আবদুল আজিজের কথা শেষ হলে আবদুল কাদের মুখ খোলে, ভাইজান, আধিয়ারের সাথে নগদ পয়সার কারবার কী চলে নাকি? ফসল উঠলে ওর ভাগ থেকে ক্যাটা নিলেই হবি। তমিজ পয়সা পায় কোথায়?
জগদীশ সাহার মোকাম এখান থেকে কয় দিনের রাস্তা? আজিজ পরামর্শ দেয়, হাঁটার কষ্ট হলে না হয় সাইকেলটা দে।
জগদীশ সাহার নাম মুনসির ইশারায় কি মাথার ওপর আমগাছের ডালপাতার আলোছায়ার কারসাজিতে তমিজের সামনে একটা ভাঙাচোরা গোরুর আদল পায়, গলায় বাঁধা দড়ির টানে সেটা কেবলি সামনের দিকে চলে। দড়ি-ধরা হাতের মালিককে দেখা যায় না, কিংবা দেখার সাহস তমিজের হয় না বলে ওটা রয়ে যায় তার চোখের আড়ালেই। তমিজের বাপের আসল গোরু তবু সেদিন বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছিলো, এখন এ বেটা ভূতুড়ে গোরুর সেই টানটাও নাই। এর খুরের লাথিতে নিজের টলোমলো করা পা সামলাতে তমিজের প্রাণপণ জোর খাটাতে হয়। তমিজের দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি খানিকটা এসে বর্তায় কাদেরের ঠোঁটে, সেই তেজে তার জিভ বলকায়, হিন্দু জমিদার আর হিন্দু মহাজনের হাত থেকে বাঁচার জন্যেই তো লীগের পাকিস্তানের লড়াই। হিন্দু মহাজন মুসলমান চাষার রক্ত চুষে শেষ করে ফেললো। আর আপনি এখন এই ছোঁড়াটাকে পাঠাবেন সেই মহাজনের বাড়ি? নাঃ। ওকে জমি বর্গা দিয়ে কাজ নাই। গলার ঝাঝ দ্বিগুণ করে তমিজকে সে নির্দেশ দেয়, তমিজ, তুই যা। জমি তোক দেওয়া যাবি না। মাঝির বেটা, যা, খালে বিলে মাছ ধরা খা। যা ভাগ।
আঃ। তোমরা কী শুরু করলা? বিলের প্রসঙ্গ ওঠায় শরাফত তাড়াতাড়ি করে কথা বলে। বিল থেকে সরিয়ে রাখার জন্যেই মাঝিদের সে জমি বর্গা দেওয়ায় আগ্রহী। ছেলেটা আবার সেই বিলের কথাই তুললো। ছেলেদের কথা কাটাকাটিতে লোকটা মাথা গলায় না। খানকা ঘরের একটু উঁচু বারান্দায় আধশোয়া হয়ে সে বসেছিলো ইজি চেয়ারের খয়েরি ও সবুজ ভোরা-কাটা ক্যানভাসে। কয়েক গজের মধ্যে আমগাছের নিচে হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে আজিজ এবং বেঞ্চে বসে কথা বলে কাদের। শরাফত তাদের কথা ঠিকই শুনছিলো, তবে তার চোখ ছিলো বাড়ির সীমানা পেরিয়ে কাৎলাহার বিলের ওপারে নিজগিরিরডাঙার চাষাদের গ্রামের পেছনে বৃষ্টির পানিতে ছপছপ-করা জমির দিকে। বকের ঝাঁকের ফেলে-আসা অর্জুনগাছের কয়েক গজ পরেই কামারদের ছেড়ে-যাওয়া ভিটা চাষ করে দেড় বিঘা জমিতে এবার কলা লাগানো হয়েছে। এই গোটা এলাকার এতো জায়গা নিয়ে কলার আবাদ এই প্রথম করলো শরাফত মণ্ডলই। সারি সারি শবরি কলার গাছে কলাপাতা রঙ ভাদ্রের ঘোলা রোদে একটু ময়লা দেখালেও শরাফত একটুও দমে না। কারণ চশমা ছাড়াই কলাপাতার আসল রঙ সে দিব্যি দেখতে পায়। ওপারের রোদবৃষ্টি, গাছপালা, আলোছায়া, জমিজমা, মানুষজন, গোরুবাছুর সবই তার খুব চেনা। আজ এপারের বাসেন্দা হলে কী হয়, জন্ম তো তার ওপারেই, দলিল দস্তাবেজে তার সাকিন লেখা থাকে : গ্রাম—নিজগিরিরডাঙা। আবদুল আজিজ আজকাল সব দলিলে লিখতে শুরু করেছে : হাল সাকিন–গিরিরডাঙা। কালাহার বিল পুরষ্ট হতে শুরু হওয়ার অনেক আগেই শরিকদের সঙ্গে গোলমাল করে এপারে এসে ঘর তোলে শরাফতের বাপ। শরাফত তখন একেবারেই শিশু। সেবার কী যেন হলো, আল্লার ইচ্ছা বুঝতে পারে কে?-কালাহারে মাছ মরলো একেবারে ঝাঁক বেঁধে। গিরিরডাঙার মাঝিদের জালে কেবল মরা মাছই ওঠে, বিলের পচা মাছ খেয়ে মাঝিপাড়ায় কলেরা লাগলো। অভাবে পড়ে কয়েকজন মাঝি নিজেদের বাড়িঘর জমিজমা বেচে দিলে শরাফতের বাপ কিছু জমি কিনে এপারে চলে আসে। বাপের কি পূর্বপুরুষের স্মৃতিতে মগ্ন হয়ে কিংবা জমি বিস্তারের স্বপ্নে বিভোর হয়ে শরাফত যে এতোক্ষণ চুপচাপ ছিলো তা কিন্তু নয়। বিলের ওপারে জমি তার কম নাই। খোদার রহমতে পূর্বপুরুষের গ্রামে সে কম জমি করে নি। মোষের দিঘির দক্ষিণে জমিটা তার বাপের আমলের, বাপের আমল থেকে জমিটা নিজেরাই চাষ। করেছে, বছর পাঁচেক হলো অর্ধেক দিয়েছে হুরমতুল্লাকে বর্গা করতে। মোষের দিঘির ধার ঘেঁষে সবটাই জমিদারের খাস জমি, পতিত হয়েই রয়েছে। উত্তরে হুরমতুল্লার ভিটা, ভিটার সঙ্গে লাগোয়া বিঘা তিনেক জমি হুরমতুল্লা এখনো হাতছাড়া করে নি। তার ভিটার দক্ষিণে ভবানীর মাঠ, প্রায় আধ ক্রোশ জায়গা খা খা পড়ে থাকে। ওপারের গাঁয়ের গোরু চরাবার জায়গা ওটা, জমিদার কাউকে পত্তন দেয় না। এর পরই মণ্ডলের এক দাগে ১২ বিঘা জমি, একটা জলা, তারপর ফের কামারপাড়ায় কেনা তার চার বিঘা জমি। বিলের দক্ষিণে সাত দাগে তার আটচল্লিশ বিঘা জমি, এর বেশিরভাগ বর্গা করে হামিদ সাকিদার। গিরিরডাঙায় তার জমি একেবারে কম নয়, কিন্তু সেগুলো বড়ো এলোমেলো। মাঝির জাত জমি আর গুছিয়ে করবে কী করে? এদিকে সস্তায় পেলে মণ্ডল জমি ছাড়ে না, তবে তার মনোযোগটা নিজগিরিরডাঙার জমির দিকেই বেশি। হামিদ সাকিদারের ওপর বেশ ভরসা করা যায়। ওপারের উত্তরের জমিও অর্ধেকটা নিজে লোক দিয়ে চাষ করার ব্যবস্থা আগের মতোই রেখে বাকিটা হুরমতুল্লাকে বর্গা দিলে ছেলেরা মোটেই সায় দেয় নি। তাদের কথা, হামিদ সাকিদারই করুক। কিন্তু শরাফতের হিসাব অন্যরকম, নিজের পূর্বপুরুষের গ্রামে প্রজা একটা বাড়লো। তা ছাড়া ভিটার কাছাকাছি বলে নিজের অল্প জমির সঙ্গে এই জমিটার যত্ন হুরমতুল্লা একটু বেশিই নেবে। আবার নিজের দূর সম্পর্কের আত্মীয় এই মানুষটাকে বশে রাখা যাবে। কিন্তু জমির বাকিটা হুরমতুল্লা এতো চাইলেও তাকে দিলো না কেন তা শরাফতুই জানে। তবে মোষের দিঘির উত্তরের জমি, পুবের জমি ও পশ্চিমের জমি পত্তন পেলে এটা হয়তো সে হুরমতকেই দেবে। মোষের দিঘির ঘেঁষা জমিগুলো নিয়ে গতবার পোড়াদহের মেলায় নায়েববাবুর সঙ্গে শরাফতের একটু আলাপও হয়েছিলো। আশাও পাওয়া গেছে। খাস জমি রাখার ব্যাপারে জমিদারবাবুর আগ্রহ নাকি দিন দিন কমে আসছে। ছেলেরা তার কলকাতা থেকে নড়তেই চায় না। কলকাতাতেই ব্যবসা করার নাম করে জমিদারি থেকে টাকা সরানো ছাড়া জমিদারিতে তাদের কোনো আগ্রহই নাই। নায়েববাবু বলে, বিষয় সম্পত্তিতে বাবুও উদাসীন হয়ে উঠেছে, এটাকে নায়েববাবু বৈরাগ্যই বলতে চায়। শুনে উত্তেজনা ও উৎসাহে শরাফত পায়ের গতি আর নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। তবে মেলার ভেতর হাঁটতে হাঁটতে পায়ের তাল সে রাখে হুঁশিয়ার হয়েই। দুদিন পর পনেরো সেরি দুটো রুই মাছ আর হাতিবান্ধার তিন হাঁড়ি দৈ নিয়ে লাঠিডাঙার কাচারিতে নায়েববাবুর সঙ্গে দেখা করে খুব হুশিয়ার হয়ে মোষের দিঘি পত্তন নেওয়ার কথা তোলে। নায়েববাবুর হাবেভাবে বোঝা যায় কিছু খরচপাতি করলে ওটা পাওয়া যেতে পারে। পেলে দিঘির চারপাশ মিলে এক দাগে বিঘা বিশেক জমি শরাফতের দখলে আসে। জোত এরকম এক দাগে হলে হিসাব রাখতে সুবিধা, জমিতে গিয়ে চোখও জুড়ায়। ওদিকে দক্ষিণে অর্জুনগাছের একটু ওপাশে কামারপাড়ার অনেকটাই শরাফত কিনে ফেলেছে। কেবল দশরথ আর নারদ আর ওদিকে গৌরাঙ্গ আট বিঘা জমি আঁকড়ে পড়ে রয়েছে। ওরা উঠে গেলেই ওখানে এক দাগে সতেরো বিঘা জমি হয়। আহা! তা হলে নিজের বাপের গ্রামের অর্ধেকের বেশির মালিক হতে পারে সে।এখন তার ছেলেরা যদি সামান্য এক মাঝির বেটাকে জমি বর্গা দেওয়া নিয়ে এতো তর্ক করে তো সম্পত্তি রাখতে পারবে এরা? ভাইয়ে ভাইয়ে তর্কাতর্কি মনোমালিন্যে পৌঁছুতে কতোক্ষণ? একেক দাগে বিঘার পর বিঘা জমির সম্ভাবনা আর ছেলেদের বিবাদের আশঙ্কা তাকে বঞ্চিত করছিলো ইজি চেয়ারের নিরঙ্কুশ আরাম। থেকে এবং একই সঙ্গে তাকে বাধ্য করছিলো চুপ করে থাকতে। নইলে তার সামনেই তার নিজের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো আলোচনা কি ঝগড়াঝাটি তার সহ্য করার কথা নয়। কিছু না হোক, গোরু দুটোর মুখের সামনে খড়ের কুচির পরিমাণ কমে এসেছে। এবং কাঁঠালতলায় বাঁশের বাতায় ঘেরা মাটির চারিতে মাড়নুন মেশানো পানি থেকে বকনাটা বারবার মুখ তুলে নিচ্ছে, এসব ব্যাপারে রাখাল ছোঁড়াটাকে অন্তত বার কয়েক ধমক দিতোই। ধমকের কুচি লাগতো তার ছেলেদের গায়েও। কিন্তু শরাফত হঠাৎ করে এতোটাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে যে, ইজিচেয়ারে পিঠ সোজা করে বসে সে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে, জবান যখন দেওয়া হছে, জমি তমিজকেই দেওয়া লাগে।
