মিলির দুঃখে কান্না পেতে লাগল। এখনো বিয়ে হয়নি তারপরেও বরপক্ষের বিরুদ্ধে উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য তার গায়ে লাগছে। তার কাছে মনে হচ্ছে মাছটা তো বেশ বড়ই লাগছে। এরচে বড় মাছের দরকার কি?
বিয়েতে আনা গয়নাগাটি নিয়ে খুব হাসোহাসি হতে লাগলো। মিলির দূর সম্পর্কের এক বোন গলার হারটা নিয়ে টেবিল ল্যাম্পের সামনে ধরে হাসতে হাসতে ভেঙে গড়িয়ে পড়ে গেল।
কি রকম পাতলা দেখেছ? গয়নার ভেতর দিয়ে লাইট পাস করছে।
মিলিকে মুখ হাসি হাসি করে রাখতে হচ্ছে, নয়ত সবাই ভাববে কথাগুলি সে গা পেতে নিচ্ছে। সে মুখ হাসি হাসি করে রাখল। তবে মনে মনে বলল, লাইট তোর মোটা মাথা দিয়ে পাস করছে–হাঁদিরাম কোথাকার।
বরকে নিয়েও অনেক হাসোহাসি হল। অপরিচিত সুন্দরমত একজন মহিলা বললেন, বর দেখেছি? হাত ভর্তি গরিলার মত লোম। এই ভদ্রলোকের শীতকালে কোন কৰ্ম্মবল লাগবে না। ন্যাচারেল উলেন কম্পবলে গড় অলমাইটি উনাকে ঢেকে দিয়েছেন। এই জাতীয় কুৎসিত কথাতেও মিলিকে অন্যদের মত হাসতে হল। সে লক্ষ্য করল, সবাই হাসছে, শুধু তার দুই ভাই মুখ কাল করে দাঁড়িয়ে আছে। সবচে তাকে যে ব্যাপারটা কষ্ট দিল তা হচ্ছে আতাহারের চোখে পানি ছল ছল করছে। ভাইয়া কখনো কাঁদে না। বাবার মৃত্যুর দিন সবাই হাউমাউ করে কেঁদেছে, ভাইয়া কাঁদেনি। মনে হচ্ছে আজ বোনের অপমানে সে কেঁদে ফেলবে।
মিলি মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগল। হে আল্লাহ! ভাইয়া যেন কেঁদে না ফেলে। ভাইয়া যেন কেঁদে না ফেলে। ভাইয়া কেঁদে ফেললে সে আর নিজেকে সামলাতে পারবে না। মিলি মনে মনে আতাহারের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। তার মন বলছে, মনের কথাগুলি কোন না কোনভাবে ভাইয়ার কাছে পৌছে যাবে। মনে মনে কথা বলার এই কৌশল আল্লাহ মানুষকে যখন দিয়েছেন তখন কোন উদ্দেশ্য নিয়েই দিয়েছেন। শুধু শুধু তো দেননি। মিলি বলতে লাগল–
ভাইয়া তুই এমন মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বিয়ে হচ্ছে ভাগ্যের ব্যাপার। আল্লাহ পৃথিবীতে জোড়া মিলিয়ে মানুষ পাঠান। যার যেখানে বিয়ে হবার সেখানেই হয়। আমার এই মানুষটার সঙ্গে বিয়ে হবার ছিল বলেই হচ্ছে। মানুষটার গভর্তি গরিলার মত লােম থাকলেও কিছু করার নেই। মানুষের চেষ্টায় যদি কিছু হত তাহলে তো বড় আপু আমেরিকায় যে ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছিল তার সঙ্গেই বিয়ে হত। আমি তো রাজিই ছিলাম। ছেলেটা আমাকে দেখে পছন্দ করে গেছে। তারপর দুদিন পর অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে। আমাদের খবর দেবারও দরকার মনে করেনি। এই ছেলের গভর্তি লোম থাকুক বা না থাকুক, সে তো আমাকে এরকম অপমান করেনি। ভাইয়া, আমি এই ছেলেকে আমার সমস্ত ভালবাসা দিয়ে ভালবাসব। তুই দেখিস আমি কত সুখী হব। সুন্দর সুন্দর ছেলেমেয়ে হবে আমার। তুই যখন আমাকে দেখতে যাবি তখন তারা মামা মামা বলে তোর গায়ে ঝাপিয়ে পড়বে। তুই হাসতে হাসতে কপট বিরক্তিতে বলবি, মিলি, তোর বাচ্চাগুলি তো দুষ্টের শিরোমণি হয়েছে। না, তোদের বাসায় আর আসা যাবে না।
ভাইয়া, আমাদের সংসারটা ভেঙে গেছে। আমাদের খুব সুন্দর সংসার ছিল। বাবা গেলেন মরে। মার এখন আর কোন কুঁশি-জ্ঞান নেই। তুই আর ছোট ভাইয়া আশ্ৰিতের মত অন্যের বাড়িতে আছিস। আমি জানি, এইসব তোর গায়ে লাগে না। কোন কিছুই তোর গায়ে লাগে না। তুই ফুটপাতেও চাদর গায়ে দিয়ে জীবন পার করে দিতে পারবি। কিন্তু আমার খুব লাগে। আমি রাত-দিন কি প্রার্থনা করি জানিস? আমি রাত-দিন প্রার্থনা করি–যেন তোর একটা বিয়ে হয়। ভেঙে যাওয়া সংসার আবার জোড়া লাগে। কোন এক ছুটিছাটায় আমি আমার স্বামী এবং ছেলেমেয়ে নিয়ে তোর বাড়িতে উপস্থিত হব। আমরা খুব হৈ-চৈ করব। সেকেন্ড শোতে ভাবীকে নিয়ে আমি সেজোগুজে সিনেমা দেখতে যাব। আমার বরকে সঙ্গে নিতে হবে, নয়ত টিকিট কাটবে কে? তাছাড়া অতি রাতে আমরা দুজন মেয়ে মানুষ তো আর ফিরতে পারব না। তুই বাসায় বসে তোর ভাগ্নে-ভাগ্নিকে নিয়ে খেলবি। গল্প বলে ওদের ঘুম পাড়াবি?
বিয়ে হয়ে গেল। কনেকে স্বামীর হাতে তুলে দেবার একটা অনুষ্ঠান আছে। মিলির বড় মামা এই দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এলেন। মিলি ক্ষীণ গলায় বলল, মামা, ভাইয়াকে আসতে বলুন। এই কাজটা ভাইয়া করুক। মিলির বড়মামা মিলির কথায় আহত হলেন, তবে আতাহারকে ডেকে নিয়ে এলেন। রাগী গলায় বললন, বোনের হাত ধর। হাত ধরে ছেলের হাতে তুলে দাও।
আতাহার মিলির হাত ধরল।
মিলির বড়মামা বললেন, হাত ধরে বেকুবের মত দাঁড়িয়ে আছ কেন? বল, আমার বোনকে আপনার হাতে তুলে দিলাম। তাকে সুখে রাখবেন।
আতাহার বলল, আমার বোনকে আমি আপনার হাতে তুলে দিলাম। তাকে আপনি সুখে রাখুন, বা না রাখুন সে আপনাকে সারাজীবন সুখে রাখবে।
মিলি দেখল, আল্লাহ তার প্রার্থনা শুনেননি। আতাহার কাঁদছে। ছোট বাচ্চাদের মত ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে।
মিলির ইচ্ছা করছে ভাইয়াকে বুকে চেপে ধরে বলে, কি করছিস তুই! কান্না বন্ধ করতো, কান্না বন্ধ করা।
সে কিছুই বলতে পারল না। অপরিচিত একটা ছেলের হাত ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
মিলি তার স্বামীর কর্মস্থল ঠাকুরগাঁয়ে চলে যাচ্ছে। মিলির স্বামী মোঃ জহির উদ্দিন ঠাকুরগাঁ পোস্টাপিসের পোস্টমাস্টার। মিলি ট্রেনে জানালার পাশে বসেছে। নতুন বউদের মাথাভর্তি ঘোমটা থাকার নিয়ম। মিলির মাথায় ঘোমটা নেই। সে জানোলা দিয়ে মুখ বের করে তাকিয়ে আছে। প্ল্যাটফরমে আতাহার ও ফরহাদ দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন ছাড়তে এখনো দেরি আছে। তারা ট্রেনের জানালার কাছে এসে গল্প করতে পারে, তা করছে না। চুপচাপ দূরে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেদের মধ্যে গল্প করলেও হত। তাও করছে না। এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন কেউ কাউকে চেনে না। দুজন অপরিচিত মানুষ কি এমন ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়ে থাকে? আতাহারকে সাধারণ একটা শার্ট-পেন্টে কি সুন্দর লাগছে।! ফরহাদকে লাগছে না। সে এমন কুঁজা হয়ে আছে কেন? সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না?
