একটি কাজের লোক মুনাকে বসতে বলে ভেতরে চলে গেল। তারপর আর কারোরই কোন খোঁজ নেই। বাড়ি নিঃশব্দ। ইংরেজিতে এই ধরনের পরিবেশকেই বোধ হয়। পিন ড্রপ সাইলেন্স বলা হয়। মনে হচ্ছে শুধু এই বাড়ি নয় আশপাশের কয়েকটি বাড়িতেও লোকজন নেই।
সুন্দর করে সাজানো বসার ঘর। পর্দা টেনে রাখার জন্যে আধো আলো আধো আঁধার। তবু এর মধ্যেই বোঝা যাচ্ছে এ ঘরে একবিন্দু ধুলো নেই। রোজ দুবেল কিংবা কে জানে হয়ত তিন বেলা এই ঘর ঝাড়পোচ করা হয়। অডিকেলনের গন্ধের মতো মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে নাকে। গন্ধটাও ঘরের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। যেন এটা না থাকলেই মানাত না। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর কাজের লোকটি আবার ঢুকল। তার হাতে চমৎকার একটি ট্রে। ট্রেতে এক কাপ চা অন্য একটি প্লেটে কিছু বিসকিট। রুটিন কাজ। যারা এখানে আসে তাদের সবার জন্যেই বোধ হয় এই ব্যবস্থা। মুনা বলল। উনার কি দেরি হবে? আমার অফিস আছে।
কাজের লোকটি বলল, আসতেছেন। তারপরও আধঘণ্টার মত বসে থাকতে হল।
মানুষকে বসিয়ে রাখার মধ্যে এরা কি কোনো আনন্দ পায়?
হাসান সাহেব ঘরে ঢুকলেন অফিসের পোশাক পরে। ঢুকেই ঘড়ি দেখলেন, এর মানে সময় বেশি দেওয়া যাবে না।
আপনি কি আমার কাছে এসেছেন?
জি।
আপনার সঙ্গে কি আমার পরিচয় আছে?
জি না। তবে আমরা এক পাড়ায় থাকতাম।
ও আচ্ছা। কি ব্যাপার বলুন?
আমি এসেছি আপনার ভাইয়ের ব্যাপারে।
বাকের? নতুন কোনো ঝামেলা বঁধিয়েছে নাকি?
জি না।
হাসান সাহেবের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হল। তিনি দ্বিতীয়বার ঘড়ি দেখলেন। কিন্তু বসলেন। ভঙ্গি থেকে মনে হচ্ছে তিনি সমস্ত ব্যাপার মন দিয়ে শুনবেন।
বলুন কি বলবেন?
বাকের ভাই অনেক’দিন ধরে হাজতে পড়ে আছে। কেউ বোধ হয় কিছু করছে না। দেখতে-টেখতেও যাচ্ছে না।
বাকেরের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা ঠিক বুঝতে পারছি না।
সম্পর্ক কিছু নেই। এক পাড়ায় থাকতাম। অনেক সময় আমাদের অনেক উপকার করেছেন।
ও তো গুণ্ডামি করে জানতাম। উপকার ও করে নাকি?
মানুষের চরিত্রের অনেকগুলি দিক থাকে।
তা থাকে। এ ম্যান হ্যাঁজ মেনি ফেসেস। ভালই বলেছেন। বাকেরের ব্যাপারটায় আমি ইচ্ছা! করেই নীরব আছি। এর কারণ আছে। আমার মনে হয় আপনাকে বুঝিয়ে বললে বুঝবেন। আমি মনে প্ৰাণে চাচ্ছি। যাতে ওর একটা শিক্ষা হয়। হাজতে ঢোকা মাত্র বের করে আনলে ঐ শিক্ষাটা হবে না।
আপনি চাচ্ছেন বিচার-টিচার হবার পর বাকের ভাই বেশ কিছু দিনের জন্যে জেলে চলে যাক।
হাসান সাহেব ঘড়ি দেখলেন। কিন্তু তার মধ্যে কোন চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেল না। তিনি সিগারেট বের করলেন এবং কাজের লোকটিকে চা দিতে বললেন। মুনা সহজ স্বরে বলল, আপনি বোধ হয় জানেন না এটা সাজানো মামলা। বাকের ভাইয়ের কাছে অস্ত্রশস্ত্র কিছুই ছিল না।
আপনি কি করে জানেন?
বাকের ভাইয়ের অনেক দোষ আছে কিন্তু সে মিথ্যা কথা বলে না।
হাসান সাহাবে হেসে ফেললেন। মুনা লক্ষ্য করল হাসিটি খুব সুন্দর। সহজ স্বাভাবিক।
আপনার নাম কি?
মুনা।
আমি কি আপনাকে তুমি করে বলতে পারি? বয়সে আমি অনেক বড়।
নিশ্চয় তুমি করে বলবেন।
আমি এখন অফিসে যাব। গাড়ি এসে গেছে বোধ হয়। হর্ন দিচ্ছে। তুমি কোথায় যাবে বল
তোমাকে নামিয়ে দেব।
আমাকে নামিয়ে দিতে হবে না। আমি রিকশা নিয়ে চলে যাব।
রিকশা নিয়ে চলে যাবার কোন দরকার নেই, এস, তুমি। আর শোন, আমি একজন এডভোকেটের সঙ্গে কথা বলছি। ও বাকেরের ব্যাপারটা দেখছে। তুমি হয়ত ভাবিছ আমি ভাই হিসেবে কোন দায়িত্ব পালন করছি না। এটা ঠিক না। দেখছি। আড়াল থেকে দেখছি। তাছাড়া…
তাছাড়া কি?
আফিসে আমার নিজের একটা সমস্যা যাচ্ছে। আমার পায়ের নিচে মাটি নেই। অনেক গল্প। তুমি আরেক’দিন এস, তোমাকে বলব।
হাসান সাহেব মুনাকে শুধু যে অফিসে নামিয়ে দিলেন তাই নয় নিজে গাড়ি থেকে নামলেন। মুনা কোথায় বসে তা দেখলেন। মুনা যখন বলল, এক কাপ চা খাবেন? তিনি বললেন–মন্দ কি।
চা খাওয়া যেতে পারে।
শওকত সাহেবের জ্বর
তিনদিন ধরে শওকত সাহেবের জ্বর।
খুব বেশি নয় একশ, একশ এক। তরু বয়সের কারণেই তিনি বেশ কাহিল হয়ে পড়লেন। শারীরিক অসুবিধা ছাড়াও কিছু কিছু মানসিক অসুবিধাও দেখা গেল। পর পর দু’দিন মুনাকে বললেন লতিফাকে তিনি পর্দার ফাঁকি থেকে উঁকি দিতে দেখছেন। মুনা কিছুই বলেনি। ঠোঁট বাকিয়েছে যা থেকে মনে হয় সে বিরক্ত। অথচ এর মধ্যে বিরক্ত হবার কী আছে। তার কথা সে বিশ্বাস না করতে পারে সেটা ভিন্ন কথা কিন্তু বিরক্ত হবে কেন? আগে তো শুনবে তিনি কী বলতে চান তাও শুনেনি। ঠোট বাকিয়ে ঘরের কাজ করতে গেছে। অথচ লতিফাকে তিনি দেখেছেন। নিশি রাতে ঘুম ভেঙে দেখা। তিনি শুয়ে ছিলেন। জানালা দিয়ে রোদ আসছিল বলে জানালা বন্ধ করে দিতেই ঘর খানিকটা অন্ধকার হয়ে গেল! ঠিক তখন ঘরের পর্দা নড়ে উঠল। শুধু শুধু পর্দা নড়বে কেন? তিনি তাকালেন এবং দেখলেন পর্দার নিচে স্যান্ডেল পরা রোগা রোগ দু’টি পা। লতিফার পা। তিনি ডাকলেন–কে লতিফ! লতিফা! পৰ্দা আবার নড়ে উঠল। তিনি বিছানায় উঠে বসতেই পা সরে গেল। ঘর থেকে বেরিয়ে কাউকে দেখলেন না। মুনা অফিসে। ঘর খালি। একটি প্রাণীও নেই। শুধু রান্নাঘরে ইঁদুর খুটাখুটি করছে।
অথচ সেই কথাটি মুনা শুনতেই চাইল না। বিরক্তি দেখিয়ে চলে গেল। সেদিনকার পুচকে মেয়ে অথচ ভাবটা এ রকম যেন পৃথিবীর সব রহস্য তার জানা। মুনার ওপর তিনি গত ক’দিন ধরে বেশ বিরক্ত। সে স্পষ্টতই তাকে অবহেলা করছে। তিন দিন ধরে তার জ্বর যাচ্ছে এই নিয়েও তার কোনো মাথা ব্যথা নেই। একবার বলল না, ডাক্তার দেখাও। কিংবা নিজে গিয়ে কোনো ওষুধবিষুধ আনল না।
