কাশেম আলী সাহেব পরিচয় করিয়ে দিলেন। মামুনের ফাইল বের করে কি সব করতে বললেন। মামুন তার কিছুই বুঝতে পারল না। এবং তার মনে হয় মেয়েটিও বুঝতে পারছে না। পরীক্ষার কঠিন প্রশ্নের দিকে মেয়েরা যে ভাবে তাকায় সেই ভাবে তাকাচ্ছে। মামুন হাসিমুখে বলল, এ রকম পাড়া গাঁয়ে এলেন কেন?
কি করব বলুন? অন্য কোথাও ভেকেন্সি ছিল না। তবে বেশিদিন থাকতে হবে না। এজিএম বলেছেন মাস দুয়েকের ভেতর ঢাকায় ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করবেন।
ঐ সব মুখের কথা একেবারেই বিশ্বাস করবেন না। একবার যখন এনে ফেলে দিয়েছে। আর নড়াবে না।
মেয়েটি চোখ-মুখ অন্ধকার করে বসে রইল। বড় বড় নিঃশ্বাস নিতে লাগল। মামুনের বড় মায়া লাগল। মেয়েটিকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে বাবা-মা, ভাই-বোন ফেলে এসেছে। আসতে হয়েছে অর্থনৈতিক কারণে। সংসার চলছে হয়ত বাবার পেনশন এবং মেয়ের চাকরির টাকায়।
এখানে থাকেন কোথায়?
ম্যানেজার সাহেবের বাসায়। উনি ফ্যামিলি নিয়ে থাকেন। একটা কামরা আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন।
অসুবিধা হচ্ছে না তো?
জি না।
অসুবিধা হলে বলবেন। আমি এখানকারই ছেলে।
মেয়েটি অল্প হেসে কাগজপত্রের ওপর ঝুঁকে পড়ল। যেন সে কথাবার্তা আর চালিযে যেতে আগ্রহী নয়। মামুনের হঠাৎ করে মনে হল এই মেয়েটির সঙ্গে মুনার কোথায় যেন একটা মিল আছে। সেই মিলটি কোথায় সে তার ধরতে পারছে না। অমিলগুলি ধরা পড়ছে সহজেই। মুনার মধ্যে এক ধরনের কাঠিন্য আছে এই মেয়েটির মধ্যে সে জিনিসটা একেবারেই নেই। চেহারাও দুজনের দুরকম। মুনার মুখ লম্বাটে, এ মেয়েটির মুখটি গোলাকার। তালে মিলের একটা ব্যাপার মনে আসছে কেন? মুনার সঙ্গে যে পরিস্থিতিতে আলাপ হয়েছিল। এই মেয়েটির সঙ্গে ঠিক সেই ভাবেই আলাপ হচ্ছে। এটিই কি কারণ? একটা কাজের ব্যাপারে সে মুনাদের অফিসে গিয়েছিল। কাজটি তেমন জটিল কিছু ছিল না। কিন্তু মুনা সেই সামান্য কাজ নিয়েই হাবুডুবু খাচ্ছিল। আজ যেমন এই মেয়েটি খাচ্ছে। কিছু কিছু ঘটনা কি আমাদের জীবনে ঘুরে ঘুরে আসে?
জাহানারা বলল, আপনি খানিক্ষণ বসুন। মামুন হাসিমুখে বলল, বসেই তো আছি। প্রায়ই আসি এবং বসে থাকি।
মামুন ভেবেছিল মেয়েটি কথার পিঠে কোন কথা বলবে। ইন্টেলিজেন্ট কিছু বলতে চেষ্টা করলে কিন্তু তা ঠিক ইন্টেলিজেন্ট হবে না। কিন্তু জাহানারা কিছুই বলল না। গভীর মনোযোগে ফাইল উল্টাতে লাগল। একটি মেয়ের সামনে চুপচাপ বসে থাকা কঠিন ব্যাপার। কিন্তু একা একা বকবক করাও মুশকিল।
আমাদের জায়গাটা কেমন লাগছে?
ভালই।
আগে কখনো গ্রামে কাটিয়েছেন?
না।
শহরেই মানুষ?
ঠিক শহরে না মফস্বল শহর।
কোন মফস্বল শহর?
জাহানারা তার জবাব না দিয়ে শান্ত গলায় বলল, আপনাকে আর আমাদের এখানে আসতে হবে না। কাগজপত্র সব ঢাকায় পাঠিয়ে দিচ্ছি। লোন স্যাংশন হলেই আপনাকে খবর দেয়া হবে।
ংশন হবে তো?
নিশ্চয়ই হবে। হবে না কেন।
ঘরে বসে থাকলেই হবে, না ধরাধরির ব্যাপার আছে?
আপনাতেই হবে।
এ দেশে আপনাতেই কিছু হয় না।
জাহানারা এ কথারও কোনো জবাব দিল না। অন্য কি সব কাগজপত্র দেখতে লাগল। মামুনের এখন উঠে পড়া উচিত। কিন্তু উঠতে চেষ্টা করছে না। এক ধরনের আলস্য লাগছে।
উঠি আজ? আবার দেখা হবে।
মেয়েটি সামান্য হাসল। মুনার হাসির সঙ্গে এই মেয়েটির হাসির কি কোন মিল আছে। আছে হয়ত। প্রতিটি মানুষ হাসে নিজের মত করে। একজনের হাসির সঙ্গে অন্যজনের হাসির কোন মিল নেই। অবশ্যি সবাই কাঁদে একইভাবে। নাকি একেকজন মানুষের কান্নাও একেক রকম।
ডাকে একটি রেজিস্ট্রি চিঠি এসেছে। মামুন মনে করতে পারল না রেজিস্ট্রি চিঠিতে সে কখনো কোনো জরুরি কিছু পেয়েছে কি না। না পায়নি। বরং আজেবাজে জিনিসপত্রই লোকে তাকে রেজিস্ট্রি করে পাঠিয়েছে। একবার সে চিঠি পেল যে কোনো এক লোক মদিনা শরিফে কি একটা স্বপ্ন দেখছে সেই স্বপ্নের কথা সাতজনকে লিখে জানাতে হবে। যদি না জানানো হয় তাহলে বিরাট ক্ষতি হবে। জানালে লটারিতে টাকা। কত অদ্ভুত ধরনের মানুষই না আছে পৃথিবীতে।
মামুন চিঠিটা খুলল না। সন্ধ্যার পর ধীবে-সুস্থে খোলা যাবে। সন্ধ্যার পর তার কিছু করার থাকে না তখন চিঠিপত্র পড়াটা ভালই লাগবে। এমনও তো হতে পারে এটা মুনার চিঠি। আবেগটাবেগে দিয়ে একগাদা কথা লিখেছে। যার মূল বক্তব্য হচ্ছে–যা হবার হয়েছে এখন তুমি এস। এই জাতীয় চিঠি পেলে তার তৎক্ষণাৎ ছুটে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং উল্টোটা করতে হবে। চিঠির জবাব না দিয়ে গ্যাট হয়ে বসে থাকতে হবে। তারপর আসবে দ্বিতীয় চিঠি। দ্বিতীয় চিঠির পর তৃতীয় চিঠি। তৃতীয় চিঠির জবাবও যখন আসবে না। তখন হয়ত সে নিজেই চলে আসবে। চমৎকার হবে সেটা।
মামুন সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারল না। বিকেলে চিঠি খুলে ফেলল। বকুলের বিয়ের কার্ড। সঙ্গে চিঠিপত্র কিছুই নেই। একটা লাইন পর্যন্ত না। এর মানে কি? খামের ঠিকানাও কি মুনার লেখা নয়?
ম্যানেজারের বাসায় থাকাটা জাহানারার সহ্য হচ্ছে না। ভদ্রলোক রোজ তার স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করছেন। বেগুন দিয়ে ডিমের তরকারি রান্না করার বদলে ম্যানেজার সাহেবের স্ত্রী আলু দিয়ে তরকারি রোধেছেন। এতেই ভূমিকম্প হয়ে যাচ্ছে।
পেয়েছ তুমি কি? যা ইচ্ছা তাই করবে? এমন তো না ঘরে বেগুন ছিল না। ছিল। আমি নিজে কিনে দিয়েছি। ঘরে থেকে জিনিস পচবে আর তুমি লোক পাঠিয়ে আলু কিনে আনবে। না। এই তরকারি। আমি খাব না। ফেলে দিয়ে আস। এক্ষুণি ফেলে দিয়ে আস। ·
