা এদের পরে। আমরা পাশে থেকেই ভয়ে ভয়ে আছি।
তা ভয় তাদের এখন হচ্ছে। কিন্তু দুদিন আগেও যেটা ছিল সেটাকে কি বলা যাবে। সেকালের ভাষায় বলা যায় ভক্তি। এই পরিবার সম্পর্কে তাদের একটা ভক্তি বোধ প্রকাশ পেত–সাবির চৌধুরী বা তার স্ত্রী আফরোজা সাবির দুজনেই কাউকে নিজেদের বাড়ির ঠিকানা দেবার সময় বলত–
