শওকত সাহেব শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেললেন।
উকিল সাহেব আজ উদ্ভূত একটা পোশাক পরে এসেছেন। জিনিসটা পাঞ্জাবির মত। কিন্তু শার্টের কলারের মত কলার আছে। ভদ্রলোককে দেখাচ্ছে সার্কাসের ক্লাউনের মতো! মুনাকে দেখেই তিনি বললেন–হবে না।
মুনা বলল, কী হবে না?
এফআইআর দেখলাম। এই মামলায় লাভ নেই।
আপনার কথা বুঝতে পারছি না।
কথা তো বাংলাতেই বলছি, বোঝেন না কেন? পুলিশের সাজানো মামলা। কনভিকসন হয়ে যাবে। উকিল-মোক্তার কিছু করতে পাববে না।
মুনা তাকিয়ে রইল। উকিল সাহেব মুখখানা অনেকখানি সরু করে টেনে বললেন, ধরন-ধারণ দেখে মনে হয়। পলিটিক্যাল কেইস। কাউকে দীর্ঘ সময়ের জন্যে আড়ালে সারিয়ে রাখতে হলে এইসব মামলা করা হয়। পুলিশ যদি নিজেরাই কিছু অস্ত্রশস্ত্র জমা দিয়ে বলে এইসব পাওযা গেছে তাহলে কি করার আছে বলুন। এটা কোর্টে প্রমাণ করা মুশকিল যে, অস্ত্রশস্ত্র পাওয়া যায়নি। তাছাড়া আমার ধারণা এই ছেলেটির আগের রেকর্ডও ভাল না। ঠিক না?
জি ঠিক।
আপনার যা করা উচিত তা হচ্ছে বড় কোন নেতা-ফেতার কাছে যাওয়া। আছে তেমন কেউ?
জি না।
খুঁজে বের করুন। বাংলাদেশ ছোট জায়গা। খুঁজলেই কাউকে পাবেন যার আপনি দুলাভাই কিংবা ভায়রা ভাই হচ্ছেন কোনো তালেবর ব্যক্তি। তার মাধ্যমে কাজ করুন। আইন? আইনের হাত বেঁধে ফেলা হচ্ছে। অন্তত চেষ্টা চলছে। বুঝবেন। নিজেই বুঝবেন। হা হা হা! উঠলেন নাকি?
জি উঠছি।
মামলাটা আমি নিচ্ছি না।–কিছু মনে করবেন না। প্রথম দিন যে টাকা দিয়েছিলেন সেটি ফেরত দেয়া উচিত কিন্তু দিচ্ছি না। কারণ আমি কিছু উপদেশ দিয়েছি। প্রফেশনাল এডভাইস। ওর একটা চার্জ আছে। আচ্ছা বিদায়।
বাকেরের চেহারায় আজ বিরাট পরিবর্তন
বাকেরের চেহারায় আজ বিরাট পরিবর্তন। মাথার চুল কামিয়ে ফেলেছে। চকচক করছে মাথা। বাকের হাসিমুখে বলল, উকুনের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে এই কাণ্ড করেছি। খবু খারাপ লাগছে?
মুনা কিছু বলল না। এই জায়গায় ভাল লাগা খারাপ লাগার কোনো ব্যাপার নেই।
শোন মুনা, সুন্দর দেখে একটা ছেলের নাম দাও তো।
কেন?
ইয়াদ এসেছিল। ওর একটা ছেলে হয়েছে। আমার কাছে নাম চায়।
মুনা বিরক্ত হয়ে বলল প্রথম ছেলে হলে ছেলের বাবার সঙ্গে যার দেখা হয় তার কাছেই নাম চায়। ওটা কোন ব্যাপার না। আপনার কি ধারণা। আপনি নাম দিলেই উনি সেই নাম রাখবেন?
বাকের চুপ করে গেল।
আজ যাই।
এখনই যাবে?
থেকে করবটা কী?
তাও তো ঠিক। আচ্ছা মুনা ঐ মেয়েগুলি আছে কেমন?
কোন মেয়েগুলি?
ঐ যে তিনটা মেয়ে?
কি আশ্চর্য। আমার কি ওদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে নাকি যে বলব কেমন আছে।
তাও তো ঠিক।
আপনার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। উনি চেষ্টা-চরিত্র করবেন। ধৈর্য ধরে থাকুন।
বাকের কিছু বলল না। নিজের চুলশূন্য মাথায় হাত বুলাতে লাগল।
টাকা-পয়সা কিছু লাগবে?
না। মুনা চলে আসবার সময় বাকের বলল, চুলগুলি ফেলে দেওয়ায় একটা অসুবিধা হয়েছে।
আগে একটা টাকা দিলেই মাথা বানিয়ে দিত। খুবই আরামের ব্যাপার। এখন চুল না থাকায় কোনো আরাম পাই না।
শ্রাবণ মাসের গোড়াতে
শ্রাবণ মাসের গোড়াতে শওকত সাহেবের শরীর খুব খারাপ করল। তিনি প্ৰায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। কাজের মেয়েটিও নেই। খুব ঝামেলা। মুনা অফিসে চলে গেলে সামান্য এক গ্লাস পানিও নিজেকে গড়িয়ে খেতে হয়। তাতেও কষ্ট হয়। এক সন্ধ্যায়। তার অসুখ বেশ বাড়ল। প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা, সেই সঙ্গে গা কাঁপিয়ে জ্বর। বাইরে ঘোর বর্ষ। বৃষ্টিতে পৃথিবী ভেসে যাচ্ছে। সন্ধ্যা থেকেই ইলেকট্রিসিটি নেই। মুনা হারিকেন জ্বালিয়ে মামার ঘরে নিয়ে গেল। তিনি বললেন, কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে। তুই এখানে খানিকক্ষণ বসে থাক।
মুনা বসল। শওকত সাহেব এলোমেলা ভাবে দু’একটা কথাটথা বলতে চেষ্টা করলেন। সবই বকুলকে নিয়ে। গত মাসে বকুল এসেছিল। খবর না দিয়ে আসা। জহিরের মামাতো ভাইয়ের বিয়ে নারায়ণগঞ্জে সেখানে যাবার পথে ঘণ্টা তিনেকের জন্যে এ বাড়িতে থাকা। মুনা সে সময়টা বাসায় ছিল না। শওকত সাহেব বকুলের গল্প পঞ্চাশবার করেছেন। প্রতিবারেই নতুন নতুন কিছু তথ্য যোগ হয়েছে। মুনার কেমন সন্দেহ হয় বেশির ভাগই বোধ হয় বানানো। আজও সেই গল্পই শুরু হল।
মেয়েটা সুন্দর হয়েছে খুব, বুঝলি মা খুব সুন্দর।
সুন্দর হবারই তো কথা। বিয়ের পর মেয়েরা সুন্দরী হয়। এটাই নিয়ম।
সবাই হয় না। যারা সুখী হয় তারাই হয়। মেয়েটা সুখী হয়েছে। আর হবে না কেন বল ছেলেটা তো ভাল। ভাল না?
হ্যাঁ হয়।
এসেই পা ছুঁয়ে সালাম করল।
কী যে তুমি বল মামা! তোমার জামাই আর তোমাকে পা ছুঁয়ে সালাম করবে?
না মানে সবাই তো করে না। আজকালকার ছেলে। জহির বিদেশ যাচ্ছে বুঝলি।
কবে যাচ্ছে?
এখনো ঠিক হয়নি। চেষ্টা চলছে। তার এক চাচা থাকেন ইংল্যান্ডে। তিনিই ব্যবস্থা করছেন।
ভাল।
একবার গেলে বকুলকেও নিয়ে যাবে তাই না?
নেওয়াই তো উচিত।
দেশ বিদেশ দেখা হবে মেয়েটার ভাগ্যের ব্যাপার তাই না?
তাতো বটেই। আচ্ছা মামা আমার কথা বকুল কিছু জানতে চায়নি, তাই না?
শওকত সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন। খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, জানতে চাইবে না। কেন? চেয়েছে। অনেক কথা জিজ্ঞেস করেছে।
কি জিজ্ঞেস করেছে?
তিনি সে সব কিছু বলতে পারলেন না। মুনা মৃদু হাসল। বকুল কিছুই জানতে চায়নি। কিন্তু কোন চাইবে না?
