হাসান সাহেব। আবার চুপ করে গেলেন। ট্রেন চলছে দ্রুতগতিতে। ঝিকঝিক শব্দ হচ্ছে। ছোটবেলায় এই শব্দে কত রকম গান মিশে যেত। এখন যাচ্ছে না। শুধু রজনী নিঝুম কথাটা এসে মিশেছে।
সেলিনা বললেন, ঘুমিয়ে পড়েছ?
না।
বাকেরকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। ওর বন্ধু-বন্ধাবরা ওকে ছাড়িয়ে আনবে।
আমি বাকেরকে নিয়ে ভাবছি না।
কি ভাবিছ তাহলে?
নিজের কথা ভাবছি।
কোর্টে বাকেরের জামিন হল না। তার বিরুদ্ধে চারশত আটচল্লিশ এবং উনিশ অবলিকের এফ ধারায় দু’টি অতিযোগ। এই দু’টি অভিযোগই জামিনযোগ্য নয়। কোর্টে থেকে পুলিশ রিমান্ডে উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা। তার সহয়োগী অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্যাদি নেয়া। কিন্তু কাৰ্যক্ষেত্রে সে রকম কিছু হল না। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার ব্যাপারার পুলিশের কোন রকম আগ্রহ দেখা গোল না। এরমধ্যে ইয়াদ এল তাকে দেখতে। সুন্ট-টুট পরা ভদ্রলোক। চুলের স্টাইল বদলে ফেলেছে কিংবা কিছু একটা করেছে। তাকে চেনা যাচ্ছে না। সে চোখ কপালে তুলে বলল, অবস্থা কি?
অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছিস।
হেভি পিটন দিয়েছে মনে হয়। মুখ ফোলা।
মারধর করেনি। মশার কামড়ে মুখ ফুলেছে।
মশারি দেয় না।
বাকের উত্তর দিল না তার প্রচণ্ড ইচ্ছা করছে গারদের ফ্যাক দিয়ে হাত বের করে প্রচণ্ড একটি চড় কষিয়ে দিতে। সে দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বলল, হারামজাদা।
আমি খবর পেয়েছি। পরশু বুঝলি। খবর শুনে আমার মাথায় থান্ডার এসে পড়ল। বিনামেঘে বজাঘাত। আমি ভাবলাম ব্যাপারটা কি! কোন ঝামেলায় জড়ালি। নে সিগারেট নে।
বাকের সিগারেট নিল। টাক মাথার কবীর উদ্দিন বলল, স্যার আমারে একটা দেন। আমি বাকের সাহেবের খোঁজখবর করছি।
ইয়াদ সিগারেটের প্যাকেট বাকেরের দিকে এগিয়ে দিল। রাজা মহারাজাদের মতো ভঙ্গি করে বলল, রেখে দে তোর কাছে। আর শোন কোনরকম চিন্তা করবি না। আমি আমার শ্বশুর। সাহেবকে বলছি। সে কানেকশনওয়ালা আদমি। দুই তিনটা টেলিফোন করলেই দেখষি জামিন হয়ে গেছে। তোর ভাই কিছু করছে?
জানি না। বোধ হয় কিছু করছে না। শুনলাম তার চাকরি নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। কি সমস্যা?
তা জানি না। বাংলাদেশে কি সমস্যার শেষ আছে নাকি? হা হা হা।
বাকের পেট কাঁপিয়ে হাসতে লাগল। এর মধ্যে তার একটা নাদুস নুদুস ভুড়িও হয়েছে। দেখলেই হাত বুলাতে ইচ্ছা করে।
বাকের।
বল।
আমার একটা নিউজ আছে। শ্ৰীলংকা যাচ্ছি।
তাই নাকি?
হুঁ, আমার এক মামাশ্বশুর ম্যানেজ করে দিলেন। ব্যবসার ব্যাপার। ওখান থেকে নারকেল তেল আনব।
ভাল।
আমার বউও সঙ্গে যেতে চাচ্ছে বুঝলি। দিনরাত ঘ্যান ঘ্যান করছে।
নিয়ে যা।
মেয়েছেলে কোথাও সঙ্গে নিতে আছে? ঐ যে কি যেন বলে–পথে নারী বিবর্জিতা। আমিও চেষ্টা করছি। কিছু লাভ হবে না। এঁটেল মাটির মতো লেগে গেছে।
বাকের চুপ করে রইল। ইয়াদ তার সিগারেট শেষ করে উঠে থু করে একদলা থুথু ফেলল। চোখ মুখ কুঁচকে বলল, বড় গাধা জায়গা, বমি এসে যাচ্ছে। তুই কোন চিন্তা করিস না। চিকোবশ ঘণ্টার মধ্যে ছুটিয়ে নিয়ে যাব। কাউকে কোন খবর টাবর দিতে হবে?
না। তুই যাচ্ছিস?
হুঁ।
কবীর উদ্দীন বলল, স্যার আপনি বাকের সাহেবকে কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে যান। উনার হাতে একটা পয়সা নাই।
ইয়াদ আশ্চর্য হয়ে মানিব্যাগ বের করল। দুইটি একশ টাকার নেট এবং কিছু খুচরা ছিল। একশ টাকার দু’টি নোটিই এগিয়ে দিল। বাকের টাকা নেবার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখাল না। হাত বাড়াল কবীর উদ্দীন। মুখ তৰ্তি হাসি দিয়ে বলল, যাবার আগে ওসি সাহেবকে একটু স্যার বলবেন আমাদের দেখাশোনার জন্যে। একটা এক্সট্রা কম্বল পেলে স্যার খুব ভাল হয়।
সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডের সময়সীমা শেষ। কিন্তু পুলিশ আরো সাত দিনের সময় চাইল। কোর্ট সময় মঞ্জর করল। বাকের পুরনো হাজতঘরে ফিরে এল। কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে এল না। প্রথম সাতদিন পার করতে যতটা খারাপ লাগছিল। দ্বিতীয় সাতদিনে ততটা খারাপ লাগল না। কারণ কবীর উদ্দীন কী ভাবে যেন গাজার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। গাজাটা বেশ ভাল জিনিস। টানার জন্যে কলকে লাগে না। সিগারেটের তামাক ফেলে দিয়ে তার ভেতর গাজা ভরে চমৎকার টানা যায়। ভালই লাগে।
প্রথম খানিকক্ষণ মন খুব কোমল হয়ে যায়। কাঁদতে ইচ্ছা করে। ইচ্ছা করে খুব ভাল ভাল কাজ করতে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিতে। সেই কোমল ভাবটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। খানিকক্ষণের মধ্যেই জগৎ-সংসার সম্পর্কে একটি বৈরাগ্য এসে পড়ে। এই বৈরাগ্যের ভাব সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়। সবচে বড় কথা রাতের ঘুমটা ভাল হয়। এক ঘুমে রাত কাভার। ঢং ঢেং করে এরা যে ঘণ্টা পিটে সেই শব্দও কানো যায় না।
অন্যান্য হাজতিদের সম্পর্কে প্রথমদিকে তাক খানিকটা বিতৃষ্ণার ভাব ছিল। এখন সেটা নেই। সবার সঙ্গেই তার এখন ভাল সম্পর্ক। মতিলাল নামে একজন হাজতি ছাড়া পেয়ে চলে যাবার দিন বাকেরের বুক হুঁ-হু করতে লাগল। আর মতিলাল হারামজাদাও এমন গরু, ছাড়া পেয়েছিস বগল বাজাতে বাজাতে চলে যা, তা না। সবাইকে জড়িয়ে ধরে আকাশ-পাতাল কান্না। এই ভাবে কাঁদলে অন্যদের চোখে পানি আসবেই। বাকেরের গাল ভার হয়ে গেল। চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। বহু চেষ্টায় গলার স্বর কর্কশ করে সে বলল, কী এত দেরি করছেন? বাড়ি চলে যান। আর এত কাঁদছেন কেন? মেয়েছেলে নাকি? চোখ মুছেন রে ভাই!
জাহানারা অবাক হয়ে বলল
জাহানারা অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার?
