হাজতে ছোট্ট ঘরটায় নজন হাজতি। এর মধ্যে একজন অসুস্থ। সে বিকট শব্দে বমি করছে। বমির চাপে চোখ উল্টে আসছে। কেউ তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। সবার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের উদাস ভাব।
দরজার পাশে সেন্ট্রি পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। চোখে-মুখে রাজ্যের নির্লিপ্ততা! বমি করার ব্যাপারটি সে দেখছে কিন্তু সে দৃশ্য তার মনে কোনো ছাপ ফেলছে না। বাকের বলল, ভাই এসব পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করুন। লোকটাকে একটা ডাক্তার দেখান!
পুলিশটি কোনো শব্দ করল না। বাকের দ্বিতীয়বার বলল, কি ব্যাপার ভাই? কিছু করুন।
সন্ধ্যাবেলা জমাদার আসবে তখন পরিষ্কার হবে।
লোকটাকে এক গ্রাস পানি এনে দিন।
পুলিশটি বড় একটি টিনের মাগে এক মগ পানি এনে দিল।
বাকেরের ধারণা ছিল সন্ধ্যার আগেই অনেকে আসবে তার কাছে।
তার ভাই হয়ত আসবে না। কিন্তু লোক পাঠাবো। সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকতে হবে কষ্ট করে।
ঘরে বমির কুৎসিত গন্ধ। সবাই নাকে রুমাল চাপা দিয়ে বসে আছে। টাক মাথার গোঁফ ওয়ালা একটি লোক বলল, বড় ভাই আপনার কাছে সিগারেট আছে?
বাকের বলল, না।
টাকা তো আছে। সেন্ট্রিকে দেন সিগারেট এনে দিবে। ওকে পাঁচটা টাকা দিতে হবে। আমার কাছে দেন ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
বাকের একটা কুড়ি টাকার নোট বের করে দিল। টাক মাথার লোকটি বলল, আরো পাঁচটা টাকা দেন তাহলে ভাল কম্বল পাবেন। নয়, এমন কম্বল দিবে ঘুমাতে পারবেন না।
আপনি কতদিন ধরে আছেন এখানে?
তের মাস।
তের মাস? বলেন কি?
এতদিন খাজতে রাখার কোনো নিয়ম নিযাই। কোর্টে নিতে হয়। জামিন দিতে হয়, জামিন না। হলে জোলখানায় হাজত আছে। কিন্তু–
কিন্তু কি?
না কিছু না।
দুইটা খুন করেছি। টাকা খেয়ে করেছি। যাদের টাকা খেয়ে করেছি। তারাই ধরিয়ে দিয়েছে। বড় ভাই, গোটা দশেক টাকা ধার দিতে পারেন? আমার ছেলে টাকা নিয়ে এলেই পেয়ে যাবেন।
আপনার নাম কি?
আমার নাম কবীর উদ্দিন। বাড়ি হচ্ছে গিয়ে মুন্সিগঞ্জ। মুন্সিগঞ্জ গিয়েছেন কখনো?
না।
ভালই করেছেন না গিয়ে। যাওয়ার মতো জায়গা না। আমি নিজেই যাই না।
বাকের মানিব্যাগ খুলে দশটি টাকা দিল। ব্যাগে আরো ত্ৰিশ টাকার মত আছে। তার জন্য যথেষ্ট। সন্ধ্যার আগেই ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
সন্ধ্যার আগে কোন ব্যবস্থা হল না। কেউ এল না বাকেরের কাছে। অসুস্থ লোকটি বিকট শব্দে বমি করতে লাগল। মাঝরাতে। বাকের ভেবেছিল এখানেই মরে পড়ে থাকবে। তা অবশ্যি হল না। ওসি সাহেব এসে তাকে হাসপাতালে পাঠালেন। হাজতঘরে কোনো বাতি নেই। বাতির দরকারও নেই। বারান্দার আলো এসে পড়ছে। এতেই দেখা যাচ্ছে। তবু ওসি সাহেব কি মনে করে যেন পাঁচ ব্যাটারির টর্চলাইট সবার মুখের ওপর কিছুক্ষণ করে ধরতে লাগলেন। বাকেরের মুখের ওপর তাও অনেকক্ষণ ধরা রইল।
এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে হাসান সাহেব বাকেরের গ্রেফতার হবার খবর পেলেন দেড় দিন পর। তাও পত্রিকার মাধ্যমে। ছবি ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। কোন খবরই তিনি দুবার পড়েন না। এটিও পড়লেন না। যদিও তার মন বলতে লাগল এ খবরটা আবার পড়া উচিত। এবং কিছু করলেন না। এগারটা বাজার আগেই বাসায় চলে এলেন। অফিসে তার কিছুই করার ছিল না।
সেলিনা অসময়ে তাকে ফিরতে দেখে মোটেই অবাক হলেন না। যেন তিনি জানতেন হাসান সাহেব অসময়ে ফিরবেন। এবং এ জন্যেই যেন সেজোগুজে অপেক্ষা করছিলেন। সেলিনা বললেন, তুমি কি আট ঘণ্টার নোটিসে চিটাগাং যেতে পারবে?
কেন?
পারবে কিনা আগে বল।
না পারার তো কোনো কারণ দেখি না।
তানিয়ার বিয়ে। এখন আবার বলে বোস না যে তুমি তানিয়াকে চেন নয়। চেন তো?
হ্যাঁ চিনি। তোমার খালাতো বোন।
না হয়নি। আমার ফুফাতো বোন। হঠাৎ বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমাকে টেলিফোনে বলল। আমি বলে দিয়েছি যে ভাবেই হোক তোমাকে নিয়ে আমি কাল সকালে চিটাগাং উপস্থিত হব।
হাসান সাহেব কিছু বললেন না। সেলিনা বললেন, কথা বলছি না কেন?
কি বলব?
যেতে পারবে কিনা? বিয়েটা সেরে সেই রাতেই না হয় ফিরে আসব। রাত দশটায় ট্রেন আছে। আমি টিকিট কাটতে পাঠিয়েছি। অনেক দিন ট্রেনে চড়া হয় না? তোমার ট্রেনে চড়তে ইচ্ছা করে না?
করে।
তুমি যে প্রায়টা একটা করিতা বলতে কামরায় গাড়ি ভরা ঘুম। রজনী নিঝুম।
হা বলতাম।
রাতের ট্রেনে জাস্ট আমরা দু’জন। ইন্টারেস্টিং হবে না? আমার তো মনে হয় খুব ফান হবে।
হবে হয় তো।
আমি তোমার সুটকেস গুছিয়ে রেখেছি।
কাজ তো তাহলে অনেক দূর এগিয়ে রেখেছ।
হ্যাঁ তা রেখেছি।
ট্রেন ছাড়ল রাত দশটায়। হাসান সাহেবের বেশ ভালই লাগছে। কামরায় গাড়ি ভরা ঘুম রজনী নিঝুম। কবিতাটি বাববার মাথায় ঘুরছে। দু’জন মাত্র প্রাণী এ কামরায়। তাদের কেউ ঘুমুচ্ছে না। তবু এই কবিতার চরণটিই মাথায় আটকে গেল কেন? সেলিনা কি সব যেন বলছে। কিছুই মাথায় ঢুকছে না। কিন্তু শুনতে ভাল লাগছে। সেলিনার গলার স্বর চমৎকার।
এ্যাই তুমি কথা বলছি না কেন?
শুনছি। দুজনে কথা বললে কে শুনবে?
বাকেরের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু করেছ?
হাসান সাহেব বললেন, তুমি জানতে?
জানব না কেন?
কবে জানলে?
যেদিন ধরে নিয়ে গেল সেদিনই। তুমি অফিসে চলে গেলে। একটা ছেলে এসে আমাকে বলল।
আমাকে তো কিছু বলছিন। আমি জানলাম খবরের কাগজ পড়ে।
সেলিনা চুপ করে রইলেন। হাসান সাহেব শান্ত স্বরে বললেন, আমাকে জানানো উচিত ছিল।
আমার জানাতে ইচ্ছা করেনি।
