এই সিদ্ধান্ত শরাফত নিয়েছে ছেলেদের মুখের দিকে চেয়ে নয়। বড়ো ছেলেটা সুযোগ পেলেই আইন নিয়ে তড়পায়। বর্গাচাষাদের সঙ্গে এতে আইন তড়পালে চলে না। জোতজমি ঠিক রাখতে হলে, সম্পত্তি বাড়াতে হলে কখন কী করতে হয় তা আগে থেকেই কোথাও ঠিক করা থাকে না। আবদুল আজিজ রাগ করতেপারে; কিন্তু কয়েক বছরের সরকারি চাকরি তার রাগ পোষার ক্ষমতাকে অনেকটা নিংড়ে ফেলেছে। এই ছেলেকে সামাল দেওয়া শরাফতের কাছে ডালভাত। সে বরং কাদেরের একটা ভুলকে ভেঙে দিতে বেশি মনোযোগ দেয়, কাদের, শোনো, টাকা লগ্নি করা হলো জগদীশের পেশা, এই ব্যবসায় না গেলে ওর বাপের লগ্নি করা টাকাও তো উদ্ধার করবার পারতো না। এটাই হলো ব্যবসা, ব্যবসার ভালোমন্দ দেখলে চলে? তোমরা যদি কও, হিন্দু মহাজনের টাকা নেওয়া হবি না, তা হলে মানুষ যাবি কুটি? আজই জগদীশ টাকা লগ্নি করা বন্ধ করে তো কালই মেলা মানুষ না খায়া মরবি। কার্তিক মাসে মানুষের পেট তো চালায় জগদীশই।
তার সুদটা তোলে কীভাবে তাও তো জানেন।
ওটা ওর ব্যবসা। জানা শুন্যাই মানুষ টাকা লেয়। জগদীশের ধর্মেও তো সুদ খাওয়া পাপের কাম লয়।
আবদুল কাদেরের মৌন যে সম্মতির লক্ষণ নয় এটা জেনেও শরাফত মণ্ডল বিরক্ত হয় না। ছোটো ছেলের পাগলামিগুলোকে প্রশ্রয় দিতে তার ভালোই লাগে। বংশের এই ছেলেটাই বছর তিনেক কলেজে আসা যাওয়া করেছে। দুই চান্সে আই এ পাস করে বি এ পড়ার বায়না ধরেছিলো। কিন্তু তা হলে তাকে যেতে হয় রাজশাহী। রাজশাহী যাওয়া মানে মাসে মাসে টাকা গোনা তো আছেই, তা ছাড়া ছেলেকে নাগালের বাইরে। ছেড়ে দেওয়া হয়। যেভাবে সভাসমিতি শুরু করেছে দূরে পড়তে গেলে পড়াশোনা সে ছেড়েই দিতো। তবে এখন বাড়ির ভাত খেয়ে যতো খুশি সভা করে বেড়াক শরাফতের আপত্তি নাই। জেলার নেতারা গোলাবাড়ি এলে তার সঙ্গেই কথাবার্তা বলে, তাদের বাড়িতেও আসে। দিনকাল যা পড়ছে এসব ছাড়া আর গতি নাই। গোলাবাড়িতে কেরোসিনের দোকানটা দেওয়ার বুদ্ধি ওর মাথায় এলো; সে তো এইসব যোগাযোগের ফলেই। আবার গ্রামের গরিব ছোটোলোকদের খাতির করতেও ছেলেটা তার বেশ পটু। এটার দরকার কম নয়। আবদুল আজিজ বলুক আর নাই বলুক, শরাফত ঠিকই জানে, অবস্থা ওদিকে সুবিধার নয়। আইনকানুনের ধার বেশি ধারলে শেষে সবই ফসকে যাবে। শরাফতকে সবই বিবেচনা করতে হয়। কাদের তমিজকে কথা দিয়েছে, তাকে এতোদিন আশায় আশায় রেখে এখন ফিরিয়ে দিলে ছোঁড়াটা হয় কাৎলাহার বিলে মাছ, চুরি শুরু করবে, চুরি করতে করতেই একদিন বিলের হক দাবি করে বসবে। নইলে সে চলে যাবে খিয়ারে। খিয়ারের চাষাদের বেয়াদবি দেখতে দেখতে তারও মাথাটা বিগড়ে যাবে না কে বলতে পারে?
শরাফত বলে, বুলুর জমি এখন দেওয়ার দরকার নাই। তমিজ বরং বিলের ওপারে মমাষের দিঘির কাছে হুরমতুল্লার পাশের জমিটা বর্গা করুক। হুরমতুল্লার বাড়িতে মণ্ডলের গোরু লাঙল মই জোয়াল সব থাকবে, তমিজ সব ব্যবহার করবে। তবে যাই নিক, সব কিছুর দাম ধরে ফসলেই সে শোধ করবে ধান কাটার পর। তবে সেখানে কয়েক মাসের হিসাবে কিছু লাভ শরাফতকে দিতে হবে। মুসলমান বলে সুদ সে নেবে না, কিন্তু মুনাফা নিলে কাদের নিশ্চয়ই আপত্তি করবে না।
সুদ নিতে মুসলমানের অসুবিধা আছে কি নাই, তা নিয়ে আবদুল কাদের মাথা ঘামায় না। সে তো আর মাদ্রাসায় পড়া কাঠমোল্লা নয়, রীতিমতো কলেজে পড়ে আই এ পাস করেছে, তার মধ্যে ওসব গোঁড়ামি থাকবে কেন? টাউনে মুসলিম লীগ অফিসে কি সিরইলে ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে কি ঝাউতলায় সাদেক উকিলের বৈঠকখানায় পাকিস্তানের আলাপ একবার শুরু হলে কতো নামাজের ওয়াক্ত কোন দিক দিয়ে চলে যায় কেউ খেয়াল করে না। আবদুল কাদেরের সহ্য হয় না হিন্দুদের জুলুম। এর সঙ্গে মুসলমানদের হারাম হালালের সম্পর্ক কী? কিন্তু এসব কথা সাদেক উকিল কি ইসমাইল হোসেনের মতো গুছিয়ে বলা কাদেরের সাধ্যের বাইরে।
তার আমতা আমতা কথা এবং আজিজের উসখুস-করা নীরবতা অগ্রাহ্য করে শরাফত বলে, তমিজ, ভালো জমিখান তোক দিলাম। বাপের আমল থ্যাকা ঐ জমি নিজেরা চাষ করিছি। উঁচা ভাঙা জমি, আমনের ফসল হবি ভালো। তার বাপের আমলে গোবর ছাড়া আর কোনো সার ছিলো না, গোবর ছাড়া অন্য সার দেওয়াকে তারা গণ্য করেছে শুনা বলে। তো তার দাদার আমলে ওই জমিতে একেক বিঘা জমিতে ধান উঠেছে ছয় মণ, সাড়ে ছয় মণ। বাপজান লিজে লাঙল ধরলে সাড়ে সাত মণ ধান না তুল্যা ছাড়ে নাই।
তাদের দাদার নিজের হাত লাঙল ধরার বিবরণ আবদুল আজিজ বা আবদুল কাদের উপভোগ করে না। আজিজ ছোটোখাটো হলেও সরকারি চাকরি করে, শিক্ষিত ভদ্রলোকদের সঙ্গে তার ওঠাবসা, মাত্র দুই পুরুষ আগে মাঠে নিজের হাতে লাঙল ধরার কথা শুনলে তারা ওর দিকে তাকাবে। আর তাদের মধ্যে যাদের বাপেরা এখনো ভোর হতে না হতে লাঙল ঠেলতে শুরু করে তারা তো এই নিয়ে আজিজকে পাকেপ্রকারে টিটকিরিই দেবে।
তবে বিরক্ত হবার সুযোগ কাদেরের কম। তমিজকে জমি বর্গা দেওয়ায় বাপের প্রতি সে গদগদচিত্ত। তমিজটা এখন তার বশেই থাকবে। গিরিরডাঙায় মাঝিদের দাপট এখনো কম নয়। মাঝিদের মধ্যে এই তমিজটাই গোলাবাড়ি গেলে একবার না একবার তার দোকানে গিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকে, লীগের ছেলেদের কথাবার্তা মন দিয়ে শোনে। একে দিয়েই মাঝিপাড়াটা কাদের নিজের দিকে টানতে পারবে। আবার দলের নেতাদের সামনে সে দাখেল করতে পারবে তমিজকে, এরকম কর্মী এই এলাকায় আর পাওয়া যাবে না। তা ছাড়া, এসব মাঝি আর চাষা আর কলুদের মধ্যে ভেদাভেদ রাখলে পাকিস্তানের ডাকে সাড়া দেবে কে? সেখানে তার দাদা পরদাদার লাঙল ধরার কথায় সংকোচ করার কী আছে? তবু হালুয়া চাষা দাদা সম্বন্ধে বাপের স্মৃতিচারণে সেও অন্যমনস্ক হওয়ার চেষ্টা করে। বাপ যে তাদের আরো কততদূর নিয়ে যায়, বংশকে নামিয়ে আনে। কোন পর্যায়ে এই নিয়ে দুই ভাইই কাতর হয়ে পড়লে বাড়ির ভেতর থেকে শরাফতের দ্বিতীয় বিবির ক্যা গো, বেলা গেলো কোটে, এখনো তোমরা ড়ুব দিলা না, ভাত খাবা কখন গো?—এই তাগাদা এসে আবদুল আজিজ ও আবদুল কাদেরকে উদ্ধার করে।
০৭. সকালের পান্তা সব ঘাম হয়ে
মণ্ডল দুই বেটাকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে গেলো, বেলা তখন অনেক। সকালের পান্তা সব ঘাম হয়ে, হাওয়া হয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় তমিজের পেটটা চুপসে গেছে। কিন্তু হলে কী হয়, নিজগিরিরডাঙায় দুই বিঘা সাত শতাংশ জমিটা এক পাক ঘুরে আসার জন্যে চোপসানো পেটশুদ্ধ সারাটা শরীর তার ছটফট ছটফট করে। বিলের ধারে বিলের পাহারায় নিয়োজিবুলুর বেটাকে বলে তমিজ চেয়ে নেয় মণ্ডলের কোষা নৌকাটা।
