দেখবেন স্যার, ওরা এখন ক্ষ্যাপা কুত্তা হয়ে গেছে। এখন ওরা ঘরে ঢুকে আমাদের মারবে। তা ঘরের মধ্যে মরার চেয়ে এখানে দাঁড়িয়ে দু-একটাকে মেরে মরা ভালো।
ঘরে ঘরে ঢুকে আমাদের মারবে। কথাটা একেবারেই অবিশ্বাস্য। কিন্তু। মনে তবু খটকা লাগল কেন?
অবশ্য ফিরোজের মনে অন্য ধরনের একটা সন্দেহ ছিল। আলোচনার প্রথম দিকেই ইয়াহিয়া যে সামরিক শাসন তুলে নেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেটা কি বিশ্বাসযোগ্য ছিল? হায় হায়, মানুষ এতো ভণ্ডও হয়! দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে তুমি যখন বললে, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে তোমার আগ্রহের জুড়ি নেই তখন আওয়ামী লীগ সে কথা অকপটভাবেই বিশ্বাস করেছিল। তারপর? যে সন্ধ্যায় তোমার জনগণের কাছে ভাষণ দেবার কথা সেই সন্ধ্যায় তুমি লেলিয়ে দিলে সেনাবাহিনী। না, সে জন্য আমরা অবাক হই নি। পুরোপুরি বিশ্বাস তোমাকে আমরা কোনো সময়ই করি নি। সন্দেহ একটা মনে মনে ছিলই। কিন্তু যে সন্দেহটা কোনো সময়ই মনে ছিল না এখন যে সেইটেই দেখা দিল। ওরা ঘরে ঘরে ঢুকে আমাদের মারবে। সত্যি নাকি। বিশ্বাস করেও বিশ্বাস করলেন না ফিরোজ। তিনি বাসায় ফিরে এলেন।
বাসায় ফিরেই ফোন ধরলেন। ডায়াল ঘুরিয়ে ঈপ্সিত কষ্ট পাওয়া যেতেই বললেন
হ্যালো, সব শুনেছেন তো? ……….
কিছু ভেবে পাচ্ছি নে কি করব। আপনি কিছু দিক-নির্দেশ করতে পারেন?
বঙ্গবন্ধু ঠিকই বলেছেন। তিনি এখন সরে পড়লে তার খোঁজে সারা ঢাকা। শহর খবিশরা তছনছ করে ছাড়বে।
তা ঠিক। আমাদের দুর্গতি যতোই হোক, সবের বিনিময়ে এখন বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করা কর্তব্য। আপনারা তাঁকে শীঘ্র সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করুন।—-
না তাঁর কথা শোনা হবে না। ওই বর্বরদের হাতে পড়লে এবার তাকে। বাঁচানো দায় হবে।
পাকিস্তানি জালেমদের হাতে এবার বঙ্গবন্ধুকে পড়তে দেওয়া হবে না। কিছুতেই। মনে মনে কিছুক্ষণ ছটফট করলেন ফিরোজ। না, মুজিব ভাই বোধ হয় কথা শুনবেন না। ঐ কথাটা একবার যদি তার মাথায় ঢুকে থাকে যে, তাকে না পেলে ওরা সাধারণ নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করবে তা হলে তাকে নড়ানোর সাধ্য কারো হবে না। কিন্তু তার বেঁচে থাকা যে দরকার। আমরা না হয় কিছু মরলাম, কিন্তু তিনি যদি বাঁচেন …। আল্লাহ, তিনি যেন নিরাপদে পালিয়ে বাঁচেন–সেই রাতে এই প্রার্থনা শুধুই ফিরোজের ছিল না, বঙ্গবাসী প্রায় সকলেই কেউ জ্ঞাতসারে কেউ বা নিজের জ্ঞাতেই শেখ মুজিবের নিরাপত্তা কামনা করেছেন। শেখ মুজিবুর রহমান–শুধুই একটি নাম তো। নয়, তা যে বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক। এবং আনন্দময় জীবনেরও।
আর আটাশে মার্চের মধ্যাহ্নে বন্ধু সুদীপ্ত শাহিনের মুখোমুখি বসে ঐ। রাতের কথা ফিরোজ স্মরণ করলেন। তার আশঙ্কাই সত্য হয়েছে। মুজিব ভাই কারো কথা শুনেন নি। ঢাকা ছেড়ে যেতে রাজি হন নি। ধরা দিয়েছেন। আমার দেশের মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে আমি নিরাপত্তার সন্ধানে বেরুব। অসম্ভব। এমন মানসিকতা বহন করতে পারেন একমাত্র বোধহয় ঐ লোকটিই। অন্ততঃ পাকিস্তানে আর-কেউ তা পারেন নি। জিন্না–লিয়াকত আলি ভারতীয় মুসলমানদের সমর্থনে পাকিস্তান আদায় করে তাদেরকে কি ভাবে কলা। দেখিয়েছিলেন সে কথা তৎকালিন কলকাতার অধিবাসী ফিরোজদের তো জানা আছে ভালোভাবেই। তাদের পিছে পিছে ভারতের পুচকে মুসলিম লীগ নেতারা এক দীর্ঘ লাফে কেউ করাচী, কেউ লাহোর কেউ ঢাকায় পাড়ি জমিয়ে। দেশপ্রেমের যে নমুনা দেখিয়েছিল তা দেখবার মতো বৈ কি!
বেটার, তাদের ভোটের দরকার ছিল, ভোট নিয়ে পাকিস্তান বানিয়েছি। এখন চললাম সে পাকিস্তানকে ভোগ করতে।
নেতাদের পেছনে পেছনে ভারতের চার-পাঁচ কোটি মুসলমান সকলেই যদি তখন বন্যার জলের মতো এসে পাকিস্তানে ঢুকত, তা হলে? সেই বন্যায় পাকিস্তানের অস্তিত্ব তলিয়ে যেত না! ভারতীয় মুসলমানরা সব আহাম্মক। আর হিন্দুরাও গবেট। মুসলমানগুলোকে সব পাকিস্তানের দিকে খেদিয়ে দিলে কেমন করে জিন্নার কায়েদেআজমগিরি বজায় থাকত একবার দেখতাম।….নানা চিন্তায় ফিরোজকে বড়ই অস্বাভাবিক দেখাচ্ছিল। ….শেষ পর্যন্ত সেই যুবকের কথাই সত্য হল।
দেখবেন স্যার ওরা এখন খ্যাপা কুত্তা হয়ে গেছে। এখন ওরা ঘরে ঘরে ঢুকে আমাদের মারবে।
সত্যিই ওরা ঘরে ঘরে ঢুকে বাঙালিকে মেরেছে। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা কি এতটা ভাবতে পেরেছিলেন? পারেন নি। অবশ্যই কোনো ভদ্রলোকের পক্ষে এতোখানি নারকীয় কাণ্ড কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু সেই যুবকটির কল্পনা তো ঠিকই এগিয়েছিল। আজ সে যুবকের পরিণতি? সুন্দর করে টেরি বাগিয়ে ড্রেনপাইপ ফুলপ্যান্ট পরে সস্তা দামের সিগারেট ফুকতে ফুকতে পথে হাঁটত যখন! একটুও দেখতে ভালো লাগতো না। কিন্তু আজ?
ওরা আমাদের মারতে আসছে স্যার। ঘরের মধ্যে মরার চেয়ে এইখানে দাঁড়িয়ে দু-একটাকে মেরে মরা ভাল।
আহা, তোমার কথাই সত্য হোক ভাই যদি মরে গিয়েই থাক, তবে তার আগে দু-চারটে শত্রুসেনা তোমার গুলিতে যেন অক্কা পেয়ে থাকে। আহ্ অমনি বখাটে ছেলে যদি বাংলা মায়ের আরো অনেক থাকতো। হাঁ, আরো অনেক। কেন? ভালো ছেলেরা সবাই সেদিন মায়ের আঁচলে লুকিয়েছিল নাকি! বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ভালো ছেলে প্রাণ দিয়েছে না। না না, কথা ভালো-মন্দ নয়। দেশকে ভালোবাসা নিয়ে কথা। বখাটে ছেলেরা তাদের মাকে ভালো বাসে না? এবং সব ভালো ছেলেই কি কাপুরুষ হয়? এখন তো ভালো-মন্দ বিচারের সময়। নয়। এখন চাই মাতৃভক্ত ছেলে। আর সাহসী।
১৩. সুদীপ্তর মধ্য থেকে শুধুই সাহস
কিন্তু সুদীপ্তর মধ্য থেকে শুধুই সাহস নয়, প্রাণও যেন বিলুপ্ত হয়েছে। প্রাচীন। মিসরের মমির মতো একজন ফ্যাকাসে সুদীপ্ত ফিরোজের সামনে সোফার উপর। নিশ্চলভাবে পড়ে রইলেন। সুদীপ্তর স্ত্রী ঘরে এলেন। হাতের আঙুল ধরে পায়ে পায়ে এল তিন বছরের শিশু কন্যা বেলা। আব্বাকে দেখেই বেলা এবার মায়ের আশ্রয় ছেড়ে বাপের কোলে গিয়ে চড়ে বসল। এই বেলার কাছেই সুদীপ্ত পরাজয় স্বীকার করেছেন। এলা কিংবা অনন্ত কখনো তাদের আব্বার কাছে এতো প্রশ্রয় পায় নি। এলা তার বড় ভাই অনন্তর চেয়ে মাত্র দেড় বছরের ছোট। এবং এলার পাঁচ বছর পর বেলা। সুদীপ্তর বারো বছরের বিবাহিত জীবনে সন্তান এই তিনটিই। স্ত্রী আমিনা বললেন—
