জহির উদ্দিন জানালার কাছে এসে বলল, মিলি, ট্রেন লেট হবে। তুমি চা খাবে?
মিলির হাসি পেয়ে গেল। লোকটার কাণ্ডকারখানা দেখে কাল রাত থেকেই তার হাসি পাচ্ছে। কিভাবে সে স্ত্রীর সেবা করবে, যত্ন করবে তা নিয়ে অতি ব্যস্ত। ব্যস্ততোটা যে খুব হাস্যকর লাগছে তাও লোকটা বুঝতে পারছে না।
তাদের বাসর হয়েছে জহির উদ্দিনের খালাতো বোনের বাড়িতে। রাত একটার দিকে জহির ব্যস্ত হয়ে বলল, মিলি, তোমার কি মাথা ধরেছে? বলেই সে পাঞ্জাবির পকেট থেকে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বের করল। তার স্ত্রীর মাথা ধরবে এই ভেবে লোকটা কি আগে থেকেই পাঞ্জাবির পকেট ভর্তি করে মাথাধরার অষুধ নিয়ে বসে ছিল?
মিলি বলল, মাথা ধরবে কেন?
তুমি ভুরু কুঁচকাচ্ছ এই জন্যে বললাম। সারাদিনের টেনশনে মাথা ধরা তো স্বাভাবিক। আমার কখনো মাথা ধরে না। সেই আমারই মাথা ধরে গেছে।
না, আমার মাথা ধরেনি।
রাতে ঘুমুতে যাবার সময় সে বলল, মিলি, তুমি খাটের কোনদিকে ঘুমুতে পছন্দ কর?
মিলি বলল, আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না।
অনেকে খাটের দেয়ালের দিকে শুতে পারে না–এ জন্যে জিজ্ঞেস করছি। আচ্ছা তুমি বরং বাইরের দিকে শোও–বাতাস বেশি পাবে। ফ্যানের হাওয়া গায়ে লাগবে।
মিলি মনে মনে হাসল। জহির উদ্দিন বলল, বাসররাতে নিয়ম হল সারারাত বাতি জ্বলিয়ে রাখা। তুমি কি এই নিয়মটার কথা জান?
জানি।
নিয়মটা কোথেকে এসেছে জান?
বেহুলাকে সাপে কাটার পর থেকে এসেছে।
ঠিক বলেছ তো। মিলি, আলো জ্বালা থাকলে কি তোমার অসুবিধা হয়?
আমার কোন কিছুতেই অসুবিধা হয় না।
বিসকিট খাবে মিলি?
আমি খবর নিয়েছি রাতে তুমি ভাল করে খাওনি। এই জন্যে বিসকিট এনে রেখেছি। খাবে? ভাল বিসকিট। দুটা বিসকিট খেয়ে একগ্লাস পানি খাও।
মিলির বিসকিট খাওয়ার কোন রকম ইচ্ছা ছিল না। শুধু লোকটার আগ্রহ দেখে বলল, আচ্ছা। বিসকিট এবং পানি খাওয়া হল।
জহির উদ্দিন বলল, তোমার ঠোঁটে বিসকিটের গুড়া লেগে আছে। দাঁড়াও মুছে দিচ্ছি। সে হাত দিয়ে মুছে দিল। মিলি মনে মনে হাসল। ঠোঁটে হাত দিতে ইচ্ছে করছে–হাত দিলেই হয়? এত ফন্দি কেন?
জহির উদ্দিন বলল, পান খাবে? পান খেলে মুখের মিষ্টি ভাবটা কাটা যাবে।
পানিও কি আপনার পাঞ্জাবির পকেটে?
না, ড্রয়ারে রেখেছি। স্টেডিয়াম থেকে এনেছি। স্টেডিয়ামে একটা পানের দোকান আছে–খুব ভাল পান বানায়।
দুজন দুটা পান খেল। মানুষটার চেহারা মিলির মোটেই ভাল লাগছিল না। কি রকম বিশাল গোলাকার একটা মুখ! ঠোঁটের নিচে ফিনফিনে গোঁফ। কানগুলি ছোট ছোট। দাঁত ছোট ছোট–হাসলে কালো মাড়ি বের হয়ে পড়ে। তারপরেও গভীর রাতে লোকটার খুশি খুশি মনে পান খাওয়া দেখতে দেখতে মিলির মনে হল–লোকটা তো দেখতে খারাপ না। চেহারার মধ্যে কোথায় যেন খানিকটা ভাল লুকিয়ে আছে। বিশাল শরীরের ভেতর লুকিয়ে আছে লাজুক ধরনের ছোট্ট একটা শিশু। মিলির ইচ্ছা করতে লাগল। সে তার হাত বাড়িয়ে দেয়। যেন লজ্জা ভেঙে লোকটা তার হাত ধরতে পারে। লোকটার লজ্জা আবার বেশি বেশি। এখনো স্ত্রীর হাত ধরেনি। শুধু একটা ফন্দি করে একবার ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়েছে।
এই যে এখন জানোলা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চা খাবে কিনা মিলিকে জিজ্ঞেস করছে। লোকতার আসল উদ্দেশ্য জানালা ধরার অজুহাতে মিলিত হাত ছুঁয়ে দেয়া। মিলির দুটা হাতই জানালায়। মিলি বলল, আমি চা খাব না, তুমি দেখ, ভাইয়ারা খাবে কিনা।
কত সহজে মিলি ভোরবেলা থেকে মানুষটাকে তুমি ডাকছে। যতবারই ডাকছে ততবারই কি যেন দলা পাকিয়ে গলার কাছে উঠে আসতে চাচ্ছে। এর নাম কি ভালবাসা? এতদিন এই ভালবাসা কোথায় ছিল? এই ভালবাসার জন্ম কি শরীরে? দুটা শরীর পাশাপাশি এলেই কি এই ভালবাসা জন্মায়? তাহলে তো খুবই ভয়ংকর কথা। জহির উদ্দিন বলল, মিলি, এক কাজ করি, ছোট ভাইজানকে বলি আমাদের সঙ্গে যেতে। তুমি একা একা যাবে–তোমার খারাপ লাগবে। ছোট ভাইজান কয়েকদিন থেকে আসুক। বলব?
আচ্ছা বল।
উনি বোধহয় যেতে চাইবেন না।
বললেই ও যাবে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে না বললেও ট্রেন যখন ছাড়বে ও লাফ দিয়ে ট্রেনে উঠে পড়বে।
মিলি হাসছে। হাসতে হাসতেই মিলির মনে হল–
বাবার মৃত্যুর পর এমন আনন্দ নিয়ে সে আর হাসেনি। এই প্রথম হাসল। বাবা কি অনেক দূরের কোন ভুবন থেকে মিলির এই হাসি দেখছেন?
ফরহাদ গাড়িতে উঠে বসেছে। জহির গেছে। ফরহাদের জন্যে টিকিটের খোঁজে। আতাহার এখনো সেই আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। তাকে একেবারে গাছের মত লাগছে। গাছও মাঝে মধ্যে বাতাস পেলে ডালপালা নাড়ায়–এই মানুষটা তাও নাড়াচ্ছে না। দাঁড়িয়েই আছে। মিলি হাত ইশারা করে ভাইকে ডাকল। আতাহার এগিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে নিতান্ত অনিচ্ছায় আসছে।
মিলি বলল, ভাইয়া, এত দূরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?
আতাহার বলল, খুব কাছ থেকে কিছু দেখা যায় না রে মিলি। ভাল করে দেখতে হলে একটু দূরে যেতে হয়। দূরে দাঁড়িয়ে তোর আনন্দ দেখছি।
আনন্দ।
আনন্দ তো বটেই। আনন্দে তুই খাবি খাচ্ছিস। কাতলা মাছের মত স্বামী নিয়ে কোন মেয়েকে এত আনন্দিত হতে আমি প্রথম দেখলাম।
মিলি রাগ করল না। হেসে ফেলল। আতাহার বলল, বড়ভাই হিসেবে তোর বিয়েতে তোকে কিছু দিতে পারলাম না। একটা টাকা নেই পকেটে, কোখেকে দেব বল? যাই হোক, তোর জন্যে একটা জিনিস নিয়ে এসেছি। ট্রেন ঠিক যখন ছাড়বে তখন তোর হাতে দেব।
