বলতে বলতে হুরমতুল্লা গম্ভীর হয়ে যায় এবং কাশির দমক অগ্রাহ্য করে সে জানায়, হাত দিয়ে ছানলে রোদ একটু চড়া হলেই মাটি শক্ত হয়ে যায়। ভেতরে শক্ত হলে সেই মাটিতে ধানের চারা আরাম পায় না।
জমির বুক থেকে হাত প্রত্যাহার করে নিয়ে তমিজ উঠে দাঁড়ায়। হুরমত কাশতে কাশতে দলা দলা থুথু ফেলে এবং এর ফাঁকে ফাঁকে বকেই চলে, মাঝির বেটা জমির খেদমত করবে কী করে? এ কী জাল ফেললো আর ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ উঠলো? মাছের প্রতি তারা যেমন নিষ্ঠুর, জমিও তাদের কাছে শুধু ভোগের বস্তু ছাড়া আর কী? চাষার ঘরে না জন্মালে কি আর জমির দরদ বোঝা যায়? আরে হুরমতুল্লা তো পুরুষমানুষ, তার বেটিরা পর্যন্ত জমির যে তদারকি করতে পারে, নতুন চাষা হওয়ার হাউস-করা মাঝি কি তার ধারে কাছেও যেতে পারবে?—মেয়েছেলের সাথে এরকম তুলনায় তমিজের গা জ্বলে যায়। একটু আগে তার দুই বিঘা সাত শতাংশ জমি জুড়ে উদাস হয়ে শুয়েছিলো যে লম্বা চওড়া মেয়েমানুষ সে হারিয়ে যায় জমির ভেতরে, তাকে আর দ্যাখা যায় না।
এই হুরমতুল্লাকে সহ্য করা দিনদিন তমিজের অসহ্য হয়ে উঠছে। কিন্তু কিছু বলাও মুশকিল। চাষবাসের সবই সে জানে খুব ভালো। তাকে দেখে সরে-যাওয়া বুড়ার বেটির কাজের যে নমুনা সে দ্যাখে তাও একেবারে নিখুঁত। বাপবেটির কাজে মুগ্ধ চোখজোড়া তমিজ কখনোই সরাসরি ফেলতে পারে না বুড়ার চোখে। কিন্তু পাট কাটুক আর কাটা পাটের গোছা সরাতে থাকুক আর কাশতে কাশতে মাঝির গুষ্টি উদ্ধার করুক, বুড়ার ঘোলাটে চোখজোড়ার একটা সবসময় নিয়োগ করা থাকে তমিজের দিকে।
০৮. বাড়িতে তমিজের বাপ
বাড়িতে তমিজের বাপ বেটার দিকে মোটে তাকায় না। প্রতিদিন ঘরে ফিরে তমিজ দ্যাখে অন্ধকারে মাচার ওপর শুয়ে ভোঁসভেস করে ঘুমাচ্ছে তার বাপ। আর ঐ ঘরের ভেতরের ছোটো বারান্দায় চুলার সামনে বসে আগুনের আভায় ও ধোঁয়ায় এবং আগুন ও ধোঁয়ার ছায়ায় মুখে অন্যরকম চেহারা করে আগুনের ওপরকার অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে কুলসুম। খিয়ারের চাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার যখন তখন ভাত রাধার আর খান্ত হবে না। তমিজের বাপের ভাত খাবার কোনো সময় অসময় নাই। দুই বছর আগে আকালের সময় খুদও জুটতো না, না খেয়ে থাকাটা তখন বেশ অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো। আর এখন খিয়ার থেকে চাল নিয়ে ফিরলে লোকটার খাবার কোনো আগামাথা থাকে না। বিকলাবেলা হয়তো ঘুমিয়েছে ভর পেট খেয়ে, অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মাচা থেকে নেমে হাঁড়ি হাতড়ায়। আর সেদিন পেট খারাপ হলো, সেরে ওঠার পর তার খাওয়া বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। পারিমাণে তমিজ যতোই খাক, তার খাবার একটা সিজিলমিছিল আছে। সকালে পান্তা খেয়ে মাঠে যাবার সময় ভাত বেধে নিয়ে যায়। রাতে ফিরে সে একবারই ভাত খায়। খেতে বসার আগে ডোবায় কয়েকটা ড়ুব দিয়ে এলেও হাতে হোক, পায়ে হোক, কানের লতিতে কি ঘাড়ের খাজে হোক, কোথাও না কোথাও একটুখানি কাদা তার লেগেই থাকে। কুলসুম মহা উৎসাহে সেদিকে আঙুল দিয়ে দ্যাখালে তার সমস্ত উদ্দীপনা নস্যাৎ করে দিয়ে বাপের দিকে চোখ নাচিয়ে তমিজ জিগ্যেস করে, তামান দিন ঘরের মদ্যেই আছিলো?
কুলসুম কখনোই এই প্রশ্নের জবাব দেয় না। স্বামীর সারাদিন শুয়ে-থাকা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে ফের আরেক দফা তার বিবরণ দিতে গেলে তার হাই উঠতে পারে। সন্ধ্যাবেলা হাই তুলতে তার ভালো লাগে না। কিংবা একটু তফাত থেকে তমিজের কানের লতি কি ঘাড়ের খাজ কিংবা হাত কি পায়ে লেগে থাকা কাদার গন্ধ চুরি করতে নিয়োজিত থাকায় স্বামীর প্রসঙ্গটি কুলসুম এড়িয়ে যায়। সে জিগ্যেস করে, হাল দেওয়া শ্যাষ হলো? কিংবা আর কয়টা হাল দেওয়া লাগবি?
গোগ্রাসে ভাত গিলে হাত ধুয়ে নিজের ঘরের ভেতরের বারান্দায় দরজার চৌকাঠে–হুকা হাতে বসে তমিজ ধীরেসুস্থে জবাব দেয় কুলসুমের কথার, এখনি? আরে লিজে জমি বর্গা করলে মেলা খাটনি গো! ইটা তো তোমার মানষের জমিত কামলা খাটা লয় যে চুক্তিমতোন দুটা হাল দিলাম আর ধানের বিছন রুয়া দিলাম। বলে আমন ধানের খন্দ, খাটো তো ফসল উঠবি বুনা ধানের দেড়া, না খাটলে ফক্কা, হুঁকায় টান দিতে দিতে সে জানায়, জমি খেদমত চায়, খেদমত না পেলে জমি অসন্তুষ্ট হয়। জমি হলো ছিনাল মাগীমানুষের লাকান—। বলতে বলতে সে মুখ সামলায়, হুরমতুল্লার কথা সে বলতে বসেছে কোথায়?—একটু থেমে হয়তো হুরমতুল্লাকে অনুসরণ করার সাফল্যের খুশিতেই একটি উপমা বেরিয়ে আসে তার নিজের মাথা থেকেই, অসন্তুষ্ট জমি হলো কিপটার একশেষ। শালার জগদীশ সাহার চায়াও কিপটা। কৃপণতায় মানুষের সঙ্গে . জমির তুলনা শুনে কুলসুম হেসে গড়িয়ে পড়ে। তমিজের এই উপমা কি তার হাসির কারণ, না-কি তার হাসির অছিলা তা না বোঝে তমিজ, না বোঝে সে নিজে। কুলসুমের হাসিতে তমিজের উৎসাহ বাড়ে। সে ঘোষণা করে, এবার জমির যে সেবাটা সে করছে তাতে ঐ শালা হুরমতুল্লার মুখটা আন্ধার না করে ছাড়বে না। অনেক ধান পাবার সম্ভাবনায় হতে পারে, হুরমতুল্লার মন্ধকার মুখ দ্যাখার আশায় হতে পারে, আবার কুপির শিখার কালচে হলুদ আঁচেও হতে পারে, তমিজের কালো মুখে বেগুনি রঙের আভা ফুটতে দেখে কুলসুমের সারাটা শরীর শিরশির করে ওঠে। খুব ঝাপসা এই কাঁপনকে কথায় গড়িয়ে নিতে পারলে কুলসম শুনতো : তমিজের বাপের মুখেও এমনি ছায়া ছায়া, আভা কখনো কখনো ফুটে ওঠে। কখন? কখন গো?—সেই দিনক্ষণ খুঁজে বার করতে কুলসুম শো শো করে নিশ্বাস নিতে থাকে, গন্ধ শুকে এঁকে তমিজের এই চেহারায় তার বাপের ঠিক সময়ের আদলটা দেখতে পারবে। কয়েকটি বড়ো বড়ো নিশ্বাসেই পাওয়া গন্ধে কুলসুম সত্যি বুঝতে পারে, তমিজের বাপের মুখে হলুদ-বেগুনি ও কালো রঙের ঝাপটা টের পাওয়া যায় সন্ধ্যার আগে আগে। না, সব দিন নয়, মাঝে মাঝে। কখন? কুলসুম আরো কয়েক বার গন্ধ নেয়। —হ্যা, মানুষটা যে রাতে ঘুমের মধ্যে হেঁটে হেঁটে বাইরে যায়, সেই সব সন্ধ্যায় এই সব গাঢ় রঙের ঝাপটা লেগে মুখটা তার ঝাপসা হয়ে আসে।
