কাজের যে মেয়েটি আছে সে আরো বেশি ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। সে নাকি কবে দেখেছে রান্নাঘরে ঘোমটা মাথায় একটা বৌ মশলা পিষছে। সে কে কে বলে চিৎকার করতেই বৌ হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। দিনের বেলায় ঘটনাটা খুব হাস্যকর মনে হয়। কিন্তু সন্ধ্যা মিলাবার পর ভয় ভয় করে। সারারাত হারিকেন জ্বালিয়ে রাখি।
আসলে আমাদের এই বাড়ির এখন মৃত্যু হয়েছে। জড় পদার্থেরও প্রাণ আছে। এরাও মাঝে মাঝে মারা যায়। যেমন এই বাড়ি। যে বাড়িতে নিয়মিত জন্মমৃত্যু হয় সেই বাড়িটির প্রাণ আছে। আমাদের এই বাড়িটিতে শুধু মৃত্যুই হচ্ছে। দীর্ঘদিন কেউ জন্মায়নি। কাজেই বাড়িটির মৃত্যু হয়েছে। আমি ঠিক করেছি এটাকে বাঁচিয়ে তুলব। সব সময় লোকজনে বাড়ি গমগম করবে। নতুন শিশুরা জন্মাবে। আমার অনেক পরিকল্পনা আছে। সেই সব নিয়ে তোমার সঙ্গে কথা বলা হয়নি। কারণ বাড়ির ব্যাপারটা তোমার পছন্দ নয়। না দেখই তুমি অপছন্দ করে বসে আছ। আগে একবার এসে দেখ। দীঘির ঘাটে গিয়ে বস। কিংবা ছাদে পাটি পেতে দূরের বিলের দিকে তাকাও তাহলে দেখবে এটা চমৎকার জায়গা।
গ্রামে, শহরের সব রকম সুযোগ ব্যবস্থাও হচ্ছে। ইলেকট্রিসিটি চলে আসছে। গ্রামীণ ব্যাংক হয়েছে। কৃষি অফিসও হবে। মেয়েদের যে মাইনর স্কুল ছিল এ বছরই নাইন-টেন চালু হবে। ইচ্ছা! করলে এই স্কুলে তুমি মাস্টারিও করতে পার। স্কুলের জন্যে আমি ছবিঘা জমি দিয়েছি। আগ্রহ শুই দিয়েছি। আমি জায়গাটাকে বদলে ফেলতে চাই। শহর থেকে কেউ এসে যেন হাঁপিয়ে না ওঠে।
মুনা, তুমি বকুল এবং বাবুকে নিয়ে এখানে এসে কয়েক’দিন থেকে যাও। আমার ওপর রেগে আছ, ঠিক আছে থাক। রাগ কমাতে বলছি না। রাগ নিয়েই আস। তোমার ভাল লাগবে। তোমরা কবে আসতে পারবে জানালে লোক পাঠাব। আমি নিজে আসতে পারছি না। কারণ অনেক রকম ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছি। এলেই দেখবে। আজ এই পর্যন্ত থাকুক। দয়া করে চিঠির উত্তর দিও।
মামুন
নিতান্ত অপ্রিয় চিঠিও মানুষ দুবার পড়ে। কিন্তু এই চিঠিটি দ্বিতীয়বার পড়তে ইচ্ছা করছে না। আবার ফেলে দিতেও মন চাইছে না। মুনা ড্রয়ারে রেখে দিল। যদি কখনো ইচ্ছা হয় আবার পড়া যাবে। ইচ্ছা না করলে পড়ে থাকবে এবং এক সময় ড্রয়ার গুছাতে গিয়ে বকুল এসব জঞ্জাল ফেলে দেবে।
বাবু এসে বলল, আপা তোমাকে বাবা ডাকে।
যাচ্ছি। তুই আজ স্কুলে যাসনি?
তুই প্রায়ই স্কুল ফাঁকি দিস তাই না?
কে বলল তোমাকে?
আমার মনে হচ্ছে।
মুনা উঠে দাঁড়াল। বাবু দাড়িয় রইল শুকনো মুখে।
শওকত সাহেবের হঠাৎ করে জ্বর এসে গেছে। শেষ রাতের দিকে গা কেঁপে জ্বর এসেছে। এখনো থামেনি। আজ অফিস কামাই হয়ে গেল। বড় সাহেব রাগারগি করবে নিৰ্ঘাৎ। কাউকে দিয়ে একটা খবর পাঠানো দরকার। খবরটা দেবে কে?
মামা, ডেকেছি কেন?
শরীরটা খারাপ হয়ে গেছে। জ্বর।
সে তো সকালেই শুনলাম। জ্বর কি আরো বেড়েছে?
হুঁ। অফিসে যেতে পারব না।
যেতে বলেছে কে তোমাকে, শুয়ে থাক। আর যদি বেশি খারাপ লাগে তোমার ভাবী জামাই তো আছেই খবর দিয়ে দেই।
তুই রেগে আছিস কেন রে?
রোগে থাকব কেন? মেজাজ খারাপ হয়ে আছে।
একটু বোস। কথা আছে।
মুনা বসল। শওকত সাহেব বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পেলেন না। বলার মতো কিছু তাঁর ছিল না।
বল মামা কি বলবে?
বকুলের বিয়ের কি হল তাই বল। নতুন করে কি আর হবে? তারিখ মত বিয়ে হবে। চিন্তার কিছু নেই। কেনাকাটা?
সামনের মাসে হবে। তুমি টাকা দিলে তারপর তো কেনাকাটা।
দাওয়াতের কার্ড-টার্ড তো ছাপানো দরকার।
হবে সবই হবে। যথাসময়ে হবে।
বিয়ে বাড়িটা ঠিক জমছে না। মানে ইয়ে…
মুনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শওকত সাহেব নিচু গলায় বললেন, হৈচৈ ছাড়া কি বিয়ে বাড়ি হয়? কোন হৈচৈ নেই। কিছু নেই।
ঐদিন তুমি বললে কোন হৈচৈ না, আর আজ উৎসব-উৎসব করছি আশ্চর্য। মামা উঠি।
যাবি নাকি কোথাও?
হুঁ। একটা শাড়ি কিনব!
আবার শাড়ি? ঐদিন না কিনলি?
আরো কিনিব। আমার জমানো সব টাকা খরচ করব। দুটো সোনার চুড়ি বানাব।
শওকত সাহেব চুপ করে গেলেন। মুনার কোন-একটা সমস্যা হয়েছে যা তিনি ধরতে পারছেন না। লতিফা থাকলে ঠিকই ধরত।
মুনা বকুলকে সঙ্গে নিল। বকুলকে সঙ্গে নিয়ে কোথাও যাওয়া একটা সমস্যা। ইদানীং বকুলের খুব বকবকানি স্বভাব হয়েছে। বকবক করে মাথা ধরিয়ে দেয। এখনো তাই করছে। রিকশায় উঠেই কথা বলা শুরু করেছে।
বাকের ভাইয়ের কাণ্ডকারখানা কিছু শুনেছ। আপা? মারামাবি করেছে। মাখন বলে একটা ছেলে আছে না, মুখটা চ্যাপ্টা, তাকে এমন চড় দিয়েছে যে চাপার একটা দান্ত নড়ে গেছে। তারপর সিদ্দিক সাহেব আছে না? ঐ যে কুজো হয়ে হাঁটেন তাকে গিয়ে বলেছে, আমি আপনাকে খুন করে ডেডবিডি নর্দমায় ফেলে দিব। সিদ্দিক সাহেব এখন ঘর থেকে বেরুচ্ছেন না। আপা, তুমি শুনিছ কী বলছি?
শুনছি।
সিদ্দিক সাহেবের একটা গাড়ি আছে না। ঐটার দুটো টায়ার কে যেন ফাসিযে দিয়ে গেছে। নিৰ্ঘাৎ বাকের ভাইয়ের কাণ্ড। আরো কি যে করবে। কে জানে।
মুনা বিরক্ত হয়ে ধমক দিল, চুপ করত।
বকুল কয়েক সেকেন্ডের জনো চুপ করে আবার কথা শুরু করল, মাঝখানে বাকের ভাই বেশ ভদ্র হয়ে গিয়েছিল তাই না। আপা? এখন আবার আগের মতো হয়ে গেছে। পা ফাক করে দাঁড়িয়ে থাকে। আর এমন ভাবে তাকায় যেন কাঁচা খেয়ে ফেলবে। অবশ্যি আমার সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করে। গতকাল স্কুলে যাবার সময় দেখা, বাকৃের ভাই গম্ভীর হয়ে বলল, কই যাচ্ছ? স্কুলে? আমি বললাম, হ্যাঁ। বাকের ভাই বলল, হেঁটে হেঁটে যাচ্ছ কেন? রিকশা নাও, দু’দিন পর বিয়ে এখন রোদে হাঁটাহাঁটি করা ঠিক না। ঘর থেকে ধের হওয়াই ঠিক না। ঘরে বসে থাকবে। আমি বললাম..
