জিনের কথা তার সম্বন্ধে শোনা যায় না। তবে বদনাম আছে অন্যরকম। কামলা রাখলেও মোটা কাজগুলো সারা হলেই কামলাপাট বিদায় দিয়ে জমিতে সে খাটায় তার মেয়েদের। হুরমতুল্লার মেয়ে তিন জন। বড়োটার বিয়ে হয়েছিলো, স্বামীর ভাত খায় না দুই বছরের ওপর। বাপের বাড়িতেই পড়ে আছে। তার পরেরটাও বিয়ের বয়েসি, ছোটোটা বোধহয় একেবারেই ছোটো। দুটো বিয়ে করেও হুরমতের ছেলের ভাগ্য হয়নি। আকালের সময় দুই নম্বর বৌকে সে পাঠিয়ে দিয়েছিলো বাপের বাড়ি, আকালেই সেটা মরে গেছে। তা ছেলে না হোক, লোকে বলে, মেয়েরাই তার একেকটা মদ্দা মানুষের মতো। নিজেদের ভিটার জমিতে সব কাম তো করেই, দিঘির দক্ষিণে এই বর্গা জমিতেও বাপের কামলাগিরি করে তারাই। বাপের সাথে সাথে তারা থাকে। এই যে পাট কাটছে বুড়া, কাটা পাটগাছ দাঁড় করিয়ে সাজিয়ে রাখার পটুত্ব তাদের কোনো কামলার চেয়ে কম নয়। তমিজ অনুমান করে, দুটো মেয়ে তার সঙ্গেই কাজ করছিলো, তমিজকে দেখে বাড়ির দিকে চলে গেছে। হুরমতুল্লা হঠাৎ করে ডাকে, মাঝির বেটা, একটু আসো তো। বস্যাই তো আছো, ধরো।
কাটা পাটগাছগুলো তমিজ ধরলে সদ্য-ফাঁকা-হওয়া জায়গায় সেগুলো দাঁড় করিয়ে রাখতে হুরমতুল্লার সুবিধা হয়। বুড়ার পাট হয়েছে ভারি সুন্দর। অতি চমৎকার। একটু দেরিতেই কাটলো, কিন্তু পাট নষ্ট হয়নি। গাছ একেকটা পুরুষ্টু কী! পাকা ছাল ছুঁড়ে আঁশের সোনালি আভা উঁকি দিচ্ছে এখন থেকেই। তমিজের মুগ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে হুরমতুল্লা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, পাট তো আল্লা দিলে ভালোই হছে। লাভ কী? সোগলি বুঝি মণ্ডলের বাড়িতই ভোলা লাগে গো। পাঁচ বছর তার জমি বর্গা করি, খন্দ উঠলে হামার ঘরত যা তুলি কামলা দিলেও মনে হয় ততোকোনাই তুলতাম। কখন ধান করজ করি, কিবা কিবা হিসাব কয়, ফসল হামি কিছুই পাই না।
তমিজ বলে, তুমি আঁটিটা ধরো, আমি বাড়িত যাই।
আর এক ঘড়ি বাপু! এই কয়টা কোষ্টা কাটা হলেই আজ উঠমু।
না গো। যাই। হামার খিদা নাগিছে। তমিজ আল পেরিয়ে নিজের জমিতে উঠে দাঁড়ায়। এই বুড়া তো ভারি বজ্জাত। মণ্ডলের জমি বর্গা করে, ওর বাপের ভাগ্যি। কার্তিক মাসে মঙার সময় মণ্ডল ধান করজ না দিলে বুড়াকে তো যেতে হয় জগদীশ সাহার মোকামে। হিন্দু মহাজন যে ওর কী সর্বনাশ করতো সেটা সে এখনো টের পায়নি। জমির মালিককে তার ভাগের ফসল দিতে বুড়ার বুক টনটন করে। নিমকহারাম! নিমকহারাম! কথাটা কাদেরের কানে তোলা দরকার। না, কাদের মানুষটা নরম, তাকে দিয়ে কাজ হবে না। মণ্ডলকে সব খুলে বললে এখানে হুরমতুল্লাকে মণ্ডল জমিই দেবে না। হুরমতুল্লাকে উচ্ছেদ করতে হলে মণ্ডলকে চেতিয়ে দেওয়া দরকার। কাদেরকে লাগাবে এর পর। ওকে ধরে তমিজ এই জমিটা বর্গা পায় তো আল উঠিয়ে এক সঙ্গে সাড়ে চার বিঘা জমিতে সে মনের সুখে আবাদ করতে পারে। নিমকহারাম বুড়া হুরমতুল্লার বেইমানি তমিজের আর সহ্য হয় না।
কিন্তু শরাফত মণ্ডল কি তার কোনো ছেলের কানে তমিজ কথাটা আর তুলতে পারে। সময় কোথায় তার? সূর্য ওঠার অনেকটা আগে অন্ধকার থাকতেই লাঙল গোরু জোয়াল নিতে তমিজকে যেতে হয় হুরমতুল্লার বাড়ি। প্রায় রোজই ঐ সময়টাতে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ে। মাথাল মাথায় মোষের দিঘির উত্তরে যখন সে পেঁৗছয় বৃষ্টি তখনো পড়তেই থাকে। এর মধ্যে একবার ঝমঝম বৃষ্টি হয়ে যায় তো ভালো, এর মানে বৃষ্টির পর বিকাল পর্যন্ত আসমান সাফ থাকবে। যতো তাড়াতাড়িই করুক, হুরমতের বাড়ি গিয়ে তমিজ তাকে একদিনও দেখতে পায় না। তমিজ পৌঁছুবার অনেক আগেই বুড়া জমিতে গিয়ে হাজির। তমিজ লাঙল গোরু নিয়ে জমিতে পৌঁছতেই বুড়ার বড়ো মেয়েটা মুখের ওপর লম্বা ঘোমটা টেনে দৌড় দেয় বাড়ির দিকে। তখন হয়তো বেলা কেবল উঠছে। বৃষ্টির মধ্যে কাশতে কাশতে পাট কাটতে দেখে তমিজের মেজাজটা খিচড়ে যায়, বাপবেটির চোখে এদের নিন্দ নাই নাকি? বুড়ার বেটির তাকে দেখে ওভাবে পালাবার দরকার কী?
পাট কাটা কি পাটের গাছ গোছাবার কাজের ফাঁকে ফাঁকে হুরমতুল্লা কখনো কখনো হুঁকাটা হাতে নিয়ে চলে আসে তমিজের জমিতে। তমিজ হঠাৎ করে তার কথা শুনতে পায়, এ মাঝির বেটা, ইংকা করা নাঙল ধরলে মাটির মদ্যে ঠেলতে কষ্ট হয় গো। গোরু ক্যাংকা হাপস্যা যাচ্ছে দ্যাখো না? বলতে বলতে হুরমতুল্লা তার হাত থেকে লাঙল নিয়ে ভিজে মাটিতে লাঙল চষার যথাযথ কায়দাটি দেখিয়ে দেয়।
তা এই কয়েক দিনে তমিজ জমিটাকে একেবারে মাখনের মতো করে ফেলেছে। সকালবেলার দিকে কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানি প্রায় পড়েই না। বিকালের দিকে আলের ওপর বসে দুই হাতে কাদা ছানতে ছানতে বৃষ্টির গন্ধে, কাদার গন্ধে, একটুখানি আভাস-দিয়ে-যাওয়া রোদের গন্ধে এবং হাতের সঞ্চালনে তমিজের ঘুম ঘুম পায়, এই সময় জমিতে একেবারে উপুড় হয়ে শোবার তাগিদে তার সারা শরীর এলিয়ে এলিয়ে পড়ে। হয়তো সত্যি সত্যি সে শুয়েই পড়তো, কিন্তু বেছে বেছে ঐ মুহূর্তেই শালার বুড়ার বেটা চিৎকার করে বলে, ক্যা রে মাঝির বেটা, মাটি কি মাগীমানষের দুধ? ওংকা করা টিপিচ্ছো কিসক?—এই ধমকে তমিজের চোখের সামনে জমি যেন উদাম মেয়েমানুষ হয়ে শুয়ে থাকে। শুধু স্তন নয়, তার গোটা গতরে সাঁতার কাটার জন্যে তার নিজের শরীরেই ভয়ানক কোলাহল শুরু হয়। হুরমতুল্লার ওপর রাগ করার সুযোগও তার হয় না। আবার তার শরীরের কোলাহল চাপা পড়ে হুরমতুল্লার উপদেশে, হাত দিয়া মাটি ছানা হয় না। জমি চায় নাঙলের ফলা, বুঝলু জমি হলো শালার মাগীমানুষের অধম, শালী বড়ো লটিমাগী রে, ছিনালের একশ্যাষ। নাঙলের চোদন না খালে মাগীর সুখ হয় না। হাত দিয়া তুই উগলান কী করিস?
