মামা। তুমি শুয়ে থাকে। আমি খাবার তৈরি করি। রুটি খাবে তো?
হ্যাঁ। আরেকটু বাস। ঝড় কমুক।
ঝড় কোথায় দেখলে তুমি! বাতাস দিচ্ছে। তুমি শুয়ে থােক। কয়েকটা রুটি বানিয়ে চলে আসব। বেশিক্ষণ লাগবে না। তুমি খানিকক্ষণ থাকতে পারবে অন্ধকারে? হারিকেনটা নিয়ে যাই।
রুটি বানাতে মুনার অনেকক্ষণ লাগল। চুলায় কি একটা হয়েছে। বারাবার নিভে যাচ্ছে। রান্নাঘরের জানালার কবাট একটা ভাঙা। বাতাসের ঝাপটায় হারিকেন নিভে যাচ্ছে। যন্ত্রণার এক শেষ।
মুনা রুটি বানিয়ে মামার ঘরে এসে দাঁড়াল। হালকা গলায় ডাকল, মামা ঘুমিয়ে পড়েছ?
মামা জবাব দিল না। দ্বিতীয়বার মামাকে ডাকতে গিয়ে তার গলা কেপৌ গেল। কেউ তাকে বলে দেয়নি। কিন্তু সে জানে মামা আর কোনো প্রশ্নের জবাব দেবেন না। মুনা খুব সাবধানে হরিকেনটি মেঝেতে নামিয়ে রাখল। সে বুঝতে পারছে না। এখন কি করবে। চিৎকার করে কাদবো? ছুটে যাবে রাস্তায়? কিন্তু কোনটিই করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। সে বারান্দায় বেরিয়ে এল। বৃষ্টির ছাঁট এসে গায়ে লাগছে। ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তার আলোয় চারদিক ঝলমল করে উঠছে। আবার সব ঢেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। বৃষ্টির শব্দ, বাতাসের শব্দ, বজপাতের শব্দ তবুও কী অসম্ভব নীরবতা চারদিকে।
ছোটবেলায় মুনা যখন একলা হয়ে পড়েছিল তখন তার এই মামা তাকে নিয়ে এসেছিলেন নিজের কাছে। ঝড়-বৃষ্টির রাতে তার বড় ভয় লাগত। মামা তাকে উঠিয়ে নিয়ে যেতেন নিজের বিছানায়। ফিসফিস করে বলতেন, ভয় কি রে পাগলী, আমাকে শক্ত করে ধরে থােক। মুনা তাকে শক্ত করে ধরে থাকত। তবু ভয় কাটত না। মুনা বারান্দায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এক সময় তার পা ভার হয়ে এল। সে বাচ্চা মেয়েদের মত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল মেঝেতে। ফিসফিস করে সম্ভবত নিজেকে শোনাবার জন্যেই বলল, তোমাকে কতটা ভালবাসি। এই কথা কি মামা আমি কোনোদিন তোমাকে বলেছি?
চার মাস হাজতবাসের পর
চার মাস হাজতবাসের পর হঠাৎ বিনা নোটিশে বাকের ছাড়া পেয়ে গেল। দুপুর বেলা রুটি আর ডাল খেয়ে সবে বিড়ি ধরিয়েছে–ডিউটির একজন সেপাইকে ডেকে নরম স্বরে বলেছে, ভাইজান একটা পান এনে দেন। রিকোয়েস্ট। বমি বমি লাগছে। ঠিক তখন ঘটনোটা ঘটল। জমাদার হাজাতের দরজা খুলে বলল, ওসি সাহেব ডাকে।
বাকেরের খুব ইচ্ছে হল বলে, তোমার ওসিকে এখানে আসতে বল। বলেই ফেলত শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলাল। সময় খারাপ। মারধর করবে। রুল দিয়ে আচমকা পেটে এমন গোতা মারে যে চোখ অন্ধকার হয়ে যায়। গত শুক্রবারে একজন পেটে গোতা খেয়ে রক্ত পেচ্ছাব করতে লাগল। হাসপাতালে নিয়ে যাবার নাম করে বের করে নিয়েছে। হাসপাতালে নিশ্চয়ই নেয়নি। রাস্তায় নিয়ে ফেলে দিয়ে এসেছে। এর নাম পুলিশ। এদের যত কম ঘটানো যায় ততই ভাল।
ওসি সাহেব বাকেরকে দেখে হাই তুললেন। বিকট হাই। বাকের বিনীত ভঙ্গিতে বলল, কী জন্যে ডেকেছেন স্যার?
বসুন। বাকের চমকে উঠল এতদিন এই লোক তুমি তুমি করেছে। আজ আপনি বলছে। কেউ কলকাঠি নেড়েছে কি না কে জানে। তুমি-আপনির এই ব্যাপারটা বেশ ভাল। অনেক কিছু বোঝা যায়। বাকের বসিল।
খাওয়া-দাওয়া হয়েছে?
জি স্যার।
বাড়ি যেতে চান?
যেতে দিলে যাব।
তাহলে কাগজ-কলম নিন। মুচলেকা দিতে হবে। লিখুন রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত থাকব না। আইন-শৃঙ্খলা মানিয়া চলিব। লিখে সই করুন। এই নিন কলম।
বাকের হাসিমুখে বলল, রাষ্ট্র বানান কি স্যার?
যা মনে আসে লিখে ফেলেন। বুঝতে পারলেই হল আর আসল কথাটা মন দিয়ে শুনুন। এখন থেকে প্রতি মঙ্গলবারে একবার হাজিরা দিতে হবে। পারবেন তো?
জি পারব।
ঐটাও লিখুন–প্রতি মঙ্গলবার একবার থানায় হাজিরা দিব। থানার নাম লিখুন।
ওসি সাহেব। আবার একটা বিকট হাই তুললেন। বাকের ওসি সাহেবের পাশে বসা সেকেন্ড অফিসারকে বলল, স্যার রাষ্ট্র বানানটা কি হবে একটু কাইন্ডলি বলবেন?
চৈত্র মাসের ঝাঝা রোদে বাকের রাজকীয় চালে হাঁটছে। দুটিাকা পঁচিশ পয়সা দিয়ে সে একটা বেনসন কিনেছে। হাজতে যাবার আগে দেড় টাকায় পাওয়া যেত।–চার মাসে এতটা দাম বেড়েছে দেশটার হচ্ছে কি? দেশের চিন্তা তাকে খুব বেশি বিচলিত করল না। তার বড় ভাল লাগছে। চৈত্র মাসের তপ্ত হওয়াও বড়ই মধুর মনে হচ্ছে। পকেটে পঁচিশ টাকার মতো আছে। এখন আর অতি সাবধানে এই টাকা খরচ করতে হবে না। ব্যবস্থা একটা হবেই।
মীরপুর রোডে উঠে সে রিকশা নিল। হুঁড় ফেলল না। মাথার উপরের কড়া রোদ ও ভাল লাগছে। চমৎকার দিন। আকাশ ঘন নীল। দৃষ্টি পিছলে যায়। তবু তাকিয়ে থাকতে ভাল লাগে। বাকের হালকা গলায় রিকশাওয়ালাকে বলল, রিকশা কোন জায়গার?
রিকশাওয়ালার সঙ্গে কথা শুরু করার জন্যে এটা হচ্ছে সবচে ভাল ডায়ালগ। সব রিকশাওয়ালাই এই প্রশ্নের জবাব খুব আগ্রহ করে দেয়। আজকের এই রিকশাওয়ালা জবাব দিল না। বাকের দ্বিতীয়বার বলল, রিকশা কোন জায়গার ভাই? রিকশাওয়ালা তিক্ত গলায় বলল, হেইটা দিয়া আপনের কী দরকার?
অন্য সময় হলে চট করে বাকেরের মাথায় রক্ত উঠে যেত। আজ সে রকম হল না। বরং রোগা আধাবুড়ো রিকশাওয়ালার জন্যে সে মমতা বোধ করল। কেমন টপটপ করে ঘামছে। ন্যায্য ভাড়ার উপরেও ব্যাটাকে দুটাকা বিকশিস ধরে দিতে হবে। ভাগ্যিস সে রিকশাওয়ালা হয়ে জন্মায়নি। প্যাসেঞ্জার নিয়ে এই দুপুরে রোদে বেরুতে হলে সর্বনাশ হয়ে যেত। বাকের দরাজ গলায় বলল, আস্তে চালাও ভাই। তাড়াহুড়ার কিছু নাই। সিগ্রেট খাবে?
