অসহ্য। ভদ্রলোক কখনো বোধ হয় ভাবেন না যে এ বাড়িতে বাইরের একজন আছে। তার সামনে অন্তত কিছুটা সংযত আচরণ করা উচিত। স্ত্রীকে পশুর মত কেউ কি দেখে এই সময়ে? আর মেয়েটি এমন বোকা একটি কথাও বলবে না। নিঃশব্দে গাল হজম করবে। মাঝে মাঝে জাহানারারই বলতে ইচ্ছা করে, এসব কি শুরু করেছেন?
কিন্তু তা বলা সম্ভব নয়। অনেক কিছুই আমরা বলতে চাই কিন্তু বলতে পারি না। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে হয়। অবশ্যি জাহানারা একটা ঘর নেবার চেষ্টা করছে। যদিও সে জানে একা এক একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ঢাকা থেকে মা এবং ভাই-বোনদের নিয়ে আসার প্রশ্নই উঠে না। বোন দু’টির স্কুল আছে। ছোট ভাই অনার্স পরীক্ষা দিচ্ছে। বাবার শরীরও ভাল হবে না। তবু জাহানারা যাকে পাচ্ছে তাকেই বলছে, আমার জন্যে একটা বাসা-টাসা দেখবেন। কেউ তার কথার তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। গুরুত্ব দেবার কথাও নয়। এ রকম পাড়াগা জায়গায় লোকজন ভাড়া দেবার জন্যে গণ্ডায় গণ্ডায় বাড়ি রাখে না। ম্যানেজার সাহেব এক’দিন বেশ গম্ভীর হয়ে বললেন, শুনছি চারদিকে আপনি বাড়ি খুঁজছেন? জাহানারা কিছু বলল না।
আমার এখানে আপনার কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে?
জি না স্যার।
অল্প কিছুদিন থাকবেন বাড়ি-টাড়ি খোজার ঝামেলা করবেন না। একা একা থাকবেন কিভাবে?
জাহানারা চুপ করে রইল। ম্যানেজার সাহেব শুকনো গলায় বললেন, তাছাড়া এই যে আপনি বাড়ি খোঁজাখুঁজি করছেন তার একটা বাজে দিক আছে।
বাজে দিক মানে?
লোকজন নানান কথা বলবে।
জাহানারা অবাক হয়ে বলল, স্যার আপনার কথা বুঝতে পারছি না।
আপনি এতদিন ছিলেন আমাদের সঙ্গে। এখন চলে যেতে চাচ্ছেন। অথচ একা মেয়ে মানুষ লোকজন আমাকে নিয়ে নানান কথা ভাববে।
জাহানারা হকচকিয়ে গেল। তার দারুণ মন খারাপ হল। এটা এমন জায়গা যে মন খারাপ হলেও কিছু করার নেই। কোথাও যাবার নেই। ঢাকায় থাকলে কত কি করা যেত। একটা গল্পের বই নিয়ে বারান্দায় বসে থাকা যেত। বই মুখের ওপর ধরে কাদা যেত। কেউ দেখে ফেললে অসুবিধা নেই। ভাববে পড়ে কাঁদছে।
কিন্তু এখানে কিছুই করার নেই। তবু সে মন খারাপ হলে একা একা হাঁটে। লোকজন প্রথম দিকে কৌতূহলী হয়ে তাকাত, এখন তাকায় না। কাঁচা রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে সে কুসুমখালি নদী পর্যন্ত যায়। মরা নদী। তবে বর্ষার সময় নদী নাকি খুব ফুলে-ফেপে ওঠে। ম্যানেজার সাহেবের কাছে শুনেছে সেটা নাকি একটা দেখার মত ব্যাপার। জাহানারা নিশ্চিত জানে সে বর্ষা পর্যন্ত থাকবে না। কিন্তু কোনো-এক বিচিত্র কারণে মাঝে মাঝে তার মনে হয়। বর্ষা পর্যন্ত থেকে গেলে ভালই হবে।
নদীর যে দিকটায় জাহানারা যায়। সেখানে শ্মশান ঘাট। ভাঙা হাঁড়ি-কুড়ি আছে। শ্মশান যাত্রীদের বিশ্রামের জন্যে একটা শ্যাওলা ধরা পাকা ঘর আছে। তার দেয়ালে কাঠ কয়লা দিয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথাবার্তা লেখা। এক’দিন অফিসের পিওনাকে সঙ্গে নিয়ে সে লেখা পড়তে এসেছিল। রোজ রোজ তো তাকে সঙ্গে নিয়ে আসা যায় না।
শ্মশান ঘাটেই এক’দিন তার মামুনের সঙ্গে দেখা। মামুন চোখ কপালে তুলে বলল, এখানে কি করছেন?
জাহানারা বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, কিছু করছি না। বেড়াচ্ছি।
বেড়াচ্ছেন্ন মানে? এটা কি বেড়াবার জায়গা?
কেন ভূত আছে নাকি?
ভূত আছে কি না জানি না। তবে এখানে সেভেন্টিওয়ানের যুদ্ধের সময় বহু মানুষকে গুলি করে মেরেছে। আমরা কেউ একদিকটায় আসি না।
এই তো আপনি এসেছেন।
আমি আপনার জন্যেই এসেছি। দূর থেকে দেখলাম শাড়ি পরা একটা মেয়ে ঘুরছে। তাও শহরের মেয়ে। আপনার ব্যাপারটা কি বলুন তো?
ব্যাপার কিছু না। বেড়াচ্ছিলাম। বেড়াবার তো জায়গা নেই।
বেড়াবার জায়গা থাকবে না কেন? বিরাট একটা দেয়াল আছে। সারদেয়াল নাম। কারা তৈরি করেছে। কেউ জানে না। বিশাল ব্যাপার। দেখলে অবাক হয়ে যাবেন।
জাহানারা কিছু বলল না। লোকটির তাকে বেড়াতে নিয়ে যাবার এই বাড়াবাড়ি আগ্রহ ভাল লাগছে না।
কি যাবেন। সারদেয়াল দেখতে?
জি না।
এখান থেকে মাইল দুয়েক দূরে বড় গঞ্জ আছে। একটা সিনেমা হলও হয়েছে। গিয়েছেন সেখানে?
জি না।
যাবেন। যেতে চাইলে আমি নিয়ে যেতে পারি।
থ্যাংকস। আমি কোথায় যাব না।
জাহানারা হাঁটতে শুরু করল। মামুন আসছে তার পাশাপাশি। এরকম সরু রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটার দরকার কি। একবার গায়ে গা লেগে গেল জাহানারা বিরক্ত গলায় বলল, আপনি আগে আগে যান। আমি আসছি আপনার পেছনে।
পাশাপাশি না হাঁটলে গল্প করা যাবে না তো। গল্প করার সময় মাঝে মাঝে মুখের দিকে তাকাতে হয়। অন্যের মুখের ভাবের দিকে লক্ষ্য রাখতে হয়।
আপনিও কি লক্ষ্য রাখছেন?
হ্যাঁ রাখছি। এবং বুঝতে পারছি আপনি আমার ওপর অসম্ভব বিরক্ত হচ্ছেন।
তা হচ্ছি।
বিরক্ত হবার কিন্তু কোনো কারণ নেই। আপনি যদি মনে করে থাকেন–আপনার সঙ্গে খাতির জমানোর জন্যে বেড়াতে-টেড়াতে নিতে যাচ্ছি তাহলে ভুল করবেন। ঐ জাতীয় কোন উদেশ্য আমার নেই। আপনাকে কেমন লোনলি লাগছিল তাই বলছিলাম। আচ্ছা, যাই তাহলে।
মামুন লম্বা লম্বা পা ফেলে ডানদিকে রওনা হল। জাহানারার অস্বস্তির সীমা রইল না।
বকুলের গায়ে হলুদ
আগামীকাল বকুলের গায়ে হলুদ। গায়ে হলুদ জাতীয় অনুষ্ঠানের আগের দিনটি যেমন জমজমাট হওয়া উচিত তেমন লাগছে না। বকুলের মনে হল সবাই কেমন যেন গা ছেড়ে দিয়েছে। মুনা। আপা যথারীতি অফিসে চলে গিয়েছে। আজ অফিসে না গেলে কি হত? বাবুও রান্নাঘরে ভাত নিয়ে বসেছে। সেও বোধ হয়। স্কুলে যাবে। কি আশ্চর্য এত বড় উৎসবের ঠিক আগের দিনটিতে সবাই সবার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। যেন গায়ে হলুদ খুব সাধারণ ব্যাপার। এ বাড়িতে রোজই এ রকম একটা উৎসব হচ্ছে। বকুল বেশ মন খারাপ করে রান্নাঘরে গেল। ইতস্তত করে বলল স্কুলে যাচ্ছিস, বাবু?
