এখন কি প্রেসারটা কমেছে?
হ্যাঁ কমেছে। যখন তুমি বলবে। আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছ তখন পুরোপুরি কমে যাবে। এক মিনিট ব্যস, আমি আসছি।
কোথায় যাচ্ছে?
চা-টা দিতে বলি। যাব। আর আসব। রিল্যাক্স কর।
মামুন চটি ফটফট করতে করতে খুব ব্যস্ত ভাবে নিচে নেমে গেল। নেমে যাওয়ার ভঙ্গি কত সহজ কত স্বাভাবিক। মুনা নিজের মনেই খানিকক্ষণ হাসল। একটি দশ-এগার বছরের ছেলে কৌতূহলী হয়ে উঁকি দিচ্ছে। নতুন কাজের ছেলে বোধহয়। এই মেসে দু’দিন পরপরই নতুন কাজের ছেলে আসে। কিছুদিন থাকে তারপর কোনো-এক বোর্ডারের জিনিসপত্র চুরি করে চলে যায়। একবার মামুনের জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে গেল। ঐ ছেলেটার নাম ছিল রাখাল। মুনার সঙ্গে ভালই খাতির ছিল। তাকে আসতে দেখলেই ছুটে মামুনকে খবর দিত। মামুন যখন থাকত না সে ঘর খুলে দিত। মেঝেতে বসে গল্প করত।
রাখাল কি কারো নাম হয়? তুই তো আর গরু, চড়াস না যে নাম থাকতে হবে রাখাল?
আপা কি করমুকন। বাপ-মায় রাখছে।
হিন্দুদের রাখাল না থাকে। কিন্তু মুসলমান। নামটা বদলানো দরকার বুঝলি? সুন্দর রেখে একটা নাম দেব তোর। ঠিক আছে?
জি আইচ্ছা!
মুনা ভেবে রেখেছিল তারা যখন নতুন বাসা করবে তখন রাখালকে মেস থেকে নিয়ে নেবে। যেখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করে সেখানে একটি চটপটে কাজের ছেলে দরকার। বাজার করবে, রান্না করবে, বাড়ি পাহারা দেবে।
চেহারা দেখে মানুষকে বোঝা বোধ হয় খুব মুশকিল। এই রাখাল যে এই কাণ্ড করবে। কে জানত।
মামুন একগাদা খাবার-দাবার এনেছে। ডালপুরি, পেঁয়াজু। ফ্লাস্ক ভর্তি করে চা।
মুনা চা খাও। নিজে ঢেলে নাও। বেশ লাগছে খেতে। মামুন তার বিছানায় পা তুলে বসেছে। মাঝে মাঝে পা নাড়াচ্ছে। পা নাচান দেখতে ভাল লাগে না। আগে অনেকবার মামুনকে সে পা নাচাবার জন্যে বকা দিয়েছে। আজ কিছুই বলল না। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
মুনা!
বল।
তুমি আসায় আমি যে কি পরিমাণ খুশি হয়েছি তা তোমাকে বোঝানো মুশকিল। যা দুশ্চিন্তা করছিলাম। ঐ দিনের ব্যাপারটার জন্যে আমি খুব দুঃখিত।
দুঃখিত?
হ্যাঁ। দুঃখিত। লজ্জিত। অনুতপ্ত। ব্যথিত।
এত কিছু একসঙ্গে?
মামুন লক্ষ্য করল, মুনা চা খাচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার মুখ ভাবলেশহীন। যেন সে তার কোনো কথা শুনতে পাচ্ছে না। তাকিয়ে আছে দূরে কোথাও।
মুনা।
মুনা তাকাল তার দিকে, জবাব দিল না। মামুন সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, ঐ দিনটার ঘটনা আমি জাস্টিফাই করতে অনেক চেষ্টা করেছি। দেখ মুনা, আমাদের বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে আছে। আমবা দুজনে মিলে একটা বাড়ি ভাড়া করেছি। ঘর সাজাবার জিনিসপত্র কিনেছি। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়নি। কিন্তু ধরতে গেলে আমরা স্বামী-স্ত্রী। ঠিক না? বল তুমি, অ্যাম আই রাইট?
মুনা অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসল। মামুন তা লক্ষ্য করল না। যেন সে ক্লাসে বক্তৃতা করছে এমন ভঙ্গিতে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলতে লাগল, দেখ মুনা, ঐদিন আশপাশে কেউ ছিল না। তুমি এবং আমি। হঠাৎ আমার বুদ্ধিাশুদ্ধি গুলিয়ে গেল। তুমি ব্যাপারটা কি ভাবে নেবে কিছুই ভাবলাম না। মানে…।
থাক আমি শুনতে চাই না।
শুনতে না চাওয়াই ভাল। আমিও বলতে চাই না। তার চেয়ে ভাবা যাক এ জাতীয় কিছু কখনো আমাদের মধ্যে হয়নি, ওটা ছিল একটা দুঃস্বপ্ন।
মুনা তীক্ষু চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মামুনের কেন জানি মনে হল চোখ দু’টিতে কোনো প্ৰাণ নেই। পশুর চোখের মত চোখ। যেখানে আবেগের ছায়া পড়ে না।
মুনা! তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ?
ক্ষমা চাও তুমি?
হ্যাঁ চাই। ক্ষমা চাব না মানে? কি ভাব তুমি আমাকে, পশু?
না পশু ভাবি না। মানুষই ভাবি।
তাহলে বল তুমি আমাকে ক্ষমা করেছ।
ঠিক আছে করলাম। এখন আমি উঠব।
পাগল, এখনি উঠবে মানে? রাত আটটা পর্যন্ত থাকবে। তারপর আমি তোমাকে বাসায় পৌঁছে দেব এবং তোমাদের বাসায় রাতে খাব। তোমার মামার সঙ্গে কথা বলে বিয়ের ডেট ফাইনাল করব। বিয়েটা এক সপ্তাহের ভেতর সেরে ফেলতে হবে। এমনিতেই যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে।
মামুন অবাক হয়ে দেখল মুনা উঠে দাঁড়াচ্ছে। সে কি সত্যি চলে যাবে? মামুন হাত ধরে তাকে টেনে বসাতে গেল। মুনা কঠিন স্বরে বলল, হাত ছাড়। মামুন হাত ছেড়ে দিল। মুনা নিচু গলায় প্রায় অস্পষ্ট স্বরে বলল, আমি এখানে এসেছিলাম একটা কথা বলবার জন্যে। কথাটা হচ্ছে তোমাকে আমি বিয়ে করব না।
কি বলছি পাগলের মত?
যা বলছি ভেবেচিন্তেই বলছি। আমি এক সপ্তাহ ধরেই ভাবছি। আজ তোমাকে বললাম।
সামান্য একটা অ্যাকসিডেন্টকে তুমি এত বড় করে দেখছি কেন? ভিক্টোরিয়ান যুগের কোন মহিলা তো তুমি না। এ কালের মেয়ে এ যুগের মেয়ে।
আমি কোন যুগের মহিলা জানি না। যে কথাটা বলতে এসেছিলাম বলে গেলাম।
শোন মুনা, শোন আমার কথা শোন। ছেলেমানুষির একটা সীমা থাকা দরকার। আমার কথাটা শোন। শান্ত হয়ে বাস।
মুনা কঠিন স্বরে বলল, আমার হাত ছাড় নয়ত আমি চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করব। মামুন হাত ছেড়ে দিল। মুনা ঘর থেকে নিঃশব্দে বের হয়ে এল। একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না।
সন্ধ্যা হয় হয় করছে। সন্ধ্যার আগে আগে সব কিছু কেমন অন্য রকম লাগে। পরিচিত। ঘরবাড়ি এমনকি পরিচিত মানুষকেও অপরিচিত মনে হয়। মুনা রিকশা করে বাড়ি ফিরছে। তার বারবার মনে হচ্ছে নিতান্তই অচেনা একটি শহরের অজানা একটি রাস্তায় তার রিকশা যাচ্ছে। এই বোধহয় ভাল। চেনা মানুষের চেয়ে অচেনা মানুষ ভাল।
