চুপ কর তো বকুল।
তোমার শরীর খারাপ নাকি আপা?
হুঁ। আর শোন, তুই কি গায়ে সেন্ট দিয়েছিস? বকুল মৃদু স্বরে বলল, হ্যাঁ।
একগাদা সেন্ট দেয়ার মানেটা কি? গন্ধে বমি আসছে। বিয়ে ঠিক হলেই গায়ে বালতি বালতি সেন্ট ঢালতে হবে?
বকুল লজ্জা পেয়ে গেল। মুনা শীতল গলায় বলল, বিয়েটা এমন কোন ব্যাপার না। বিয়ে হচ্ছে বলেই জীবন-যাপনের পদ্ধতি পাল্টাতে হবে না। আগে যেমন ছিলি পরে ও তেমনি থাকবি।
আচ্ছা থাকব। তুমি এমন কথায় কথায় ধমক দি ও না তো আপা।
কথায় কথায়, ধমক দেই?
হ্যাঁ দাও। আগে বাবা দিত এখন দাও তুমি। কি যে খারাপ লাগে তুমি সেটা কোনদিন বুঝবে না। যদি বুঝতে তাহলে এ রকম করতে না। তোমার সঙ্গে আসাই ভুল হয়েছে।
ভুল হলে চলে যা। রিকশা নিয়ে চলে যা। তোকে সাধাসাধি করে সাথে নিয়ে যেতে হবে? বকুল কাটা কাটা গলায় বলল, মামুন ভাইয়ের সঙ্গে তোমার একটা কিছু হয়েছে। সেই রাগটা তুমি ঢালছ আমাদের সবার ওপর। রিকশা থামাতে বল। আমি নেমে যাব।
মুনা রিকশা থামাতে বলল। বকুল সত্যি সত্যি নেমে গেল। বিয়ে কী বিশেষ একটা কিছু যা সত্যি মানুষকে বদলে দেয়? মুনা নিজেও তার কিছুক্ষণের ভেতরেই ঘরে ফিরে এল। বকুলকে কোথাও পাওয়া গেল না; সে ফেরেনি। তার সেই বিখ্যাত টিমা ভাবার কাছেও যায়নি। কোথায় যেতে পারে? জহিরের কাছে? বসে বসে পেপসি খাচ্ছে?
রাগ করতে গিয়েও মুনা রাগ করতে পারল না। তার কেন জানি হাসি পেতে লাগল। বাবু বলল, হাসছ কেন?
হাসি আসছে তাই হাসছি।
বকুল আপাকে না করে দিও। রোজ ওখানে যায় আমার ভাল লাগে না।
রোজ যায় নাকি?
হুঁ রোজই যায়।
করে কী? বসে বসে পেপসি খায়?
হুঁ। তুমি হাসছ কেন?
আমি হাসলে তোর অসুবিধা কী?
বাবু গম্ভীর মুখে বের হয়ে গেল। অল্প বয়সে কেমন একটা ভারিক্কি ভাব এসে গেছে বাবুর মধ্যে। দেখতে মজা লাগে। মাথা নিচু করে হাঁটার ভঙ্গিটিও কেমন বুড়োটে যেন সংসারের জটিলতায় ক্লান্ত একজন মানুষ।
শওকত সাহেবেবী জ্বর আরো বেড়েছে। বুড়ে বয়সে জুরািজুরি খুব কাবু করে মানুষকে, তাকে যেমন করেছে। তার মনে হচ্ছে। এ যাত্ৰা তিনি বাঁচবেন না। তিনি সারা দুপুর জ্বর গায়ে বারান্দায় বসে রইলেন। তার প্রাণ ই ই করতে লাগল। সংসার মোটামুটি গুছিয়ে এনেছেন এ সময় মরে যাওয়াটা অন্যায়। কিন্তু সংসারে অন্যায়গুলিই সব সময় হয়। যখন একজন সব গুছিয়ে-টুছিয়ে বসে তখনই দুম করে একটা হাট অ্যাটাক। চোখ উল্টে বিছানায় ভিডুমি খেয়ে পড়া। কোনো মানে হয় না।
রাতের বেলা জ্বর হাঁস করে নেমে গেল। ঘাম দিয়ে শরীর ঠাণ্ডা। শরীর বেশ ঝরঝরে লাগছে। ক্ষিধে হচ্ছে। শওকত সাহেবের মনে হল এসবও ভাল লক্ষণ নয়। এ রকম চট করে জ্বর নেমে যাবে কেন? তিনি ক্ষীণ স্বরে ডাকলেন, মুনা, মুনা।
মুনা রান্না চাপিয়েছে। সে বিরক্ত মুখ করে উঠে এল।
কি হয়েছে মামা? মিনিটে মিনিটে ডাকছ কেন?
শরীরটা ভাল লাগছে না।
জ্বরটর সেরে তুমি তো দিব্যি ভালমানুষ। এত ডাকাডাকি কেন?
বাঁচব না রে মুনা?
বুঝলে কি করে? স্বপ্লটিপ্ল দেখছ? মামি কি এসে বলেছে নিয়ে যেতে এলাম?
হাসছিস কেন? এটা কী হাসির কোনো কথা?
মুনা খানিকটা বিব্রত বোধ করল। হেসে ফেলা উচিত হয়নি। সে রান্নাঘরে ফিরে গেল! বারু উনোনের পাশে মুখ লম্বা করে বসে আছে। অন্যদিন এই সময়টার বকুল থাকে। নিজের মনে কথা বলে যায়। আজ রাগারগির কারণে সে নিশ্চয় মুখ অন্ধকার করে নিজের ঘরে বসে আছে। বারু মুন আপাকে দেখে একটু হাসল। মুনা ঝাঁঝাল গলায় বলল, তুই এখানে কেন? পড়াশোনা নেই?
মাথা ধরেছে।
মুনা তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। বাবু সত্যি কথা বলছে না। তার মুখ হাসি হাসি। মাথা ধরা মানুষের মুখ নয়।
কিছু বলবি নাকি?
হুঁ।
কি? বলে ফেল। কথা পেটে নিয়ে বসে আছিস কেন?
শোবার সময় বলব।
একবার যখন বলেছে শোবার সময় বলর তখন সে শোবার সময়ই বলবে। এর আগে মারে গেলেও সে মুখ খুলবে না।
বাবু।
কি?
একটা কাজ করত একজন ডাক্তার নিয়ে আয়। মামাকে দেখাই। মামার মনে হয় ধারণা হয়েছে তার অসুখ-বিসুখকে আমরা তেমন পাত্তা দিচ্ছি না।
এখন আনব?
হুঁ। এখনি নিয়ে আয়। জহিরকে আনবি।
বাবু মুখ কালো করে বলল, ওকে কেন?
ওকে আনানই তো ভাল। ভিজিট দেয়ার ঝামেলা থাকবে না। আর জামাই মানুষ শ্বশুরকে দেখবে দরদ দিয়ে।
মুনা মুখ নিচু করে হাসতে লাগল। তার কেন জানি খুব মজা লাগছে। সে ঠিক করে রাখল জহির এলে বকুলকে দিয়ে চা পাঠাবে। আগে থেকে এ রকম ছেলেমানুষি একটি চিন্তা তার মাথায় কেন ঢুকল এই নিয়েও মুনা খানিকক্ষণ ভাবল। তার মাথাটা কী খারাপ হয়ে যাচ্ছে নাকি?
মেয়েদের মাথা খারাপ হয়ে যাওয়া খুব বাজে ব্যাপার। সে যখন তার চাচাদের সঙ্গে থাকত তখন ময়নার মাকে দেখেছে। চব্বিশ-পঁচিশ বছরের সুন্দরী মেয়ে। মাথা খারাপ হবার পর এমন সব কুৎসিত কথা চেঁচিয়ে বলত যে শোনা মাত্র ইচ্ছা করত ছুটে পালিয়ে যেতে।
মুনা রান্না শেষ করে বারান্দায় এসে দেখল। ইজিচেয়ারে বকুল বসে আছে। তার চোখে-মুখে রাগের কোন চিহ্ন নেই। সে বোধ হয় শুনেছে বাবু গিয়েছে জহিরকে আনতে।
বকুল?
কি আপা?
তোকে আমি খুব একটা জরুরি কথা বলব, বকুল, মন দিয়ে শোন।
বকুল উঠে দাঁড়াল। মুনা চাপা স্বরে বলল, আমি যদি কোন কারণে পাগল-টাগল হয়ে যাই তাহলে তুই বিষ খাইয়ে আমাকে মেরে ফেলবি। চিকিৎসা করার দরকার নেই।
