জিনিসটা কি?
তা বলা যাবে না।
ভাইয়া, তুই চাকরি-বাকরি কিছু করবি না?
করব না কেন? অবশ্যই করব। আজ থেকেই চাকরি খোজা শুরু করব।
মাকে রোজ দেখতে যাবি।
মাকে দেখতে যাওয়া অর্থহীন। কে তাকে দেখতে আসছে কে আসছে না, মা তা জানে না। কোম-তে থেকে কিছু বোঝা যায় না। আমার ধারণা, কোম—তে থেকে মা খুব কষ্ট পাচ্ছে। আমাদের উচিত মাকে সহজভাবে মরতে দেয়া।
এই ধরনের কথা মনেও আনবি না। আমি নিশ্চিত মা কোমা থেকে ফিরে আসবে। কিছুদিন আগে আমি স্বপ্ন দেখেছি–তোর বিয়ে হচ্ছে। মা তোর বৌকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন।
বউটা দেখতে কেমন?
দেখতে বেশি ভাল না। রোগা কালো, দাঁতগুলি উঁচু উঁচু…
আতাহার বিরক্ত গলায় বলল, স্বপ্নে একটা মেয়েকে দেখবি–তাকেও কুৎসিত দেখতে হবে? মেয়েদের ঈর্ষাবোধ এত প্রবল যে তারা স্বপ্নেও কোন সুন্দর মেয়ে দেখে না।
মিলি হাসি হাসি মুখে বলল, ভাইয়া স্বপ্ন কি আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে? আমি দেখিনি
অবশ্যই করে। এখন পর্যন্ত কোন অসুন্দর মেয়ে। SINIK স্বপ্নে বুকুতীর ভিড় কুকু স্বপ্নে
তুই কবি-মানুষ, তোর কথা আলাদা।
সেটাও একটা কথা।
ভাইয়া, একটা পান খাব। মিষ্টি পান। আশা করি একটা মিষ্টি পান কেনার মত টাকা তোর কাছে আছে।
তা আছে।
ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। মিলি উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, ভাইয়া, ট্রেন তো ছেড়ে দিচ্ছে। তুই আমার উপহার দিলি না? দে, কবিতাটা দে। তুই যে পকেটে করে কবিতা নিয়ে এসেছিস সেটা আমি জানি। আতাহার কাগজটা হাতে দিল। ট্রেনের গতি বাড়ছে–আতাহারের হাঁটার গতিও বাড়ছে। জহির উদ্দিন জানোলা দিয়ে গলা বের করে বলল, ভাইজান থামেন থামেন–একসিডেন্ট করবেন, একসিডেন্ট।
মিলি জলে ভেজা চোখ নিয়ে ভাইয়ের কবিতা পড়ছে। লেখাগুলি ঝাপসা লাগছে।
শোন মিলি!
দুঃখ তার বিষমাখা তীরে তোকে
বিঁধে বারংবার।
তবুও নিশ্চিত জানি, একদিন হবে তোর
সোনার সংসার।
উঠোনে পড়বে এসে একফালি রোদ,
তার পাশে শিশু গুটি কয়
তাহাদের ধুলোমাখা হাতে–ধরা দেবে
পৃথিবীর সকল বিস্ময়।
মিলি ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। জহির উদ্দিন বিব্রত মুখে স্ত্রীর পাশে বসে আছে। মিলির কান্নায় ট্রেনের যাত্রিরা কিছু মনে করছে না। স্বামীর বাড়িতে যাবার সময় সব মেয়েই কাঁদে। কাঁদাটাই স্বাভাবিক।
মাকে দেখে আতাহার ফিরে যাচ্ছিল
মাকে দেখে আতাহার ফিরে যাচ্ছিল। হাসপাতালের টানা বারান্দা, রাত বেশি বলেই বাবান্দা নির্জন। হাসপাতালের নিজন টানা বারান্দায় হাঁটতে আতাহারের গা সব সময়ই ছমছম করে। মনে হয়, এই বুঝি মৃত্যুর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। কুঁজে বিকটি-দর্শন এক বৃদ্ধ যার চোখে কোন পাতা নেই বলে পলক পড়ে না। যার গলার স্বর তীব্র, তীক্ষা ও হিম-শীতল। কথা বলার সময় এই বৃদ্ধের মুখ দিয়ে দুৰ্গন্ধ লালা পড়ে। হাসপাতালের নির্জন বারান্দায় হাঁটার সময়ই শুধু আতাহারের মনে হয় মানুষের মাথার পেছন দিকে দুটা চোখ থাকলে ভাল হত। পেছনে কেউ আসছে কিনা বোঝা যেত।
আতাহার থমকে দাঁড়াল। ভয়ে ভয়ে পেছন ফিরল। যদিও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পেছন থেকে কবি সাহেব বলে যে তাকে ডাকছে সে আর যাই হোক মৃত্যু নয়।
এপ্রণ পরা হাসি হাসি মুখের তরুণী আতাহারকে পেছন ফিরতে দেখে বলল, এ রকম চমকে উঠলেন কেন? ভয় পেয়েছেন?
আতাহার বলল, পেছন থেকে কেউ ডাকলেই আমি চমকে উঠি। তার উপর আপনি কবি সাহেব ডাকলেন।
মাকে দেখে ফিরছেন?
জ্বি।
আতাহার এই ডাক্তার মেয়েটিকে চেনে। কয়েকবার দেখা হয়েছে। কখনোই মেয়েটিকে তেমন রূপবতী মনে হয়নি। আজ হচ্ছে। রূপ সম্ভবত সময় ও পরিবেশনির্ভর। হাসপাতালের নির্জন টানা বারান্দায় সাধারণ রকম সুন্দর মেয়েকেও হয়ত অসাধারণ মনে হয়।
মাকে কেমন দেখলেন?
আগে যেমন দেখেছি এখনো তাই। জ্ঞান নেই–ডাকলে সাড়া দেন না। আজ কি আপনার নাইট ডিউটি?
জ্বি।
সারারাত জেগে থাকবেন?
তা তো থাকতেই হবে।
সারারাত জেগে থেকে কি করেন?
যখন কাজ থাকে কাজ করি। যখন কাজ থাকে না–গল্পের বই পড়ি। বাসা থেকে গল্পের বই নিয়ে আসি।
কবিতা পড়েন না?
না, কবিতা পড়ি না।
আজ কোন বইটা পড়বেন?
আজ একটা ইংরেজি উপন্যাস নিয়ে এসেছি–Death in the maiden. আপনি পড়েছেন?
জ্বি না।
এর ছবিও হয়েছে। রোমান পলিনস্কি ছবি করেছেন। ভিসিআর-এ প্রিন্ট পাওয়া যায়। আমি অবশ্যি এখনো দেখিনি। আপনি দেখেছেন?
জি-না। আমাদের ভিসিআর নেই।
ডাক্তার মহিলা চলে যাবার মত ভঙ্গি করেও আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। আতাহার নিজেও অবাক হচ্ছে হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এতগুলি কথা ডাক্তার মেয়েটা কেন বলল। মনে হয় সে রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত। কিংবা কে জানে এই মেয়েটিরও হয়ত মৃত্যুর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবার ভয় আছে। একা বারান্দায় হাঁটতে গিয়ে ভয় পাচ্ছিল বলে আতাহারকে দেখে এতগুলি কথা বলছে।
আতাহার বলল, আপনার যখন ঘুম পায় তখন কি করেন?
নাইট ডিউটি যখন থাকে তখন ঘুম পায় না। তারপরেও ঘুম পেলে চা-কফি খাই।
নিজেই বানিয়ে নেন, না বাইরে থেকে আনান?
নিজেই বানাই। ইলেকট্রিক কেটলি আছে–আপনার কি চা বা কফি খেতে ইচ্ছে করছে?
জ্বি-না। চা-কফি কোনটাই খেতে ইচ্ছে করছে না। আপনার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করতে ইচ্ছে করছে।
ডাক্তার মেয়েটির চোখ তীক্ষু হতে গিয়ে হল না। রাগ করতে গিয়ে সে রাগ করল না। খানিকটা গম্ভীর গলায় বলল, আসুন। আমি তিন তলায় বসি। আপনার মার সঙ্গে আমার প্রায়ই কথা হত। সেটা কি আপনি জানেন? আপনার মা কি আপনাকে কখনো বলেছেন?
