নাও, তোমার মেয়েকে সামলাও। ও সেই নীলক্ষেতের বাসায় যাবে।
কথাটা না বললেও চলত। কেননা বেলাই তার আব্বার গলা জড়িয়ে ধরে কানে কানে বলেছে–
বাসায় যাবে না আব্বু।
ও কথা আমরা বিশ্বাস করব না ভাবী, ফিরোজ বললেন, আপনিই নিজের
কথাটি কন্যাকে শিখিয়ে দিয়ে নিয়ে এসেছেন।
অন্য সময় হলে এ কথার উত্তরে আমিনা কি বলতেন? হয়ত বলতেন। ঠিকই তো করেছি। আপনি জানেন না, ছেলেপেলের মা হলে মেয়েরা সন্তানদের দিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে নেয়। চটুলা রমণী আমিনার সাথে ফিরোজ কখনো কথায় পারেন নি। তাই ফিরোজ একদা মোক্ষম প্রশ্ন করেছিলেন–
আচ্ছা, বলতে পারেন ভাবী, সুদীপ্ত মুখচোরাটা আপনার সাথে কথা বলে কি করে?
আপনার মতো ঠোঁটকাটা স্বামীর সাথে আপনার মুখচোরা লজ্জাবতীটি যেভাবে কথা বলেন ঠিক সেইভাবে।
ফিরোজের স্ত্রী স্বভাবতই একটু লাজুক। তদুপরি বন্ধ্যা বলে সব সময়ই মনে বোধ হয় একটি বিষাদকে বহন করেন। তাই কথা বলেন কম। ফিরোজের এটা পছন্দ নয়। কিন্তু সুদীপ্ত ভারী পছন্দ করেন স্বল্পভাষিণী মীনাক্ষী নাজমাকে। মীনাক্ষী নাজমা—ঠিক এই নামটাই আমিনার হওয়া উচিত ছিল। নিদেনপক্ষে মীনাক্ষী আমিনা। তা না, শুধু আমিনা খাতুন। বাপ-মা আর নাম পান নি। কিন্তু মীনাক্ষী নাজমা? অদ্ভুত নাম। কথিত আছে, ফিরোজ নাম শুনেই মেয়েটিকে পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু সে আজ সাত বছর আগের ঘটনা। মাত্র সাত বছর। সে আর কতটুকু! কিন্তু আজ সেই সাত বছর আগের কথা। মনে হলে ফিরোজের কেমন ছেলেমানুষ ছেলেমানুষ ঠেকে। কি আশ্চর্য স্বপ্নময় ছিল সেই দিনগুলো। বিয়ে তিনি একটু বেশি বয়সেই করেছিলেন। বয়স তখন পয়ত্রিশের কাছাকাছি। কিন্তু তখনো তঁার পৃথিবী প্রথম যৌবনের রঙ হারিয়ে ফেলে নি। তারপর সেদিনের পরে গেছে কত শত দিন।
ফিরোজ আজ অবাক হলেন এই দেখে যে, তার ভাবী অর্থাৎ আমিনা খাতুন তার কথার উত্তরে সাড়া দিলেন অত্যন্ত শীতলভাবে—
না ভাই। ওখানে কি আর ফেরা যায় যে সে কথাটি মেয়েকে শেখাতে যাব।
কেমন একটা করুণ সুর বাজল আমিনার কথায়। এবং সহসা ফিরোজ উপলব্ধি করলেন, বড় ভুল করে ফেলেছেন তিনি। সত্যিই তো বড়ো বেদনায় বড়ো অসহায় হয়ে তারা গৃহত্যাগ করেছেন। এখন গৃহে ফেরা নিয়ে কোন রসিকতাও যে আঘাত হয়ে বাজবে। তার মতো লোকের সেই এত বয়সে এতো অসাবধানে কথা বলা উচিত হয় নি। তবে কিছু একটা বলতে তাঁকে হত। কেননা সুদীপ্ত কিছু বলছেন না। মেয়েকে কোলে নিয়ে তার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে নীরব শুধু সোহাগ করছেন। কিন্তু সুদীপ্তর সোহাগে খুব একটা কাজ হল না। কানের কাছে খুব আস্তে আস্তে মেয়ে অনুযোগ করেই চলেছে–
হুঁ—উঁ–উঁ, বাসায় চল আব্দু।
নীরবে মেয়েকে কোলে নিয়ে বাইরে গেলেন সুদীপ্ত। বারান্দা পেরিয়ে বাগানে নামলেন। কয়েকটি গোলাপ ফুটে আছে একটি গাছে। সেদিকে যেতেই মেয়ে হাত বাড়িয়ে দেখাল জবা। সারা গাছ ভরে আছে অজস্র জবা। যেন সদ্যরক্তস্নাত গাছটা মধ্যাহ্নকে ব্যঙ্গ করছে। সুদীপ্ত ঐ গাছের সারা সবুজ অঙ্গে রক্তের ছাপ দেখলেন। আর এগোতে পারলেন না। মেয়েকে আরো নিবিড় করে জড়িয়ে ধরলেন বুকের মধ্যে। কিন্তু মেয়ে হাত বাড়িয়ে দেখাল—
ঐ ফল আব্বু।
তাই তো, ওইগুলি তো ফুলই। তবে দাঁড়িয়ে গেলেন কেন তিনি! তবু এগোতে চেষ্টা করেও এগোতে পারলেন না। পা বাড়াতেই মনে হল–না না, ওরা ফুল হবে কেন বুলেট বিদ্ধ অঙ্গের ক্ষত মনে হচ্ছে না? ঠিক তাই ডঃ ফজলুর রহমানের গায়ে গুলির দাগগুলো কেমন দেখাচ্ছিল? ঠিক এমনি প্রস্ফুটিত জবার মতো না? মেয়েকে বুকে জড়িয়ে আবার ছুটে গিয়ে ঘরে ঢুকলেন তিনি। হাঁ, ছুটেই গিয়েছিলেন। কেমন একটা হন্তদন্ত ভাব। আমিনা তখনো ঘরে ছিলেন, ইতিমধ্যে মীনাক্ষীও এসে জুটেছিলেন। আর ফিরোজ তো ছিলেনই। তিনজনই সুদীপ্তর ছুটে আসা দেখে কেমন ঘাবড়ে গেলেন যেন।
কী হল?
তিন জোড়া দৃষ্টি সুদীপ্তর পানে নিবন্ধ। ফিরোজ লাফিয়ে উঠলেন সোফা ছেড়ে। মহিলা দুজন দাঁড়িয়েই ছিলেন। হয়েছে কী?—প্রতিটি চোখে এই জিজ্ঞাসা। সুদীপ্ত কিন্তু সটান সোফাতে এলিয়ে পড়লেন। বেলা কি তার বাপের চিত্ত বৈকল্যের অংশ পেয়েছিল? সেই যেন অভিভূত হয়ে চুপ মেরে গেছে। নীলক্ষেতের বাসা, লাল জবা—কিছুই আর চাইবার নেই যেন।
তা কী হয়েছে? আর্মি নাকি!
শুধুই একটু মাথা নাড়লেন সুদীপ্ত। জানিয়ে দিলেন—না। আর্মি আসেনি। আর্মি ছাড়া এতে ভয়ের কিছু এখন দেশে আছে নাকি! আমিনা স্বামীর মাথায় হাত রাখলেন, ফিরোজ গিয়ে বসলেন পাশে। কিন্তু সুদীপ্ত তার পার্শ্বদেশে যাদের উপস্থিতি তখন উপলব্ধি করছিলেন তাদের মধ্যে ফিরোজের নাম ছিল না। মীনাক্ষী বা আমিনাও ছিলেন না। ছিল কয়েকটি লাশ। অচেনা লাশগুলির স্পর্শে তার চেনা জগতের জীবনগুলি একে একে লাশ হয়ে যাচ্ছে। এবং সেই মড়কের মধ্যে তিনি বুকে চেপে ধরে বাঁচাতে চাইছেন তার তিন বছরের। কন্যাটিকে। তাই আমিনা যখন কন্যাকে নিজের কোলে নিতে গেলেন তখন বাধা দিলেন সুদীপ্ত। কিন্তু কিভাবে? ওকে বাধা দেওয়া বলে না। এ যেন প্রার্থনা–
না না, আমার মাকে কেড়ে নিও না আমার কোল থেকে।
সুদীপ্তর এই মূর্তি ফিরোজ চিনতেন না। বাইরের কর্মজগতে চেনা বন্ধুদের ঘরোয়া পরিবেশের ছবি তো আমাদের অচেনাই থাকে। হতেই পারে না। এটা বুঝতে ফিরোজের আদৌ অসুবিধা হল না যে, সুদীপ্তর স্বাভাবিক অবস্থা এটা নয়। এই অবস্থায় তাকে একাকী স্ত্রীর কাছে ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে–ফিরোজ ভাবলেন। উঠে জানলার কাছে গেলেন। এবং জানলা দিয়ে। বাইরে কি যেন দেখলেন। তারপর বেরিয়ে গেলেন। ডাকলেন মীনাক্ষীকেও। মীনাক্ষী সুদীপ্তর মুখের উপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন নীরবে।
