মামুন বলল, আপনি একটু বসুন। দেখি আমি চায়ের ব্যবস্থা করি। এই পাঁচ মিনিট।
জাহানারা বসে রইল। মামুন প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল। চা তাকেই বানাতে হবে। কাজের যে মেয়েটি আছে সে ভাত-তরকারি ছাড়া অন্য কিছু রাঁধতে পারে না।
জাহানারা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, আমার খুব একটা ভাল খবর আছে।
কী খবর?
দেখি আন্দাজ করুন তো?
মেয়েটি হাসছে মিটমিটি। তার চরিত্রের সঙ্গে এই হাসিটি ঠিক মিশ খাচ্ছে না। মামুন ধাঁধায় পড়ে গেল।
বলতে পারলেন না? আমার ট্রান্সফার অর্ডার হয়েছে।
বলেন কি?
আমি শনিবারে ঢাকায় চলে যাচ্ছি।
আমিও ঢাকায় যাচ্ছি। আমি আপনাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব। কোনো চিন্তা করবেন না। গল্প করতে করতে যাব। ফাইন হবে।
জাহানারা হাসল। মামুন অবাক হয়ে বলল, হাসছেন কেন?
আপনার মধ্যে একটা ছেলেমানুষি আছে তাই দেখে হাসছি।
জাহানারা আবার হাসতে লাগল। কিশোরীদের হাসি; যা শুধু শুনতে ইচ্ছে করে।
আপনি খুব খুশি হয়েছেন?
খুশি হব না। মানে! কী বলছেন। আপনি?
এই জায়গাটা কী এতই খারাপ?
হ্যাঁ খারাপ। আর কিছুদিন থাকলে আমি মরে যেতাম।
মানুষ খুব কঠিন জিনিস। মানুষ এত সহজে মরে না।
আমি মরি। আপনার গাল দিয়ে কিন্তু এখনো রক্ত পড়ছে। ঘরে ওষুধপত্র কিছুই নেই?
না।
গাঁদা ফুলের পাতা কচলে গালে দিন না।
গাঁদা ফুলের পাতা আমি পাব কোথায়?
জাহানারা আবার হাসতে শুরু করল। তার আজ এত আনন্দ হচ্ছে। সে বেশিক্ষণ থাকবে না। বলে এসেছিল। কিন্তু সে বিকাল পর্যন্ত রইল। অনবরত কথা বলল। যাবার সময় কেমন যেন বিষন্ন হয়ে গেল। হালকা স্বরে বলল, আপনি যতবার ঢাকা যাবেন ততবার আমাদের বাসায় আসবেন। আসবেন তো?
হ্যাঁ আসব।
আমি আপনাকে সঙ্গে নিয়ে এক’দিন উনাকে দেখতে যাব।
কাকে দেখতে যাবেন?
ঐ যে মেয়েটি যে আমার মত দেখতে।
ও মুনাকে?
হ্যাঁ। উনি আমাকে দেখে আবার রেগে যাবেন না তো?
না রাগবে না; ও অন্য ধরনের মেয়ে।
জাহানারা নিঃশ্বাস ফেলল।
ভদ্রলোক সরু চোখে তাকিয়ে রইলেন
মুনা বলল, আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?
ভদ্রলোক সরু চোখে তাকিয়ে রইলেন। যেন প্রশ্নটা ঠিক বুঝতে পারছেন না। মুনা বলল, আমি অন্য একটা কেইসের ব্যাপারে। আপনার কাছে এসেছিলাম। আমার মামা একটা ঝামেলায় পড়েছিলেন…
ভদ্রলোক মুনাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, মনে আছে। ক্রিমিনাল মিস এপ্রোপ্রিয়েশনের মামলা। চারশ তিন ধারা। আপনার মামার নাম শওকত হোসেন কিংবা শওকত আলি।
মুনা যথেষ্ট অবাক হল। এই উকিল ভদ্রলোক অসম্ভব ব্যস্ত। চেম্বারে লোকজন গিজগিজ করছে। তার পক্ষে এতদিন আগের একটা মামলার কথা মনে থাকার কথা নয়। এর রকম স্মৃতিশক্তি মানুষের থাকে?
আপনার নামও মনে আছে। মিস মুনা। এখনো কি মিস আছেন না মিসেস হয়েছেন?
হইনি এখানে।
কেন অসুবিধা কি?
ভদ্রলোক গভীর আগ্রহে তাকিয়ে রইলেন। যেন সত্যি সত্যি জানতে চান। কত বিচিত্র স্বভাবের মানুষই না থাকে পৃথিবীতে।
অসুবিধাটা কি বলুন।
ব্যক্তিগত অসুবিধা। সেটা এই জায়গায় বলতে চাই না।
আরে এই জায়গা কি দোষ করল? উকিলের চেম্বারে সব কথা বলা যায়। এ টু জেড।
আমি যে সমস্যা নিয়ে এসেছি তার সঙ্গে আমার মিস বা মিসেসের কোনো সম্পর্ক নেই।
ও আচ্ছা।
আমি কি সমস্যাটার কথা বলব?
আজ শুনতে পারব না। আজ ব্যস্ত। আগামী সপ্তাহে আসুন। সোমবার। এ্যাপয়েন্টমেন্ট করে যান। কাগজপত্র কী আছে?
কিছু কিছু আছে।
সেই সব রেখে যান। আমার এসিসটেন্ট আছে। জুনিয়র দুই উকিল। বুদ্ধিশুদ্ধি মিলিটারিদের মত। মাথার খুলির ভেতরে সাবানের ফেনা ছাড়া আর কিছু নেই। নো ব্রেইন। কিন্তু উপায় কি বলুন? এই শমসের চা দে। ইনারে চা দে।
মুনা বলল, আমি চা খাব না।
কেন খাবেন না?
কারণ কিছুই না। খেতে ইচ্ছে করছে না।
আপনি বললেন। কারণ নেই আবার খেতে ইচ্ছে করছে না। দুরকম কথা বলেন কেন? খেতে ইচ্ছে করছে না। এটাই হচ্ছে কারণ। কথাবার্তা চিন্তা-ভাবনা করে বলা উচিত।
উকিল ভদ্রলোক থু করে একদলা থুথু ফেললেন এ্যাসট্রেতে। চারদিকে এ্যাসট্রের ছাই ছড়িয়ে পড়ল। ভদ্রলোক বিরক্ত হবার বদলে মনে হয় আরো খুশি হলেন। ছাই কি করে উড়ে সেটা পরীক্ষা করবার জন্যে আরেক দফা থুথু ফেললেন।
মিস মুনা।
জি।
ছাই ফেলবার জন্যে সব টেবিলে এ্যাসট্রে থাকে। কিন্তু থুথু ফেলবার জন্যে কিছু থাকে না। কিছু থাকা উচিত। পিকদানি টাইপ কি বলেন?
মুনা কিছু বলল না। উকিল সাহেব হাই তুলে বললেন চলে যান, বসে আছেন কেন? সোমবারে আসবেন। দেখে দেব। আমার ফিস কিন্তু আরো বেড়েছে। জেনে যাবেন। শেষে আমড়াগাছি করবেন। সেটা হবে না। উকিলের চেম্বার কোনো মাছের বাজার না। মুহুরির কাছে সব জেনে-টেনে যান।
জি আচ্ছা।
সোমবারে ফিসের টাকার গোটাটাই নিয়ে আসবেন। খালি হাতে আসবেন না। মুনা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আপনার কাছে যারা আসেন তাদের সবারই নামধাম কি আপনার মনে থাকে?
হুঁ থাকে। নাম মনে থাকে আর কোনো ধারার কেইস ঐটা মনে থাকে। করে খাচ্ছি। তো এই কারণেই। হা হা হা।
মুনা বের হয়ে গেল। অফিসের সময় হয়ে আসছে। এখান থেকে একটা রিকশা নিলে ঠিক সময় পৌঁছান যাবে। মুনা খানিকক্ষণ ভেবে ঠিক করল। আজ অফিসে যাবে লাঞ্চ টাইমের পর। এই সময়টায় সে চেষ্টা করবে বাকেরের বড় ভাইকে ধরতে। হাসান সাহেব বোধ হয় নাম। আগের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে সাকুলার রোডে বাড়ি নিয়েছেন। সেই ঠিকনা বের করতে মুনার কম ঝামেলা হয়নি।
